কলাবতীর মনে পড়ল পুরনো খবরের কাগজ বিক্রি করার জন্য মুরারিদা একটা লোককে ডেকে এনেছিল। তার পিঠে ছিল থলি। ওজন করে সেগুলো থলিতে ভরে, মুরারিদার হাতে টাকা দিয়ে লোকটি থলি কাঁধে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে তখন কোথা থেকে খয়েরি ঘেউ ঘেউ করে ছুটে এল লোকটার দিকে। ভয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। খয়েরিও তার তিন হাত দূরে থেমে গিয়ে হিংস্রভাবে ডেকে যেতে লাগল। মুরারিদা চেঁচিয়ে লোকটিকে আশ্বাস দিয়ে বলল, ”ভয় পেও না, এ হচ্ছে নেড়িকুত্তা, এরা থলে হাতে লোক দেখলেই অমন করে ছুটে আসবে। আস্তে আস্তে গেটের দিকে এগিয়ে দাও।” লোকটি তাই করল। খয়েরি চিৎকার করতে করতে গেট পর্যন্ত গেল কামড়াবার ভয় দেখাতে দেখাতে, কিন্তু কামড়ায়নি।
কলাবতী একতলার ঘরের জানলা থেকে সব দেখছিল। মুরারির তাচ্ছিল্যে বলা ‘এ হচ্ছে নেড়িকুত্তা’ শুনে তার মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে উঠেছিল। ছুটে বেরিয়ে এসে সে খয়েরির গলার বকলস ধরে তাকে এলোপাতাড়ি চড়চাপড় মারতে মারতে ‘নেড়ি, নেড়িকুত্তা’ বলে চেঁচিয়ে যেতে লাগল। খয়েরি প্রথমে অকারণ প্রহারে হকচকিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে ‘আঁউ আঁউ’ শব্দ করে কলাবতীর হাত ছাড়িয়ে পালাতে চাইল। কিন্তু এত শক্ত করে কলাবতী বকলসটা ধরে ছিল যে, সে পারল না। এক্ষেত্রে অন্য কুকুর হলে মুখ ঘুরিয়ে কলাবতীর কবজির কাছে হাতটায় কামড় দিত। তা না করে খয়েরি তার পা মাটিতে ছড়িয়ে বসে পড়ে মাথায় পিঠে চড় খেয়ে যেতে লাগল আর ”উঁ উঁ” আওয়াজ করে গেল। মুরারি ছুটে এসে কলাবতীর হাত চেপে ধরে বলল, ”করছ কী কালুদিদি, থামো।” কলাবতী তখন বকলস ছেড়ে দেয়। ছাড়া পেয়েই ছুটে ফটক দিয়ে বেরিয়ে যায় রাস্তায়।
রাত্রে অপুর মা ফটকের বাইরে থেকে খয়েরিকে বকলস ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আসে।
”কালুদিদি এই নাও তোমার খয়েরিকে। রাগ করে ফটকের বাইরে বসে ছিল। ওকে তুমি নিজে হাতে খেতে দাও। মুরারিদা বলল, তুমি নাকি ওকে চোরের মার মেরেছ। করেছিল কী?”
”কিছু নয়। ও কেন বিলিতি কুকুর হয়ে জন্মাল না। তা হলে সবাই ওকে খাতির করত, ভয় পেত, ওকে ‘নেড়ি’ বলে তাচ্ছিল্য করার সাহস পেত না।” কলাবতী ঝাঁঝালো স্বরে বললেও, গলায় ছিল অভিমান আর অকারণে মারার জন্য অনুশোচনা।
কলাবতী সেদিন রাতে নিজের হাতে রুটি খাইয়েছিল এক হাতে খয়েরির গলা জড়িয়ে ধরে। খাওয়ার পর তার হাতটা বাড়িয়ে দেয় খয়েরির দিকে চাটার জন্য। অবশ্যই সে চেটেছিল, কেননা এভাবেই সে আদর জানায়।
গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিলেন রাজশেখর। তিনি পাশে দাঁড়ানো সত্যশেখরকে তখন বললেন, ”ঠিক যেন মা আর মেয়ে।”
.
