রাজশেখর অবাক হয়ে বললেন, ”আরে, মুরারি তো ভালই বলটা করল! নে, আবার কর।”
কত্তাবাবুর প্রশংসা শুনে মুরারি এক বুক শ্বাস নিয়ে ছাতি ফুলে গেল। প্রায় একই জায়গায় সে পরপর চারটে বল ফেলল। কলাবতী এবার সবক’টাই গ্লাভসে ধরে রাখল। সে চেঁচিয়ে বলল, ”দারুণ মুরারিদা, দারুণ। করে যাও, আরও করে যাও।”
মুরারি মুখ করুণ করে বলল, ”কত্তাবাবু এসব কাজ করা তো ওব্যেস নেই। কাঁধে ব্যথা লাগছে।”
রাজশেখর বললেন, ”ব্যথা না হওয়ার ওষুধ দিচ্ছি, কালুদিদিকে যতবার বল করবি, প্রত্যেক বলের জন্য পাঁচ পয়সা করে পাবি। যা, এবার বল কর।”
মাথা চুলকে মুরারি বলল, ”আজ্ঞে, ওটা ছ’পয়সা করুন।”
রাজশেখর একটুও না ভেবে বললেন, ”ঠিক আছে। দিনে তা হলে ক’টা করে বল ছুড়বি?”
”চল্লিশ—পঞ্চাশটা তো পারবই।” মুরারি নিশ্চিত স্বরে বলল।
সন্ধেবেলায় অপুর মা জিজ্ঞেস করল মুরারিকে, ”চল্লিশ—পঞ্চাশটা বল ছুড়ে ক’পয়সা পাবে মুরারিদা?”
মুরারি বলল, ”সে মেলা পয়সা, হিসেব না করে বলতে পারব না।”
”তুমি তো দেখছি ভাল বল ছুড়তে পারো।”
”পারব না কেন। ছেলেবেলার ঢিলিয়ে কত আম পেড়েছি জানিস? এক টিপে এক—একটা আম পড়ত।”
এরই চারদিন পর ফণী ঘোষ সকালে কলাবতীকে বলেন, ”আজ বিকেলের দিকে রাজুকে দেখতে যাব।” তিনি বিকেলে সিংহিবাড়ির ফটক দিয়ে ঢুকেই দেখলেন রাজশেখর একটা টুলে বসে তার পাশে গলায় বকলস দেওয়া একটা খয়েরি কুকুর সামনের দু’পা জমিতে ছড়িয়ে বসে, ধুতি আর গেঞ্জি পরা একটি কাঁচাপাকা চুলের লোক ক্রিকেট বল ছুড়ছে কলাবতীকে। তিনটে স্টাম্পের পেছনে গ্লাভস আর প্যাডে সজ্জিত ট্রাউজার্স পরা কলাবতী বল ধরতে ডান দিকে ঝাঁপাল। ফণী ঘোষ আর না এগিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন দূর থেকেই দেখার জন্য।
রাজশেখরের হাতে ফর্দের মতো লম্বা কাগজ আর কলম। মুরারি একটা করে বল ছুড়ছে আর ফর্দে তিনি টিক দিচ্ছেন। তেরো নম্বর টিক দিয়েছেন যখন কলাবতী চেঁচিয়ে উঠল, ”দাদু দেখো দেখো কে এসেছেন।”
রাজশেখর মুখ ফিরিয়ে দেখে বললেন, ”আরে ফণী, ওখানে দাঁড়িয়ে কেন, এসো এসো। কেমন দেখছ বলো।”
‘ফণী ঘোষ কাছে এসে বললেন, ”কালু তো ভালই কালেক্ট করছে। তবে একটা মুশকিল কী জানো রাজু, ম্যাচে যখন কিপ করবে তখন তো সামনে ব্যাট হাতে একজন থাকবে। তখন কিন্তু কিপিংটা এমন সোজা ব্যাপার হবে না। কিন্তু তোমার এখানে তো কারুর ব্যাট করা সম্ভব নয়, ওকে এবার মেয়েদের ভাল ক্লাবে দিতে হবে সেখানে সত্যিকারের প্র্যাকটিস হয়।”
”মেয়েদের ক্লাব! কোথায় পাব?” রাজশেখরকে অসহায় দেখাল। তারপরই তাড়া দিলেন মুরারিকে। ”হাঁ করে কথা গিলছিস কী? বল ছোঁড়। অপুর মা এটা ধরো।” রাজশেখর বল ছোড়ার ফর্দ আর কলমটা ওর হাতে দিয়ে বললেন, ”যেভাবে টিক দিয়েছি, গুনে গুনে সেইভাবে দিয়ে যাও। আমি বৈঠকখানায় যাচ্ছি।”
