”দাদু ট্যাবলেট এনে দিয়েছেন। এখন একদম ব্যথা নেই। একটু শুধু ফুলে রয়েছে।”
”ক্ষুদিরামবাবু পড়িয়ে যান কখন?”
”আটটায়।”
”ঠিক আটটায় আমি গাড়ি পাঠাব। ভাল কথা, তুমি নাকি একটা কুকুর পুষেছ? দিশি কুকুর।”
”খয়েরি, ওর গায়ের রঙে নামটা রেখেছি।” এর পর গলায় উচ্ছ্বাস ঝরিয়ে কলাবতী বলল, ”বড়দি ওকে আপনি দেখবেন? তা হলে ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব।”
”নিয়ে এসো।”
ঠিক আটটায় মলয়ার পাঠানো গাড়ি এল। কলাবতী বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে দেখল সদর দরজা থেকে একটু দূরে খয়েরি গোল হয়ে শুয়ে রয়েছে। গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে কলাবতী ডাকল, ”আয় আমার সঙ্গে।” খয়েরি ওর পিছু নিল।
গাড়ির পেছনের দরজা খুলে কলাবতী বলল, ”ওঠ।”
খয়েরির কথাটা বোধগম্য হল না, সে লেজ নাড়ল শুধু। কখনও সে মোটরগাড়িতে চড়েনি। কলাবতী আবার বলল, ”ওঠ ওঠ।” খয়েরি লেজ নেড়েই চলল, কলাবতী ওর কোমর দু’ হাতে ধরে খোলা দরজার দিকে ঠেলল, ”ওঠ, ভেতরে চল।” খয়েরি শক্ত হয়ে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। এবার কলাবতী ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে গাড়ির মধ্যে তুলে দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠেই দরজা বন্ধ করে দিল, যাতে খয়েরি নেমে যেতে না পারে।
ড্রাইভার রামভরোসা হাসছিল, বলল, ”মংলাকে নিয়ে কোনও তকলিফ হয় না, দিদি গাড়িতে বসে একবার ডাকলেই উঠে আসে।”
”ওর অভ্যেস আছে গাড়ি চড়ার।” কলাবতী শুকনো স্বরে বলল।
গাড়িতে তিন মিনিটের পথ। খয়েরিকে সিটের পাশে বসিয়ে কলাবতী জড়িয়ে ধরে রইল। খয়েরি জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দ্রুত সরে যাওয়া দোকানের উজ্জ্বল আলো দেখতে দেখতে, আর পাশ দিয়ে যাওয়া গাড়ির হর্ন শুনতে শুনতে ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে করুণ চোখে কলাবতীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অভিজ্ঞতাটা তার কাছে ভীতিকর ঠেকছে।
মলয়াদের বাড়ি আকারে—প্রকারে সিংহিবাড়ির মতো বড় না হলেও, বেশ বড়। ফটক থেকে ঢুকেই সিমেন্টের চওড়া পথ। বাঁ দিকে লম্বা পাঁচিল, ডান দিকে বাড়ি। বাড়ির সদরে গিয়ে গাড়ি থামল। রামভরোসা নেমে পেছনের দরজা খুলে দিল। কলাবতী নেমে ডাকল, ”আয়।”
খয়েরি গাড়ি থেকে সবেমাত্র নেমেছে আর তখনই একটা ”ঘৌ” নির্ঘোষ সদর দরজার ওপরের বারান্দা থেকে তাদের অভ্যর্থনা জানাল। কলাবতী মুখ তুলে দেখল চার নম্বর ফুটবলের আকারের মঙ্গলার মাথাটা বারান্দার রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে। আরও তিনটে ”ঘৌ” শোনা গেল। খয়েরি সরে এল কলাবতীর পেছনে।
বাড়িতে ঢোকার জন্য পা বাড়িয়ে কলাবতী ডাকল, ”আয় আমার সঙ্গে।” আসার কোনও ইচ্ছা খয়েরির ভঙ্গিতে ফুটল না। কলাবতী আর ডাকাডাকি না করে ওর বকলেসটা শক্ত করে ধরে অনিচ্ছুক খয়েরিকে হিঁচড়ে টেনে দোতলার সিঁড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেল। এভাবে সিঁড়ি দিয়ে তোলা যাবে না তাই খয়েরিকে সে কোলে তুলে উঠতে শুরু করল। বাঁক নিয়েই দেখল মঙ্গলা সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে। কান দুটো খাড়া, প্রায় পাঁচ ইঞ্চি লম্বা জিভটা ঝুলছে। পাঁশুটে আর কালো রঙের ঘন বড় বড় লোম, দীর্ঘ লেজ, বিশাল ভারী শরীর। ওদের দেখে সে আবার ডেকে উঠল এবং তা সারা বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হল।
কলাবতী ওর পেল খয়েরির কথা ভেবে। অচেনা একটা কুকুর তার নিজের এলাকায় ঢুকেছে এটা হয়তো মঙ্গলা সহ্য নাও করতে পারে। যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে খয়েরিকে কামড়ে মেরে ফেলে। খয়েরি আকুপাকু করছে কলাবতীর কোল থেকে নামার জন্য।
”বড়দি, বড়দি।” কলাবতী চেঁচিয়ে উঠল।
ঘর থেকে মলয়া বেরিয়ে এল। ”দাঁড়িয়ে আছ কেন, ওপরে এসো। এই তোমার খয়েরি, বাঃ বেশ দেখতে তো!”
