মেয়েদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল কলাবতীও। শুনে তারও মন খারাপ হয়ে গেল, শুধু টাকার অভাবে ক্রিকেট খেলার এই সুযোগটা, এত মেয়ের বন্ধুত্ব তাকে হারাতে হবে ভেবে। ক্রিকেট তো একা খেলা যায় না, একটা দল থাকতে হবে। দল না থাকলে তার খেলাও নেই। সেই দল গড়ে উঠছিল কিন্তু গড়ার মুখেই ভেঙে যেতে বসেছে।
সে জিজ্ঞেস করল, ”ফণীদা, কত টাকা হলে আমাদের আসল প্র্যাকটিস শুরু করা যাবে?”
ফণী ঘোষ মুখে ক্ষীণ ফুটিয়ে বললেন, ”তিন হাজার হলেই এখন চলবে।”
কলাবতী আর কিছু জিজ্ঞেস করল না, শুধু ভ্রূদুটো একবার ওপরে তুলে, কী যেন ভাবল।
রাজশেখরের ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে শুনেছিলেন ফণী ঘোষ। জিজ্ঞেস করলেন, ”কালু, এখন রাজু কেমন আছে?”
”সেরে গেছেন, তবে বেশ দুর্বল। আজ বলছিলেন আসবেন, আমি বারণ করলুম। এতটা পথ হেঁটে আসার জন্য শরীরে যথেষ্ট জোর এখনও ফিরে পাননি।”
”আজ বিকেলের দিকে রাজুকে দেখতে যাব আর সেইসঙ্গে দেখে আসব তোমাদের বাগানে তুমি কীরকম উইকেটকিপিং প্র্যাকটিস করছ।”
সিংহি বাড়ি ও বাগান প্রায় দু’বিঘে জমিতে। কলকাতা শহরে এতবড় জমিসমেত বাড়ি খুব কমই আছে। বাড়িতে থাকেন মাত্র পাঁচটি লোক। আর সবই ঠিকে ঝি—চাকর। বাড়ির সঙ্গের বাগানটি অযত্নেই পড়ে ছিল এতদিন। কলাবতীর প্র্যাকটিসের জন্য ঝোপঝাড় কেটে, ইটকাঠ সরিয়ে রাস্তার দিকের পাঁচিলের কাছে চাঁপাগাছের ধারে প্রায় দশ বর্গফুট জমি থেকে জনমজুর লাগিয়ে কাঁকর বেছে তুলে ফেলে, বড় বড় ঘাস ছাঁটাই করে এবং জল ঢেলে মাটি দুরমুশ দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে ক্রিকেট পিচ বানানোর চেষ্টা হয়েছে। সেখানে দশটা বল পড়লে অন্তত তিনটে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে ছিটকে যাবে, দুটো লাফিয়ে বুকের কাছে আসবে, দুটো আসবে জমি ঘষড়ে। বাকি তিনটে আসবে ঠিক উচ্চচতায়। এই পিচেই তিনটি স্টাম্প পুঁতে কলাবতী উইকেটকিপিং প্র্যাকটিস করে আসল ক্রিকেট বল দিয়ে। প্রথম দিন রাজশেখর নিজে আটটা লেগ ব্রেক বল করে হাঁফিয়ে পড়েন। আটটার মধ্যে চারটে কলাবতীর মাথার অনেক ওপর দিয়ে গিয়ে পাঁচিলে ঠকাস করে লাগে। বাকি চারটের মধ্যে দুটো রাজশেখরের থেকে পাঁচ হাত দূরে পিচ পড়ে তিনটে ড্রপ খেয়ে উইকেটকিপারের কাছে পৌঁছয়। আর দুটো গালির দিকে যেতে যেতে চাঁপাগাছের গুঁড়িতে ধাক্কা মারে।
মুরারি, অপুর মা কাছেই দাঁড়িয়ে ”কিরকেট” নামক এই অদ্ভুত খেলাটা দাদু ও নাতনি কেমন করে খেলে তাই দেখছিল। পাশে ছিল আর এক দর্শক, খয়েরি। ওদের শুনিয়ে লাজুক স্বরে রাজশেখর জানালেন, ”নাহ শরীরটা দুর্বল লাগছে। পঁয়তাল্লিশ বছর খেলা ছেড়েছি তারপর ক্রিকেট বল তো আর ছুঁইনি।…..মুরারি পারবি বল করতে? যা, কালু দিদিকে প্র্যাকটিস দে।”
