”ভাব করতে চাইছে।” মৃদু গলায় মলয়া বলল। ”ভয় কী খয়েরি, দিদি হয় তোমার, কিচ্ছু বলবে না।” খয়েরিকে সে একটু ঠেলে ধরল মঙ্গলার দিকে। মঙ্গলা খয়েরির নাকের কাছে নিজের নাকটা নিয়ে গিয়ে শুঁকল। নাক ঝাড়ার মতো ”ফোঁত ফোঁত” শব্দ করল, খয়েরি ভয়ে ভয়ে ট্যারা চোখে ওর দিকে তাকাল। মঙ্গলা দু’বার চেটে দিল ওর মাথা।
কলাবতীর মনে হল খয়েরির ভয়টা কেটে গেছে, কেননা মুখটা নামিয়ে সে মঙ্গলার দেওয়া আদর নিরুদ্বেগে মাথায় নিয়ে চলেছে।
”ক্রিকেটে খেলা ছাড়া আরও অনেক কিছু আছে, সেসব তো করতে পারো।” মলয়া আবার ক্রিকেটের কথায় ফিরে এল। ”স্কোর লেখাও তো একটা বড় কাজ। মাঠে নামতে হবে না অথচ খেলার সঙ্গেও রইলে। আমি বরং বাবুদাকে বলে দেব তোমাকে স্কোরার হওয়ার ট্রেনিং দিতে।”
কলাবতী ব্যগ্র স্বরে বলল, ”তা হলে আমাকে লাস্ট পিরিয়ডে ছেড়ে দেবেন?”
”কেন?” মলয়া ভ্রূ কোঁচকাল। ”স্কোর লেখা তো বাড়িতে বসেও শেখা যায়। তুমি ক্রিকেট আইনের বইতেই পাবে স্কোরারদের কী কী কাজ করতে হবে। কার্ডিফে গ্ল্যামোরগান আর ইন্ডিয়ান টিমের খেলা দেখতে যাওয়ার আগে আমি ক্রিকেট আইনের বইটা উলটে—পালটে দেখেছিলুম।”
”স্কোরিংয়ের একটা প্র্যাকটিক্যাল দিকও তো আছে। সেটা মাঠে বসে না করলে শেখা যাবে না।” কলাবতী মরিয়া হয়ে এবার শেষ চেষ্টা করল।
মলয়া খয়েরির পিঠে হাত বুলোতে—বুলোতে আলোচনায় শেষ পেরেকটা পুঁতে দিল। ”নেট প্র্যাকটিসে স্কোর লেখার দরকার হয় এমন কথা কখনও তো শুনিনি।”
কলাবতী বুঝে গেল শেষ পিরিয়ডে তার ছুটি পাওয়ার দফা—রফা হয়ে গেছে। তারপরই দেখল অদ্ভুত জিনিস, মঙ্গলা চোখ বুজে মুখটি তুলে আর খয়েরি তার চোয়াল—থুতনি চেটে দিচ্ছে। ভয় ভেঙে গেছে খয়েরির। মলয়া কোল থেকে ওকে মেঝেয় নামিয়ে দিয়ে বলল, ”বিস্কিট দিই খয়েরিকে।”
মলয়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মঙ্গলা তার পিছু নিল। খয়েরিও যাচ্ছিল, কলাবতী ধমকে উঠতে থমকে পড়ল। মিনিট দুই পরে মলয়া ফিরল, হাতে দুটি চৌকো আকারের বিস্কুট। একটি মুখের সামনে ধরতেই খয়েরি টেনে নিয়ে খেতে শুরু করল। মঙ্গলা ঘাড় বাঁকিয়ে খাওয়া দেখতে লাগল।
”কালু, মাংসের চপ ভাজছে ঠাকুর, হাতটা ধুয়ে এসো।”
কলাবতী বাইরে দালানের বেসিনে হাত ধুয়ে এল। ”বড়দি, মঙ্গলাকে বিস্কুট দিলেন না?”
”ওর রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। তারপর আর কিছু খেতে দেওয়া হয় না।” মলয়া সস্নেহে মঙ্গলার মাথায় হাত বুলোল, ”ওর সবকিছুই চলে নিয়ম মেনে। খয়েরি খায় ক’টার সময়?”