কলাবতী অন্যমনস্ক হয়ে গেছল খয়েরির কথা ভাবতে—ভাবতে। মনা ভটচাযের কথায় তার হুঁশ ফিরে এল।
”তুমি পুষবে? অ্যাঞ্জেলার বাচ্চচা হলে তোমায় একটা দেব।”
”দরকার নেই, আমার আছে।” কলাবতী ছোট্ট জবাব দিয়ে হাসল।
”বটে, বটে, কী জাতের?” মনা ভটচায উৎসাহী হয়ে উঠলেন।
”নেড়ি।”
মনা ভটচাযের মুখ দেখে কলাবতীর মনে হল এমন জাতের নাম কখনও শোনেননি। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইলেন।
”ওকে কিনতে হয়নি। নিজের থেকেই এসেছে। ওকে বেঁধে রাখা হয় না, ও বাঁধা থাকতে চায় না। যে কেউই ওর গায়ে হাত দিতে পারে।” চাপা একটা গর্ব কলাবতীর স্বরে ফুটে উঠল। রাজশেখর প্রসঙ্গটা ঘোরাতে বলে উঠলেন, ”মনা, যেজন্য আসা। তুমি কালুকে কিছু টিপস দাও, যাতে ও উইকেটকিপার হতে পারে।”
”দ্যাখো, আমাদের সময়ে এখানকার মতো কোচিংটোচিং ছিল না। ব্যাট বা বলের জন্য তবু কোচ পাওয়া যেত কিন্তু উইকেটকিপারদের জন্য কিছুই ছিল না। একটু—আধটু যেটুকু শেখার শিখেছি ভাল উইকেটকিপারদের দেখে দেখে। আর বাকি বেশির ভাগটাই নিজের বোধবুদ্ধি দিয়ে আর অনবরত প্র্যাকটিস করে করে। উইকেটকিপিংয়ের ছকবাঁধা কোনও নিয়ম নেই। সুভাষ গুপ্তের বলে কোনদিকে কীভাবে ক্যাচ উঠবে কেউ জানে না; মুহূর্তের জন্যও কনসেনট্রেশন হারাবে না, বল থেকে চোখ সরাবে না। দিনে পঞ্চাশ ওভারের খেলায় একস্ট্রা বল বাদ দিয়ে তিনশো বল করা হয়, তার মানে তিনশো ওঠবোস। এজন্য আগে পায়ের, কোমরের জোর চাই। সারা ইনিংসে পাবলিক তোমার কথা ভুলে থাকবে, যেই একটা ক্যাচ কি স্টাম্প মিস করবে তখন তাদের তোমাকে মনে পড়বে আর সাতদিন ধরে খোঁটা শুনে যেতে হবে। আর একটা শক্ত ক্যাচ নিলে বা স্ট্যাম্প করলে জুটবে শুধুমাত্র কিছু হাততালি। যাক তোমাকে এইসব বলে নিরুৎসাহ করব না। দেখি তো উইকেটের পেছনে তুমি কীভাবে স্টান্স নাও।”
কলাবতী ঘরের ফাঁকা জায়গায় গিয়ে উবু হয়ে বসে, দু’পায়ের ফাঁকে মেঝের ওপর দুই হাতের মুঠি ঠেকিয়ে রাখল ঠিক সেইভাবে টিভি—তে যেরকমটি দেখেছে দেশি ও বিদেশি উইকেটকিপারদের। মন ভটচায চোখ দুটো সরু করে ওর বসার ভঙ্গি দেখে বললেন, ”নড়াচড়া চট করে করতে তোমার সুবিধে হয় এমনভাবে বসবে। পা দুটো অত কাছে রাখলে ডাইনে কি বাঁয়ে কুইক সরে যেতে পারবে না, দেরি হয়ে যাবে। আর বাটিংয়ের সময় যেমন স্টান্স নেয় তেমনই শরীরের ভর থাকবে পায়ের পাতার সামনের দিকে, গোড়ালি দুটোর ওপর ভর থাকলে ফুট ওয়ার্কে দেরি হয়ে যাবে। আচ্ছা এবার গ্লাভসে বলধরাটা দেখি।”
