”আজ বিকেলে আয় না আমাদের বাড়িতে, তোকে দেখিয়ে দেব বল ধরতে পারি কি না। আর কিছু খাবি না?” কলাবতী টিফিন বক্সটা আবার এগিয়ে ধরল। ধুপু ইতস্তত করে চমচমটা তুলে নিল।
বিকেলে কলাবতী বাগানে মুরারির ছোড়া বল ধরছে। টুলে বসে রাজশেখর, তার পাশে খয়েরি। অপুর মা অনুপস্থিত। সে তখন বাড়ির মধ্যে বাসন মাজার ঠিকে কাজের লোকের সঙ্গে কী একটা ব্যাপারে হেস্তনেস্ত করায় ব্যস্ত। তখন ধুপু এল। ফটক দিয়ে ঢুকে এধার—ওধার তাকিয়ে কলাবতীকে চোখে পড়তেই এগিয়ে গেল। খয়েরি এগিয়ে এসে ধুপুর জুতো শুঁকল। একটা হাই তুলে আগের জায়গায় ফিরে এল।
”দাদু, এই আমার বন্ধু ধুপু, ভাল নাম ধূপছায়া। ব্যাটে ওপেন করে। দাদুর কথা তো তোকে বলেইছি।”
ধুপু বলল, ”বাহ, প্র্যাকটিসের তো ভাল ব্যবস্থা। গ্লাভস প্যাড সবই নিজের! দেখি তো কেমন ফিল্ড করিস।” এই বলে ধুপু মুরারির কাছ থেকে বলটা চেয়ে নিল। কলাবতী উইকেটের পেছনে গেল। খুবই স্লো লেগব্রেক কিন্তু বল ভালই ঘুরল জমি থেকে। দুটো স্টাম্পে লাগল। চারটে মিডল স্টাম্প থেকে অফের দিকে গেল, কলাবতী ধরল এবং লেগ স্টাম্পের বাইরের তিনটেও।
চমৎকৃত ধুপু বলল, ”বাহ, তুই তো সবক’টা বলই ধরলি! ধরে আবার স্টাম্পও করলি। শিখলি কোত্থেকে?”
”টিভিতে দেখে দেখে উইকেটকিপারের কাজটা বুঝে গেছি, তারপর প্র্যাকটিস।” কলাবতী হাসতে শুরু করল। ”কী রে, আমাকে দিয়ে তোদের চলবে?”
”সেটা ঠিক করবেন বাবুদা, ভাল নাম সুবীর ব্যানার্জি। রঞ্জি ট্রফি খেলেছেন, এখন আমাদের কোচ। আমাদের নেট হয় একদিন অন্তর দু’বেলা এক ঘণ্টা করে, কাল হবে সকাল সাতটায় আর বিকেল চারটেয়, তারপর আবার তরশু হবে। ছুটির দিনে একবেলা সকালে তিন ঘণ্টা হয়। আমি কালই সেক্রেটারিকে বলব, হাসিদির একজন বদলি থাকা দরকার।”
কলাবতী জিজ্ঞেস করল, ”হাসিদি কে?”
”আমাদের উইকেটকিপার। থাকে বাগুইহাটিতে। তুই আয়, ওর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব, খুব ভাল মেয়ে।”
পরদিন স্কুল শুরুর আগে কলাবতী অধীর উৎকণ্ঠা নিয়ে স্কুলের ফটকে অপেক্ষা করছিল ধুপুর জন্য।
”কী বললেন, ইন্দুদি?” কলাবতী শ্বাস বন্ধ করে ধুপুর দিকে তাকিয়ে ওর মুখভাব লক্ষ করে যেতে লাগল। মুখটা গম্ভীর লাগছে যেন। ধুপু না দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল।
”বল কী বললেন?” কলাবতী হতে চেপে ধরে ধুপুকে থামাল।
”বললেন পরশু সকালে যেতে, তোকে দেখবেন।”
হতভম্ব কলাবতী বলল, ”দেখবেন? আমাকে দেখে কী হবে।”
”বাঃ, দেখবেন না, তুই ব্যাকস্টপার না সত্যিকারের উইকেটকিপার?”