ফণী ঘোষকে নিয়ে রাজশেখর বাড়ির দিকে চলে গেলেন।
”ঠিক করে টিক দিবি।” মুরারি হুঁশিয়ার করে দিল অপুর মাকে। একটা বড় কাজের দায়িত্ব পেয়ে অপুর মার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। মুরারি একটা করে বল ছোড়ে আর বলে, ”টিক মার।” অপুর মা একটা টিক দেয় দুটো বল ছোড়ার পর।
আধঘণ্টা পর কলাবতী ফিরল। তখন ফণী ঘোষ বলছেন, ”ধুপুদের ক্লাবটা ভাল। টাকাকড়িও আছে, নইলে নেট খাটিয়ে প্র্যাকটিস করতে পারে? এই যে কালু, শোনো তুমি ধুপুদের ক্লাবে জয়েন করো। প্রগতি সঙ্ঘে থাকলে তোমার কিছু হবে না। উইকেট কিপিংয়ে তোমার একটা সহজাত ঝোঁক মানে—” বোঝাবার জন্য সঠিক কথাটা তিনি খুঁজতে শুরু করলেন।
রাজশেখর বললেন, ”সহজাত দখল আছে।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি দেখছিলুম ওর বডি মুভমেন্ট। এটা তো কেউ ওকে শেখায়নি কিন্তু ঠিক বলের লাইনে মুভ করছিল।” ফণী ঘোষ তারিফের ভঙ্গিতে চোখ বুজে মাথা হেলালেন।
রাজশেখর বললেন, ”কালু, ফণী আজ প্রথম এল, মিষ্টিমুখ তো করাতে হবে।”
কলাবতী মুখ টিপে হেসে জানাল, ”মুরারিদাকে আমি বলে দিয়েছি।”
সিংহিবাড়ির দুটো ফ্রিজ সবসময়ই ভর্তি থাকে মরসুমি ফল আর নানাবিধ মিষ্টান্নে। একটু পরেই ট্রে হাতে মুরারি এল। প্লেট ভরা কাটা ল্যাংড়া আম আর কড়াপাকের সন্দেশ।
”চা দেব না লস্যি?” মুরারি রাজশেখরের কাছে জানতে চাইল।
”লস্যিই দিক।” রাজশেখর অনুমোদনের জন্য ফণী ঘোষের দিকে তাকালেন, মাথা হেলিয়ে তিনি সম্মতি জানালেন।
পরদিন স্কুলে টিফিনের সময় কলাবতী খুঁজে বার করল ধুপুকে। ”তোর সঙ্গে একটা কথা আছে, চালতাতলায় আয়।” স্কুলের উঠোনে একটা চালতাগাছ আছে, তার গুঁড়ি ঘিরে সিমেন্টের রক। সেটাই চালতাতলা।
দু’জনে এসে রকে বসল। কলাবতী টিফিন বক্স খুলে ধুপুর সামনে ধরে বলল, ”নে তোল।” ধুপু খুঁটিয়ে দেখে সিদ্ধ ডিমটা তুলে নিয়ে আধখানা কামড়ে চিবোতে চিবোতে বলল, ”বল এবার।”
ভণিতা না করে কলাবতী বলল, ”তোদের ক্লাবে ভর্তি হব, উইকেটকিপিং প্র্যাকটিস করব।”
ধুপু বলল, ”আমাদের ক্লাবে একজন উইকেটকিপার আছে।”
”দু’জন থাকলে অসুবিধে হবে কি? একজন যদি কোনও কারণে না খেলতে পারে?” কলাবতী জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
ধুপু ভ্রূ কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত ভেবে বাকি ডিমটা মুখে পুরে বলল, ”আমাদের সেক্রেটারি ইন্দুদিকে জিজ্ঞেস করে পরশু তোকে বলব। তুই বল—টল ধরতে বা থামাতে পারিস তো?
