এবার সে এগিয়ে গিয়ে স্টাম্পের পেছনে বসল। মেয়েটি দশ কদম ছুটে এসে বল করল। সাবিনার লেগের দিকে পিচ পড়ল। বলটা বেশ জোরেই এসেছে এবং ওভারপিচ। সাবিনা ব্যাট চালাল কিন্তু বলে তা লাগল না। কলাবতী বাঁ—হাত বাড়াল বলটা ধরতে বা থামাতে। সে দেখল হুসস করে বলটা বেরিয়ে গেল গ্লাভসের পাশ দিয়ে। অপ্রতিভ হয়ে সে জালের নীচে পড়ে থাকা বলটা কুড়িয়ে আনতে গেল।
”উইকেটের অত কাছে থাকলে তো ফস্কাবেই।”
জালের ওধারে দাঁড়িয়ে থাকা যে লোকটি কথাগুলো বলল কলাবতী তাকে এই প্রথম দেখল।
”কে কী ধরনের বোলার তা তো আমি জানি না।” কলাবতী কৈফিয়ত দেওয়ার সুরে বলল।
”আজ প্রথম?”
”হ্যাঁ”।
লোকটি জালের এধারে আসার জন্য হাঁটতে শুরু করল। ফরসা গায়ের রং, মাথার চুল পাতলা হয়ে এসেছে। নাতিদীর্ঘ, দোহারা, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। পরনে সবুজ টি—শার্ট সাদা টাউজার্স ও স্নিকার। কলাবতীর মনে হল, ইনিই বোধ হয় সেই বাবুদা।
বোলারদের কাছে গিয়ে বাবুদা দুটি মেয়ের কাছ থেকে বল চেয়ে নিয়ে অন্য দুটি মেয়েকে দিলেন। তারপর চেঁচিয়ে কলাবতীকে বললেন, ”সবাই মিডিয়াম পেসে বল করে।” শুনে সে এবার চার গজ পিছিয়ে গেল। মনে মনে বলল, কপিলদেব তো আর নয়, কত জোরে আর বল করবে!
সাবিনা আবার ব্যাট নিয়ে দাঁড়াল, একটা বল পিছিয়ে এসে আটকাল, পরেরটা পুল করল, তৃতীয়টা ফুলটস, কাঁধের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে পড়ল কলাবতীর দু’গজ সামনে, সে বলের লাইনে সরে এসেছিল। পিচ পড়ে বলটা লাফিয়ে তার কপালে লেগে ছিটকে উঠল। ‘ঠকাস’ একটা শব্দ হল। ছুটে গেল সাবিনা, ইন্দুদি, ধুপু ও বাবুদা।
কপাল ফাটেনি, রক্ত বেরোয়নি, আঘাতের জায়গাটা ফুলে উঠেছে, একটা টনটনে ব্যথা শুরু হয়েছে, কিন্তু এটা ছাপিয়ে কলাবতীর শুরু হল লজ্জা পাওয়ার যন্ত্রণা। কী ভাবছে সবাই! বড় প্লেয়ারের মতো সাজগোজ করে নেমে শেষে কিনা বলই ধরতে পারল না। চাল মারতে ক্রিকেট খেলছে। সবাই মুখে আহা উহু করবে কিন্তু মনে মনে নির্ঘাত মুচকি হাসবে। প্রথম দিনে চার—পাঁচটা মাত্র বল হতেই এই লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মতো ব্যাপারটা ঘটে গেল, তাও যদি একটা বলও সে ঠিকমতো ধরতে পারত!
ইন্দুদি আলতো করে কপালে আঙুল বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ”লাগছে?”
