কলাবতী দু’হাতের চেটো পাশাপাশি জড়ো করে দেখাল।
”আঙুলগুলো আর একটু ফাঁক করে বল জমানোর জায়গাটা বড় করো আর একটা হাতের কড়ে আঙুলের ওপরে অন্য কড়ে আঙুলটা রাখলে বল গলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। আঙুল কখনও বল রিসিভ করার সময় বলের দিকে উঁচিয়ে রাখবে না, গ্লাভস জোড়া পেতে রাখবে, বলটাকে গ্লাভসে আসতে দেবে, জমা পড়লে হাত পেছন দিকে টেনে নিয়ে বলটা জমতে দেবে।” বলার সঙ্গে সঙ্গে মনা ভটচায সোফায় বসেই যথাসাধ্য দেখালেন। ”তোমাকে কিন্তু প্যাড আর গ্লাভস পরে বাড়িতে দু’হাত দিয়ে বল ধরার জন্য ডাইনে—বাঁয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াটা প্র্যাকটিস করে যেতে হবে। প্রথমে ক্যাম্বিস কি রবারের বলেই কোরো, তারপর ক্রিকেট বলে।”
কলাবতী মন দিয়ে শুনল। রাজশেখর জানতে চাইলেন, ”মনা এই যে বললে যেটুকু শিখেছি দেখে দেখে। কাকে দেখে শিখেছিলে।”
”খোকনদাকে।”
কলাবতী জিজ্ঞেসা করল, ”কে খোকনদা?”
রাজশেখর জানালেন, ”প্রবীর সেন, ডাকনামেই সবাই চিনত। প্রথম বাঙালি যিনি টেস্ট ম্যাচ খেলেন তাও আবার অস্ট্রেলিয়ার ব্র্যাডম্যানের টিমের এগেনস্টে।”
কলাবতী এবার লক্ষ করল বাক্সে চন্দ্রপুলি তলানিতে এসে ঠেকেছে। দুই বুড়োই কথার সঙ্গে মুখ চালিয়ে গেছে। সে হাত বাড়িয়ে বাক্সের ঢাকনা বন্ধ করে বলল, ”মনা দাদুর জন্য এনে তুমি নিজেই শেষ করে দিচ্ছ, আর নয়।”
বিব্রত এবং লজ্জিত রাজশেখর বললেন, ”শুনলি না মনা বলল ওর ডায়বিটিসটা বেশির দিকে, তাই যাতে আর বেশির দিকে না যায় সেজন্য চন্দ্রপুলি কমিয়ে দিলুম। বাড়িতে তো খাবার লোক নেই।”
.
ফণী ঘোষ সমস্যায় পড়েছেন। বোধ হয় মেয়েদের কোচিং করা আর সম্ভব নয়। ক্রিকেটের মতো খরচের খেলার জন্য প্রাথমিক যা—যা দরকার—বুট, ট্রাউজার্স, ব্যাটিং গ্লাভস, সম্ভব হলে নিজের ব্যাট এগুলো কিনে দেওয়ার মতো আর্থিক অবস্থা দু—তিনজন ছাড়া কোনও মেয়ের পরিবারের নেই। প্রগতি সঙ্ঘ তাদের মাঠ ব্যবহার করতে দিচ্ছে, তিনটে স্টাম্প, পুরনো একজোড়া ব্যাটিং প্যাড, গ্লাভস, দুটো পার্চমেন্ট মোড়া ফাটা প্র্যাকটিস ব্যাট আর দুটো পুরনো ক্রিকেট বল, যা বহুবার ব্যবহারে নরম এবং ফুলে বড় হয়ে গেছে, মেয়েরা পাঁচ আঙুলে ভাল করে ধরতে পারে না। প্রগতি সঙ্ঘের আর্থিক অবস্থাও ভাল নয়। সিনেমা শো, যাত্রাপালা, দুর্গাপুজোর সুভেনিরের বিজ্ঞাপন ও কয়েকজন ডোনারের টাকায় তাদের নেতাজি ও রবীন্দ্র জন্মোৎসব এবং ফুটবল ও ক্রিকেট বিভাগ চলে। সিজনের সময় একজন পার্ট টাইম মালী রাখা হয়। স্থানীয় কাউন্সিলারের বদান্যতায় দুর্গাপুজোর পর কর্পোরেশনের রোড রোলার এসে মাঠের মাঝখানটা রোল করে দেয়। সারা সিজন তাতেই চলে যায়। ম্যাচের দিন লাঞ্চের পাউরুটি—আলুর দম দেওয়া হয় কোয়ার্টার থেকে চাঁদা তুলে।