কলাবতী ঢোক গিলল। সবার খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর অপুর মা রাত দশটা নাগাদ সবার উচ্ছিষ্ট যা পড়ে থাকে সেগুলোই ফিটনের ঘরে খয়েরির থালায় রেখে আসে। একথা জানাতে কলাবতীর লজ্জা করল। সে শুধু বলল ”দশটার সময় খায়।”
একটা প্লেটে দুটো বড় আকারের চপ আর স্যালাড নিয়ে এল ঠাকুর। কলাবতী একটা চপ থেকে একটু ভেঙে মঙ্গলার মুখের কাছে ধরল, কতটা নিয়ম মানে সেটা পরীক্ষা করার জন্য।
”ভাজাভুজি কখনও মঙ্গলাকে খাওয়ানো হয়নি। দেখো ও খাবে না।”
সত্যিই তাই হল। চপের টুকরোটা একবার শুঁকেই মঙ্গলা মুখ সরিয়ে নিল। কলাবতী সেটা খয়েরির মুখের সামনে ধরতেই সে শোঁকাশুঁকি না করেই কপাত করে মুখে পুরে দিল।
”কালু, এসব জিনিস ওকে খাইও না।” মলয়া বিচলিত করে বলল, ”পেটের গোলমাল হবে, লোম ঝরে যাবে।”
”কিচ্ছু হবে না খয়েরির। ও তো ভুখা পার্টি থেকে এসেছে, যা খাবে হজম করে ফেলবে।” কলাবতী নিশ্চিন্ত গলায় বলল।
ওরা ফিরে আসার জন্য যখন গাড়িতে উঠছে মঙ্গলা তখন বারান্দার রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে মাথা বার করে ডাকাডাকি শুরু করে দিল। কলাবতীর মনে হল, খয়েরি চলে যাচ্ছে বলে মঙ্গলার মনখারাপ হয়ে গেছে।
”খয়েরি আবার আসবে।” কলাবতী হাত তুলে মঙ্গলাকে বিদায় জানাল। গাড়ি যখন ফটক পেরিয়ে রাস্তায় পড়ল তখনও ঘৌ ঘৌ ডাক সে শুনতে পাচ্ছে।
.
কলাবতী বাবুদাকে জানিয়ে দিল বড়দি খেলার জন্য ছুটি দেবেন না।
”না দিক, তুমি স্কুলের পর বাসে উঠে সোজা চলে এসো। হয়তো একটু দেরি হবে, প্র্যাকটিসের সময় খানিকটা কমে যাবে। তা হোক, যতটুকু হয় সেটাই লাভ। আমাদের স্কুলগুলোর ছুটির সময়টা এমন, ছেলেমেয়েরা খেলাধুলো করবে কখন, শিখবেই বা কখন, আমি বরং মলুকে জানিয়ে দেব তুমি স্কোরার হওয়ার জন্য বাড়িতে প্র্যাকটিস করছ।” তারপর ধুপুকে বলল, ”খবরদার স্কুলে একদম মুখ খুলবে না।”
এইভাবে বড়দিকে লুকিয়ে সল্টলেকের নেটে চলল কলাবতীর প্র্যাকটিস। বাড়িতে সে নানাদিকে ঝাঁপিয়ে বল ধরার কসরত চালিয়ে যেতে লাগল দাদুর বা মুরারির ছোড়া বলে। তার দুটো কনুই ও পুরো বাহু ছড়ে গিয়ে রক্ত বেরোল, বেকায়দায় পড়ে গিয়ে ব্যথা হল কিন্তু সে এইসব ঝামেলা গ্রাহ্যে আনল না। তাকে উইকেটকিপার হতেই হবে।
স্কুলের প্রতিষ্ঠা বছরের সুবর্ণজয়ন্তী, তাই সোমবার স্কুলের ছুটি। দুপুরে সভা, বিকেলে নানা অনুষ্ঠান ও নাটক হবে। নাটকে কলাবতীর ছোট্ট একটা পার্ট আছে ঝগড়ুটে এক বিধবা বুড়ির। সকাল থেকে ঘরে আয়নার সামনে সে একাই মহড়া দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সত্যশেখর কোর্টে বেরোবার মুখে ব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢুকে বলল, ”কালু, আমার একটা কাজ করে দিবি, ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে হবে। আজ সন্ধেবেলায় আমাদের কোর্টের এক বেয়ারাকে এক হাজার টাকা দিতে হবে, কাল ওর ছেলে মুম্বইয়ে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাবে, এদিকে হাতে একটা পয়সাও নেই, ধার করার অনেক চেষ্টা করেও জোগাড় করতে পারেনি। শেষে আমার কাছে চাইল। মানুষটা খুব ভাল, বলেছি সোমবার এসে যেন নিয়ে যায়। তুই টাকাটা তুলে মুরারির কাছে রেখে দিস।”
