সত্যশেখর চা খেয়ে গাড়ি বার করল ঠিক সাড়ে ছ’টায়। ভোজনপটু, অলস কাকাকে শর্টস, কেডস আর টি—শার্ট পরা দেখে কলাবতী একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ”কী ব্যাপার, তুমি দৌড়বে নাকি?”
”ভাবছি একটু ছুটলে টুটলে কেমন হয়। খিদেটা একটু বাড়ে তা হলে, কাল পাঁচু রায় হাইকোর্টের বার লাইব্রেরিতে আমাকে কুলপি মালাই খাওয়ার চ্যালেঞ্জ দিল, বলল দু’ ঘণ্টার একটা সেশনে ও নাকি পনেরোটা খেয়েছে বড়বাজারের কোন এক দোকানে। নে ওঠ।”
পাশবালিশের খোলের মতো একদিকে দড়ি লাগানো একটা কাপড়ের থলিতে ব্যাট প্যাড গ্লাভস ইত্যাদি নিয়ে কলাবতী গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে তখন লেজ তুলে ঘৌ ঘৌ করে ডাকতে ডাকতে ফিটনের ঘর থেকে ছুটে এল খয়েরি। ওর গলা জড়িয়ে আদর করে কলাবতী বলল, ”এখন যা, আমি বেরোব।” খয়েরি শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে শুধু লেজ নেড়ে যেতে লাগল।
”লোমগুলোয় চেকনাই ধরেছে, কালু তোর কুকুরটা দেখছি বেশ তাগড়াই হয়েছে, খুব খাওয়াচ্ছিস!” সত্যশেখর মন্থর গতিতে গাড়িটাকে ফটক থেকে বার করার সময় বলল।
”কুকুর নয় কাকা, ওর একটা নাম আছে।” গম্ভীর মুখে কলাবতী বলল, খয়েরিকে কেউ কুকুর বললে তার রাগ হয়। ”আমরা যা খাই, ডাল ভাত তরকারি, খয়েরিও তাই খায়। ওর জন্য আলাদা করে কিছুই কেনা হয় না। ও তো বিলিতি মেমসাহেব নয়। ওই যে ধুপু দাঁড়িয়ে।”
একটা ব্যাট হাতে নিয়ে সাদা ট্রাউজার্স পরা ধুপু বাসস্টপে দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িটা ওর সামনে এসে দাঁড়াতে অবাকই হল।
কলাবতী বলল, ”উঠে আয়, কাকার খিদে হচ্ছে না তাই একটু ছুটতে যাবে।”
”ভালই হল।” গাড়িতে উঠে ধুপু বলল, ”একটু আরাম করে আজ যাওয়া যাবে।”
সকালে রাস্তা ফাঁকাই। গাড়ি সাত—আট মিনিটেই পৌঁছে গেল এ—কে ব্লকের পার্কে। কোমর সমান উঁচু পাঁচিলে সারা পার্কটা ঘেরা। মাঠে কোনও লোক নেই। ওরা ছোট লোহার ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকল । মাঠের একধারের পাঁচিলের দিকে কুড়ি গজের একটা জালকে লম্বা করে ছড়িয়ে বাঁশে বেঁধে দাঁড় করানো।
কলাবতী বলল, ”আমরা একটু আগেই এসে পড়েছি। ধুপু নেটটা এভাবে খাটানো কেন রে?”