ক্লাবের সচিব তপন তরফে তপা বাগচি পরিশ্রমী এবং কাটখোট্টা ধরনের মানুষ। একদিন ফণী ঘোষকে বললেন, ”ফণীদা, মেয়েদের কাছ থেকে চাঁদা তুলুন। ওদের বলুন বিনা পয়সায় কিছু শেখা যায় না। ক্লাবই সব দেবে তা তো হয় না, স্কুলে পড়ার জন্য মাইনে দিতে পারে, ক্লাবে শেখার জন্য চাঁদাও দিতে হবে। ছেলেদের ব্যাট প্যাড গ্লাভস বেশিরভাগ মেয়েরই তো দেখছি ভারী হয়ে যাচ্ছে, ওরা তো ব্যাট তুলতেই পারছে না, প্যাড পরে ছুটতেও পারছে না। সবকিছুই একটু ছোট সাইজের কিনতে হবে, সেজন্য টাকার দরকার। যেমন—তেমন একজোড়া ব্যাট, দু’জোড়া করে প্যাড আর গ্লাভস কিনতেই তো আড়াই—তিন হাজার টাকা লাগবে। তার ওপর আছে বল। এতসব দেওয়া আমার ক্লাবের পক্ষে সম্ভব নয়, আপনি টাকা তুলুন, ডোনার খুঁজুন।”
ফণী ঘোষ অতঃপর স্থির করলেন যে—ক’টি মেয়ে এখনও আছে তাদের বাবা—মায়ের সঙ্গে কথা বলবেন, চারশো টাকা করে প্রত্যেকের কাছে চাইবেন। চারদিন ধরে তিনি তিনজন বাবা, একজন দাদু, একজন মায়ের সঙ্গে কথা বললেন। বাবারা সোজা বলে দিলেন, দিতে পারবেন না। একজন বাবা বললেন, ”ভেবে দেখি। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে লেখাপড়ার কতটা ক্ষতি হবে সেটা তো আগে ভেবে দেখা দরকার।”
আর একজন বললেন, ”প্রাইভেট টিউটরের মাইনে, তার ওপর ক্রিকেটের খরচ। না দাদা, পারব না।”
এক মা বললেন, ”অত শক্ত বলে খেলা! সেদিন মেয়ের আঙুলে বল লাগল, আজ তিনদিনেও ভাল করে আঙুল বাঁকাতে পারছে না। কলম ধরতে পারছে না। না বাপু ক্রিকেট খেলে কাজ নেই তার থেকে বরং টেনিস—মেনিস খেলা শেখাতে পারেন যদি তার ব্যবস্থা করুন। সেদিন টিভি—তে স্টেফিকে দেখছিলুম, কী সুন্দর যে লাগছিল। আপনি ডোনেশনের জন্য ভাববেন না।”
দাদু বললেন, ”ক্রিকেট খেলে কী হবে, মেয়েদের ক্রিকেটে কি টাকা আছে? চাকরি পাওয়া যাবে? ছেলেদের যত নাম বেরোয় কাগজে কই মেয়েদের নাম তো দেখি না? না মশাই, টাকাফাকা দিতে পারব না, যতটুকু শিখেছে তাই যথেষ্ট।”
অবশ্য একজন বাবা এককথার দিতে রাজি হলেন, আর একজন বললেন, ”জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে একটু টানাটানির মধ্যে পড়ে গেছি। বড় জামাইবাবুর বাইপাস সার্জারিতে অনেক টাকা দিতে হল। হাত এখন একদম খালি। তবে মাসে পঞ্চাশ টাকা করে চার মাসে দিতে পারি।”
ফণী ঘোষ আর কোনও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহ বোধ করলেন না। সকালে মেয়েরা মাঠে আসতে তিনি তাদের জড়ো করে বললেন, ”ক্রিকেট কী করে খেলতে হয় সে সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা আশা করি তোমাদের হয়েছে। একদমই খেলতে জানতে না, এখন তবু ব্যাট ধরা, বল করা, ফিল্ড করাটা তোমরা শিখেছ। এটা হল ভিত। এর ওপর একতলা, দোতলা তৈরি করতে করতে উঁচু বাড়ি তৈরি করা। এজন্য আসল ক্রিকেট সরঞ্জাম নিয়ে আসল প্র্যাকটিস করে যেতে হবে। সেই জিনিসগুলো পেতে হলে টাকা দিয়ে কিনতে হবে, কিন্তু টাকা আমাদের নেই। আমি চেষ্টা করেছি টাকা জোগাড়ের। তা তো তোমরা জানোই। তোমাদের বাড়ি বাড়ি গেছি কিন্তু—” ফণী ঘোষ মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন। তিনি নিজেও বিষণ্ণ বোধ করছেন। উৎসাহে টগবগ করা, খেলা শিখে বড় খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা উজ্জ্বল চোখগুলিকে ঝিমিয়ে যেতে দেখে তার মন দুঃখে ভরে গেল।