আদেশটা প্রথম হৃদয়ঙ্গম করতে পারেনি মুরারি। সে শুধু দাঁত বার করে হেসে দাঁড়িয়ে রইল।
”মুরারি, কথাটা কানে গেল কী? বলটা নিয়ে এইভাবে কালুদিদির দিকে ছুড়ে ছুড়ে দিবি। ঠিক ওই জায়গাটায় যেন পড়ে।” এই বলে রাজশেখর বলটা ঢিল ছোড়ার মতো জোরে ছুড়ে কলাবতীর প্রায় দশ ফুট সামনে ফেললেন। উইকেটের পেছনে উবু হয়ে বসা কলাবতী অফস্টাম্পের এক হাত বাইরে পরিচ্ছন্ন ভাবে কোলের কাছে বলটা গ্লাভসে জমিয়ে নিল।
”দেখলি তো, এইভাবে ছোড় ঠিক ওইখানটায়।” রাজশেখর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। কলাবতী বলটা গ্লাভসে ধরে বোলারকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য উঁচু করে তুলে ছুড়ে দিয়েছে। বলটা রাজশেখরের দিকে না গিয়ে উঠল মুরারির মাথার ওপর। সে ‘হাই হাই’ বলে দু’হাত মাথার ওপর তুলল হরিনাম সঙ্কীর্তন করার মতো। বলটা তার মাথার ওপর পড়ত কিন্তু পড়ল কাঁধে, সেখান থেকে ছিটকে খয়েরির পাশ দিয়ে যেতেই, খয়েরি তাড়া করে বলটা কামড়ে ধরে দাঁড়িয়ে লেজ নেড়ে যেতে লাগল।
কলাবতী হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকল, ”আয়, খয়েরি আয়, বলটা দে।”
বল মুখে নিয়ে খয়েরি ছুটে এল কলাবতীর কাছে। ওর মুখ থেকে ক্রিকেট বলটা বার করে নিয়ে কলাবতী সেটা গড়িয়ে দিয়ে ”ধর ধর” বলে চেঁচিয়ে উঠল। খয়েরি বলের পেছনে ছুটল। বারো—চোদ্দো মিটার বলটা গেছে তখন গিয়ে বলটা মুখে ধরল যেভাবে সে তাড়া করে ইঁদুর ধরে বাগানে। বল মুখে সে ফিরে এল কলাবতীর কাছে। বলটা মুখ থেকে জমিতে নামিয়ে রেখে সে লেজ নাড়তে থাকল। লেজ নাড়াটা তার খুশির প্রকাশ। এখন সে একটু বাহবা চায়। অপুর মা ওর মাথা নেড়ে দিল।
উচ্ছ্বসিত কলাবতী বলল, ”দাদু, দেখো একটা ফিল্ডার পেয়ে গেছি।”
সে বলটা এবার আলতো করে তুলে নিল দাদুর দিকে। রাজশেখর লুফলেন। খয়েরি ধরবে বলে ছুটে গেল বল অনুসরণ করে। বল না পেয়ে খয়েরি দু—তিনবার ”ভৌ ভৌ” করে ডেকে বলটা চাইল। রাজশেখর খয়েরির মাথা চাপড়ে দিলেন। ”কী রে, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন!” তিনি ধমক দিলেন মুরারিকে।
মুরারি দু’বার ঢোক গিলে, অপুর মার আঁচল চাপা মুচকে হাসা মুখের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে রাজশেখরের হাত থেকে বলটা নিল। চোখ সরু করে রাজশেখরের দেখিয়ে দেওয়া জায়গাটার দিকে দশ সেকেন্ড একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলটা মিডিয়াম পেসে ছুড়ল। ঠিক জায়গাতেই পড়ে অফ কাটারের মতো লেগের দিকে বলটা প্রায় এক ফুট সরে গেল। কলাবতী বাঁ দিকে হাত বাড়িয়ে বলটা ধরে রাখতে না পারলেও থামিয়ে ফেলল।