ধুপু বলল, ”বাবুদা ব্যাটসম্যানের দু’ধারে নেট রাখতে চান না। বলেন, যেভাবে ম্যাচে খোলা মাঠে ব্যাট করবে, বল করবে, উচিত নেটেও সেইভাবে খেলে যাওয়া। ফাইন লেগ থেকে থার্ডম্যান পর্যন্ত জাল, বল ফস্কালে জালে আটকে যাবে।”
জালের চার—পাঁচ গজ সামনে স্টাম্প পোঁতার গর্ত আর পপিং ক্রিজ চুন দিয়ে দাগানো। কলাবতী দেখল মাটির মসৃণ পিচ, তাকে ঘাস নেই। একটি—দুটি করে মেয়েরা এসে পৌঁছতে শুরু করল। মাঠটাকে পাক দিয়ে মন্থর গতিতে তারা যখন ছুটছে ধুপু বলল, ”কালু দাঁড়িয়ে থাকিসনি, আয়।” কলাবতী ওদের সঙ্গে যোগ দিল।
সত্যশেখরও তার খিদে—বাড়াবার—দৌড় মেয়েদের পঞ্চাশ মিটার পেছনে থেকে শুরু করে দিল। একটা পাক শেষ হতে দেখা গেল মেয়েদের থেকে তার ব্যবধান সত্তর মিটার, দেড় পাক সম্পূর্ণ হওয়ার সময় সেটা দাঁড়াল প্রায় একশো মিটারে, অবশেষে সত্যশেখর হাল ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল। কলাবতী নজরে রেখেছিল কাকাকে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলল, ”কাকা, চ্যালেঞ্জ নিতে হলে আর একটা রাউন্ড দিতে হবে।” শুনেই সত্যশেখর ছোটা শুরু করে দশ পা গিয়েই হাঁটতে লাগল।
ইন্দুদি অর্থাৎ ইন্দিরা বসাক মাঠে এলেন, উচ্চচতা টেনেটুনে পাঁচ ফুট, ওজন কম করে আশি কেজি, ঘোর কৃষ্ণ গায়ের রং, বয়স চল্লিশের মাঝামাঝি। চোখে চশমা, মিষ্টি মুখশ্রী। তার পেছনে চাকরের পিঠে বড় একটা ক্যানভাসের খোল, তাতে আছে প্র্যাকটিসের জন্য ব্যাট, প্যাড, স্ট্যাম্প, গ্লাভস আর বল।
”ধুপু ইনি কে রে?”
”ইন্দুদি, আমাদের ক্লাবের সব খরচ ইনিই দেন, কাছেই থাকেন। গিয়ে একটা প্রণাম কর।”
কলাবতী পায়ে পায়ে ইন্দুদির সামনে গিয়ে বলল, ”আমার নাম কলাবতী সিংহ। আমাকে আপনি আসতে বলেছেন, আমি উইকেটকিপিং প্র্যাকটিস করব।” এই বলে সে প্রণাম করল। ইন্দুদির মুখে প্রসন্নতার ছায়া ভেসে উঠল।
”ভাল কথা, প্র্যাকটিস করো, আমাদেরও একজন সেকেন্ড উইকেটকিপার দরকার।” ইন্দুদির কণ্ঠস্বর তার মুখের মতোই মিষ্টি। ”তোমার উইকেটকিপিং গ্লাভস, প্যাড আছে?”
”সঙ্গে করে এনেছি।”
”রেডি হয়ে নাও।” ইন্দুদি একটি মেয়েকে বললেন, ”সাবিনা প্যাডআপ।” তিনি চারটে বল গড়িয়ে দিলেন চারটি মেয়ের দিকে। বাকি মেয়েরা ছড়িয়ে দাঁড়াল ফিল্ড করার জন্য।
কলাবতী প্যাড আর গ্লাভস পরে তিনটে স্টাম্পের পেছনে দাঁড়াল, সামনে সাবিনা। তার বুকের মধ্যে দুরু দুরু কাঁপন শুরু হয়ে গেছে, উবু হয়ে উইকেটের কতটা পেছনে বসতে হবে বুঝতে পারছে না। যে বল করবে সে কী ধরনের বোলার—পেসার না স্পিনার সে জানে না। সাবধান হওয়ার জন্য সে উইকেট থেকে প্রায় দু’গজ পিছিয়ে দাঁড়াল, প্রথম বোলারটি বল করল ফ্লাইট করিয়ে, অফ স্পিনার, অফ স্টাম্পের দেড় ফুট বাইরে, সাবিনা স্কোয়ার কাট করতে গেল, ব্যাট বলে লাগল না, বলটা স্পিনও করেনি, ব্যাটের তলা দিয়ে এসে দ্বিতীয়বার পিচ খেল কলাবতীর দেড় গজ সামনে। সে তড়িঘড়ি সামনে ঝাঁপিয়ে ধরতে গিয়ে ফস্কাল। উঠে দাঁড়িয়ে সে আড়চোখে ইন্দুদির দিকে তাকাল। মুখে একচিলতে হাসি ফুটে রয়েছে দেখে সে বোঝার চেষ্টা করল হাসিটা সহানুভূতির না হতাশার।
