”আমি কিন্তু অনেকক্ষণ আগেই তোকে চিনতে পেরেছি। ওই মেয়েটা, যে তোর বোলারদের ছাতু করছে, আমার ভাইঝি।” সত্যশেখর ক্রিজে থাকা কলাবতীর দিকে আঙুল তুলল।
”তোর ভাইঝি!” বাবুদার গলায় সুস্পষ্ট অবিশ্বাস। ”এমন একটা অ্যাথলিট মেয়ে তোর ভাইঝি? বিশ্বাস হচ্ছে না।”
”বিশ্বাস না হয় তুই মলুকে জিজ্ঞেস করিস, ওর স্কুলেই পড়ে।”
”মেয়েটার দিকে নজর রাখিস, দারুণ সম্ভাবনা আছে। বহু বছর পর তোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এখনও আগের মতো খাচ্ছিস?” বাবুদা সত্যশেখরের পেটে হাত বোলাল।
”কুড়ি বছর পর দেখা আর অমনই খাওয়ার কথা! তোর কি আর কিছু মনে পড়ে না?” অভিযোগের সুরে সত্যশেখর বলল।
”মনে পড়বে কী করে, তোর সঙ্গে শেষ দেখা তো মামিমার, মানে মলুর মার শ্রাদ্ধে। তোর পাশে খেতে বসেছিলুম নিয়মভঙ্গের দিন, তখন দু’জনেই কলেজে পড়ি। খাওয়া শেষ হওয়ার পর তুই বাজি ধরলি তিরিশটা রাজভোগ খাবি, প্রত্যেকটার জন্য দশ পয়সা। তিনটে টাকা আদায় করে ছেড়েছিলি। দেখ দেখ, তোর ভাইঝি চালাচ্ছে কেমন। কপালে একটা বল ভালই লেগেছিল কিন্তু বসে যায়নি। মেয়েটা খুব রোখা।” বাবুদার স্বর তারিফে ঘন হয়ে উঠল। ”ওর নাম কী?”
”কলাবতী। কালু বলে ডাকি। তুই থাকিস কোথায় রে?”
”এই তো বি—জে ব্লকে। আয় না একদিন।”
ঠিক আটটায় প্র্যাকটিস শেষ হল। বিদায় নেওয়ার সময় বাবুদা কলাবতীকে বলল, ”তুমি কিন্তু রেগুলার এসো। বিকেলের প্র্যাকটিসে আসতে যদি বেরোতে দেরি হয় তা হলে মলুকে বলে তোমাকে লাস্ট পিরিয়ডে ছুটির ব্যবস্থার চেষ্টা করব, ধুপুর জন্যও।”
ইন্দুদি বললেন, ”তোমার কিটসগুলো এখানেই রেখে যাও, রোজ রোজ বয়ে আনবে কেন! কপালটা বড্ড ফুলেছে, বাড়িতে গিয়ে বরফ দিও।”
ফিরে আসার সময় কলাবতী জিজ্ঞেস করল, ”কাকা তুমি বাবুদাকে চেনো?”
”চিনব না? ও তো মলুর পিসতুতো ভাই, মলুদের কলকাতার বাড়িতে থেকেই তো কলেজে পড়েছে।”
.
ধুপুকে বাসস্টপের কাছে নামিয়ে দিয়ে ওরা বাড়ি ফিরল। প্রতিদিনের মতো কলাবতী রান্নাঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ”খয়েরিকে দুধ দিয়েছ অপুর মা?”
থোড় কাটতে কাটতে ঝাঁঝিয়ে উঠল অপুর মা, ”না, দিইনি, অপুর মা নিজেই সব গিলেছে।” এর পর মুখ তুলে তাকিয়েই সঙ্গে সঙ্গে চোখ স্থির হয়ে গেল। ”কপালে তোমার ওটা কী কালুদি?”
”কিছু না, বল লেগেছে।”
”ওমমা গো, এ কী কাণ্ড গো।” প্রায় মড়াকান্নার মতো চিৎকার করে উঠল, অপুর মা। ঠিকে ঝি, চাকররা মুরারি, এমনকী দোতলার বারান্দায়ও রাজশেখর ছুটে এলেন। সবার মুখে এক কথা, ”কী হল, কী হয়েছে অপুর মা?”