কলাবতী মুখে হাসি টেনে মাথা নাড়ল, ‘একটুও না।’
বাবুদা বলল, ”আজ থাক, আর উইকেটের পেছনে গিয়ে কাজ নেই।”
”না, না, আমি ঠিক আছি, একটু—আধটু তো ক্রিকেট খেলতে গেলে লাগবেই।” কলাবতী তাচ্ছিল্য দেখিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল। কপালে টনটনে যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। কিন্তু সে ঠিক করেই ফেলেছে লজ্জা নিয়ে সে বাড়ি ফিরবে না।
ধুপু এসে ফিসফিস করে বলল, ‘তোর কপালে তো একটা ছোট্ট আলু ফলেছে রে! কালু, আজ তুই চলে যা।”
”না।” কঠিন গলায় কথাটা বলে কলাবতী উইকেটের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ইন্দুদি একটি মেয়েকে বললেন, ”দৌড়ে গিয়ে ফ্রিজ থেকে বরফ নিয়ে এসো।” বাবুদা আগাগোড়া কলাবতীর ভাবভঙ্গি লক্ষ করে যাচ্ছিল। বলল, ”ঠিক আছে, তুমি কিপ করো।” সত্যশেখর দূরে বসে ছিল ঘাসের ওপর। ভাইঝিকে ঘিরে একটা জটলা দেখে সে অবাক হয়ে উঠে পড়ল। কিন্তু আবার কলাবতী উইকেটের পেছনে যাওয়াতে সে বসে পড়ল।
সাবিনা ব্যাট হাতে ফ্রিজে স্টান্স নিল। কলাবতী অনেকটা পিছিয়ে দাঁড়াল। অফস্টাম্পে বল, সাবিনা ড্রাইভ করল, ব্যাটের কানায় লেগে বল সেকেন্ড স্লিপের দিকে যাচ্ছে। কলাবতী ডান হাত বাড়িয়ে ঝাঁপাল এবং একবার জমিতে শরীরটা গড়িয়ে বল হাতে নিয়ে উঠল। বলধরা হাতটা তুলে চেঁচিয়ে উঠল, ”হাউস দ্যাট।”
ধুপু ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। ইন্দুদির মুখ ভরে গেল হাসিতে। বাবুদা নীচের ঠোঁট কামড়ে মাথা নেড়ে যাচ্ছে। আর কলাবতীর সারা দেহ গরম হয়ে উঠেছে লজ্জা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠায়। তার মাথার মধ্যে ঝাঁ ঝাঁ করছে একটা কথাই, ”দেখিয়ে দিতে হবে, দেখিয়ে দিতে হবে।”
এর পর সে আরও কয়েকটা বল ধরল এবং ফস্কালও। মেয়েটি একটা রুমালে বেঁধে বরফ এনেছে। কলাবতী সেটা কপালে ঘষল। চারজনের ব্যাটিং হয়ে যাওয়ার পর বাবুদা বলল, ”ব্যাট করতে পারবে?”
”পারব।”
নিজের থলি থেকে ব্যাট আর ব্যাটিং গ্লাভস বার করে নিয়ে কলাবতী ক্রিজে এল। মাথার মধ্যে এখনও আগুন জ্বলছে। উইকেটকিপারকে ব্যাটটাও করতে হয়। যার বল তার কপালে লেগেছে সে প্রথমেই তাকে বল করতে এল। অফ স্টাম্পে পিচ। একটু পেছনে হেলে মারার জন্য জায়গা করে নিয়ে কলাবতী কাট করল। বল গেল গালির দিকে। পরের বলটাকে প্রচণ্ড আক্রোশে এক পা বেরিয়ে গিয়ে তুলে দিল বোলারের মাথার ওপর দিয়ে। পরের বলটারও একই অবস্থা হল। চতুর্থ বলটাকে পুল করল, একটি মেয়ে হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়েও হাত টেনে নিল। সে ষোলোটা বল খেলল, ষোলোটাই তার মার—মার করা ব্যাটের ধাক্কায় মাঠের সর্বত্র ছিটকে ছিটকে গেল, একটা বল গেল পয়েন্টে যেখানে সত্যশেখর বসে ছিল। সে বলটা কুড়িয়ে ছোড়ার জন্য হাতটা তুলে বুঝল বলটা যথাস্থানে পৌঁছে দিতে পারবে না। বল হাতে সে বোলারের কাছে এসে আলতো করে ছুড়ে দিল।
”সতু না?” বাবুদা চোখ কুঁচকে বলল, ”তাই বলি! কুমড়োর মতো বসে থাকা লোকটাকে যেন চেনা—চেনা মনে হচ্ছিল! এখানে কী করতে?”