”মঙ্গলাকে সরান বড়দি, খয়েরি ভয় পাচ্ছে।”
মলয়া মৃদু কিন্তু দৃঢ় স্বরে ডাকল, ”মঙ্গলা….কাম হিয়ার।” শোনামাত্র সে মলয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ”সিট ডাউন।” মঙ্গলা উবু হয়ে বসে খয়েরির দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে ছোট্ট একটা ”ঘৌ” করল।
এগিয়ে এসে মলয়া কলাবতীর কোল থেকে খয়েরিকে দু’ হাতে নিয়ে বলল, ”মাথার সাদাটা খুব সুন্দর। বয়স কত?”
”তা তো জানি না বড়দি। রাস্তায় পেয়েছি, খুব রোগা ছিল। অপুর মা খাইয়ে—দাইয়ে ওকে নাদুসনুদুস করে দিয়েছে! কী ঝকঝকে হয়েছে ওর লোমগুলো!”
কথা বলতে—বলতে ওরা ঘরে এসে খাটে বসল। যেখানে বসতে বলা হয়েছিল, মঙ্গলা সেখানে বসেই রইল।
”তোমার কপাল তো এখনও ফুলে রয়েছে। ইসস ঠিক রগের কাছটায়, যদি ওখানে লাগত?”
হালকা সুরে কলাবতী বলল, ”লাগলে কী আর হত অজ্ঞান হয়ে যেতুম। তারপর হাসপাতালে দু’দিন পরে মরে যেতুম।” বলতে বলতে সে মলয়ার কোলে থাকা খয়েরির পিঠে হাত বুলোল। মঙ্গলা ঘরের দরজা থেকে উসখুস করে ”আঁউ আঁউ” করে উঠল। কলাবতী তাকে ডাকল, ”আয় মঙ্গলা।” মঙ্গলা ইতস্তত করে ঘরে ঢুকল।
কলাবতীর কথা শুনে রেগে মলয়া বলল, ”ফাজলামো করতে হবে না। ক্রিকেট একটা মারাত্মক খেলা।”
”বড়দি, হাজার হাজার ছেলে ক্রিকেট খেলছে কিন্তু ক’জন মরছে?”
”একজনও মরছে না, কেমন?” মলয়া উত্তেজিত হয়ে বলল, ”কিন্তু তুমি এখনও এই খেলার উপযুক্ত হওনি। হাজার হাজার ছেলে রবারের বল দিয়ে খেলছে। এই তো সেদিন কীসের জন্য, যেন একটা বনধ হল, রাস্তায় ছেলেরা রবারের বলে ক্রিকেট খেলছিল। তুমিও তো রবারের বলে খেলতে পারো।”
”কিন্তু বড়দি, আমি সত্যিকারের ক্রিকেটার হতে চাই। রবারের বল খেলে কখনওই তা হওয়া যাবে না।” বলতে বলতে কলাবতী লক্ষ করল মঙ্গলা দু’পা এগিয়ে মুখটা বাড়িয়ে দিল বড়দির কোলে গুটিয়ে থাকা খয়েরির মুখের দিকে। খয়েরি ভয়ে ”কুঁই কুঁই” করে উঠে মুখটা গুঁজে দিল বড়দির কোলে। এতবড় একটা অ্যালসেশিয়ানকে সে জীবনে কখনও এত কাছ থেকে দেখেনি। মঙ্গলা খয়েরির কানের কাছে শুঁকল। জিভ দিয়ে কানটা চাটল। বড়দি কলাবতীকে জবাব দিতে গিয়ে মঙ্গলার কাণ্ডটা নজর করে ঠোঁট টিপে হাসল।