”আমি তো এখনও উইকেটকিপারই হইনি। ভাল করে শেখার অন্য ভাল বোলারদের বলে প্র্যাকটিস করতে চাই ভাল উইকেটে। দেখেছিস তো আমাদের বাগানে কী রকম এবড়োখেবড়ো জমিতে কীরকম বোলিংয়ে শিখি। এই বিদ্যে নিয়ে কি উইকেটকিপিং পরীক্ষায় পাশ করা যায়!” কলাবতীকে নিরুৎসাহ দেখাল।
ধুপু ওর কাঁধে হাত রেখে শান্ত নরম স্বরে বলল, ”এটাকে ক্লাসের পরীক্ষা ভাবছিস কেন, স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য যে পরীক্ষা দিতে হয় এটা সেইরকম। আমাকেও দিতে হয়েছিল। অনেক এলেবেলে আসে তো, সবাই বলে দারুণ ব্যাট করি, দুর্দান্ত বল করি। বাবুদা তাদের এক ওভার দেখে নিয়েই ইন্দুদিকে বলে দেন, ‘এর কোনওকালে হবে না’, কারুর সম্পর্কে বলেন, ”তিন বছর রগড়ালে যদি কিছু হয়’, কিংবা বলেন, ‘এই মেয়েটার ক্রিকেট সেন্স আছে, একে রেখে দিন, খাটলে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।’ বাবুদা একজন উইকেটকিপার চাইছেন, যে হাসিদির স্ট্যান্ডবাই থাকবে।”
”তোর কথা শুনে তো ভয় লাগছে, যদি বাবুদা বলে দেয় এর কোনওকালে কিসসু হবে না কিংবা তিন বছর রগড়াতে হবে।”
”তা বলে দিতে পারেন। কিন্তু পরীক্ষায় না নেমেই তুই ধরে নিচ্ছিস কেন ফেল করবি? কাল ঠিক সকাল সাড়ে ছ’টায় তোদের বাড়ির সামনের বাসস্টপে দাঁড়াবি, আমি এসে সঙ্গে করে নিয়ে যাব। ব্যাট গ্লাভস প্যাড নিতে ভুলিসনি।”
ধুপু ক্লাসে চলে গেল, কলাবতীও। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে অন্যদিনের মতো মুরারির ছোড়া বল ধরার প্র্যাকটিসে সে নামল না। তার বদলে বাগানে ফ্রিহ্যান্ড ব্যায়াম আর পাঁচশো স্কিপিং করল দড়ি দিয়ে। দাদুকে বাড়ি ফিরেই বলেছে সকালে সল্টলেকে যাবে পূর্ব কলকাতার নেটে পরীক্ষা দিতে। রাতে খাবার টেবলে রাজশেখর ছেলেকে বললেন, ”সতু কাল সকালে তোর একটা কাজ আছে, কালুকে সল্টলেকে গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবি, ও পরীক্ষা দিতে যাবে।”
সত্যশেখর অবাক হয়ে বলল, ”পরীক্ষা! কীসের?”
”উইকেটকিপিংয়ের। এ—কে ব্লকের পার্কে পূর্ব কলকাতার নেট পড়ে, সেখানে কালু পরীক্ষা দিতে যাবে, সাড়ে ছ’টায় বেরোবে।”
সত্যশেখর বলল, ”সল্টলেকের রাস্তা আমার গুলিয়ে যায়, ব্লক—টলকও আমি চিনি না। ওখানে তো জলের ট্যাঙ্কের নম্বর দিয়ে পাড়া চিনতে হয়।”
কলাবতী বলল, ”ধুপু চেনে। ও সঙ্গে যাবে।”
মাঝরাত পর্যন্ত কলাবতী বিছানায় এ—পাশ ও—পাশ করল। তার মাথায় শুধু ঘুরছিল কথাগুলো ‘এর কোনওকালে হবে না হবে না হবে না।’ স্কুলের অ্যানুয়াল পরীক্ষার দিনও সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে, এমন অস্থির কখনও হয়নি। অ্যালার্ম দেওয়া ঘড়িটা সাড়ে পাঁচটায় তার ঘুম ভাঙিয়ে না দিলে হয়তো সে সাতটা পর্যন্ত ঘুমোত।