”ওই দ্যাকো।” আঙুল তুলে সে কলাবতীর কপালটা দেখাল।
সবাই দেখল, ঠিকে ঝি বলল, ”মাথাটা কোথাও ঠুকেটুকে গেছল হয়তো, জলপটি দাও।” এই বলে সে কাপড় কাচতে কলঘরে চলে গেল।
”চুন—হলুদ গরম করে লাগিয়ে দাও গো অপুর মা।” মুরারি বিজ্ঞের মতো বলল।
”হয়েছে কী?” উদ্বিগ্ন স্বর রাজশেখরের, ”কালু ওপরে আয়।”
কলাবতী ওপরে এসে বলল, ”কিসসু হয়নি দাদু, একটু যা টনটন করছে।” আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে আলতো করে কপালের ফুলো জায়গাটায় আঙুল ছুঁইয়ে একটু চাপ দিল। মুখটা ব্যথায় বিকৃত করল। রাজশেখর সেটা লক্ষ করে বললেন, ”আজ আর স্কুলে গিয়ে কাজ নেই, ধাক্কাটাক্কা লাগাতে পারে। ডাক্তার বোসকে ফোন করি, ওষুধ খেতে বলেন যদি।”
কলাবতী অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাড়িতে রইল। ডাক্তার যে ট্যাবলেট খেতে বলেছেন তাই খেয়ে দুপুরে শুয়ে রইল। বিকেল চারটে নাগাদ স্কুল থেকে বড়দির ফোন এল।
”আজ স্কুলে আসোনি কেন? তনিমা বলল আজ সে তোমাকে ক্লাসে দেখতে পায়নি, মিসেস ঘোষও তাই বললেন, হয়েছে কী?” মলয়ার স্বরে উদ্বেগ। ”আমার পিসতুতো দাদা একটু আগে ফোন করেছিল, বলল ধূপছায়া আর তোমাকে লাস্ট পিরিয়ডে ছুটি দিতে পারি কিনা ক্রিকেট প্র্যাকটিসের জন্য। কেউ খেলতে চাইলে আমি বাধা দেব না। কিন্তু তারপর ও বলল, আজ সকালে তোমার কপালে খুব জোরে একটা বল লেগেছিল তা সত্ত্বেও তুমি উইকেটকিপিং করেছ, ব্যাটও করেছ। অন্য মেয়ে হলে বসে পড়ত। কিন্তু তুমি ইনজুরির পরোয়া না করেই নাকি খেলে গেছ। বাবুদা তোমার জেদ আর রোখ নিয়ে প্রশংসা করলেও আমি কিন্তু প্রশংসা করতে পারছি না। আমি তোমাকে ছুটি দিতে পারব না আর ক্রিকেট খেলতে বারণই করব। জানো, ওরকম লোহার মতো শক্ত বল দেড়শো গ্রাম ওজন, ঘণ্টায় তিরিশ মাইল স্পিডেও যদি এসে লাগে তা হলে মানুষ মারাও যেতে পারে। না, তোমাকে খেলতে হবে না।” মলয়ার শেষ বাক্যে যে দৃঢ়তা ফুটে উঠল তাতে কলাবতী প্রমাদ গুনল। দু’জনের কথা সে অমান্য করতে পারে না, দাদু আর বড়দির। তার যত কিছু আবদার আর অনুরোধ এই দুটি মানুষের কাছে এবং তা পূরণ হয়।
কলাবতী বুঝল খুব হুঁশিয়ার হয়ে তাকে এখন কথা বলতে হবে, আবদার—টাবদার চলবে না।
”বড়দি, মঙ্গলা এখন কেমন আছে? শুনেছিলাম ওর সর্দি হয়েছে।”
”হঠাৎ মঙ্গলার খবর জানতে তোমার ইচ্ছে হল কেন? ওর তো তিন মাস আগে একটু ঠাণ্ডা লেগেছিল, তোমায় কে বলল?”
”কাকা।”
”কোর্টে মিথ্যে কথা বলে—বলে ওটাই ওর স্বভাবে দাঁড়িয়েছে।”
”বড়দি, অনেকদিন মঙ্গলাকে দেখিনি, খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, আজ যাব?”
”এসো। তবে মাথা ঘুরলে কি যন্ত্রণা হলে আসতে হবে না। ডাক্তার দেখিয়েছ?”
