”ওই এ কামাল একটা সেঞ্চুরি করেছিল, ন’নম্বরে ব্যাট করতে নেমে। বাংলার পক্ষে ওটাই প্রথম রঞ্জি সেঞ্চুরি।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়ছে রাজু। সুঁটে ব্যানার্জি ছিল দশ নম্বরে। দারুণ একটা স্ট্যান্ড দিয়েছিল কামালকে। সুঁটেদা নট আউট ছিল, তিন রানের জন্য হাফ সেঞ্চুরিটা হয়নি। কী, ঠিক বলেছি?” মনা ভটচাযের মুখ ঝলমল করে উঠল নিজের স্মৃতিকে আবার সবল করে তুলতে পেরে। ”আরও বলছি, বাংলা সেই প্রথম ফাইনালে উঠে খেলতে গেল বোম্বাইয়ে নওনগরের সঙ্গে। ভিনু মানকাদ তখন অল্পবয়সী ছেলে। কী মারটাই না দিল বেঙ্গলের বোলারদের। প্রথম দিনেই একশো পঁচাশি করে কমল ভটচাযের বলে ক্যাচ আউট হল। কাগজে মানকাদের ছবি দেখেছি। ব্লেজার পরা, গলায় সিল্কের স্কার্ফ। তখন ওটাই স্টাইল ছিল।” কথা শেষ করে মনা ভটচায বাক্সের দিকে হাত বাড়ালেন, রাজশেখরও পিছিয়ে রইলেন না।
”রোজ সকালে কাগজ এলেই ঝাঁপিয়ে পড়তুম। চারদিনের ম্যাচটা যেন চার ঘণ্টায় শেষ হল বলে তখন মনে হয়েছিল।” রাজশেখর স্মৃতি এবং চন্দ্রপুলি রোমন্থন করতে করতে বললেন। ”মনা, তোমার ভ্যান্ডারগুচ ফাইনালে ছিল বাংলার ক্যাপ্টেন, আর নওনগরের ক্যাপ্টেন ছিল আর এক সাহেব, যার কাছে মানকাদ বোলিং শিখেছিল, বার্টি ওয়েন্সলি। ফার্স্ট ইনিংসে ভ্যান্ডারগুচ দারুণ ব্যাট করে প্রায় আশি রান করেছিল। তবু বাংলা একশোরও বেশি রানে পিছিয়ে পড়েছিল। সেটা খানিকটা সামলায় সেকেন্ড ইনিংসে স্কিনার সাহেব একটা সেঞ্চুরি করায়। তবু আড়াইশোর মতো রানে বাংলা হেরেছিল।”
মনা ভটচাযের সঙ্গে রাজশেখরেরও চোখে বিষাদের ছায়া পড়ল। কলাবতীর মনে হল দু’জনে যেন বোম্বাইয়ে মাঠের ধারে বসে এই মাত্র বাংলাকে হেরে মাঠ থেকে ফিরতে দেখছেন।
রাজশেখর বললেন, ”সুঁটে ব্যানার্জি খেললে অবশ্য শেষ পর্যন্ত কী হত বলা যায় না। নওনগর ওকেই ভয় পাচ্ছিল তাই জামসাহেব ভাল চাকরির টোপ দিয়ে ওকে ফাইনালের ঠিক আগেই তুলে নিয়ে গেল। সুঁটে বলল ফাইনালে বাংলার এগেনস্টে খেলব না। জামসাহেব বলল, ঠিক আছে তবে বাংলার পক্ষেও খেলতে পারবে না। তখন তো এখনকার মতো আইনের বাঁধাবাঁধি ছিল না। যখন—তখন স্টেট বদল করা যেত।”
ওদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে কলাবতী একঘেয়ে বোধ করল। দু’জনে যেসব ঘটনার কথা বলে যাচ্ছে তার কিছুই সে বুঝতে পারছে না। কে মানকাদ, কে স্কিনার, কে সুঁটে, তারা কেমন খেলত তার বিন্দুবিসর্গ সে জানে না। তাদের কথা শুনতে তার একটুও আগ্রহ হচ্ছে না। বরং যেজন্য তার এখানে আসা সেই উইকেটকিপিং নিয়ে তো একটা কথাও এখন পর্যন্ত হল না।
এই সময় বাইরের দরজায় বেল বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ”ঘৌ ঘৌ” ডাক শোনা গেল। মনা ভটচায ঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, ”কোয়ায়েট, কোয়ায়েট।” ডাক থেমে গেল।
কৌতূহলে কলাবতী বলল, ”মনাদাদু, আপনার কুকুরটা কোন জাতের।”
”ডোবারম্যান।” মনা ভটচায ভারী গলায় জানালেন।” ”এক বছর বয়স, দেখতে চাও যদি দেখে এসো, এই পাশের প্যাসেজেই বাঁধা আছে।”
কলাবতী ঘর থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে উঠোন, তার ধার ঘেঁষে সাদা পাথরের একটা রোয়াকে ভেতর দিকে চলে গেছে দোতলার সিঁড়ি পর্যন্ত। তার মনে হল সিঁড়ির পেছনে অন্ধকারপ্রায় জায়গাটায় কুকুরটা বোধ হয় বাঁধা রয়েছে। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। একটা ”গরর গরর” আওয়াজ শুনেই সে আর এগোল না। উঁকি দিতেই চোখাচোখি হল কুকুরটার সঙ্গে। লম্বা পা, ছিপছিপে কিন্তু স্বাস্থ্যবান, চকোলেট রঙের শরীর, লোম মখমলের মতো ঝকঝকে, ল্যাজটা কারা। দুটো চোখের ঠাণ্ডা চাহনির আড়ালে যেন ভর করে রয়েছে নিষ্ঠুরতা। ভয়ে গা শিরশির করল কলাবতীর। মোটা চেন দিয়ে বাঁধা থাকলেও সে আর কাছে গেল না।
তার মনে পড়ল খয়েরিকে। কাকার কাছে তো কত মক্কেলই আসে, সবাই খয়েরির অচেনা। গেট থেকে বাড়ির সদরের মধ্যের রাস্তাটায় ও বসে বা শুয়ে থাকে। অচেনা লোকেরা ওর পাশ দিয়ে নির্ভয়ে যাতায়াত করে। একদিন সকালে সে গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখেছিল এক মক্কেল গেট দিয়ে ঢুকে ওকে দেখে অস্বস্তিতে দাঁড়িয়ে পড়ল। খয়েরি এখন অপুর মার যত্নে নাদুসনুদুস তাগড়াই হয়ে উঠেছে। নতুন কেউ ওকে প্রথম দেখলে ভয় পাওয়ারই কথা। কিন্তু আশ্চর্য ওর বোধশক্তি, ঠিক বুঝে যায় কে ভাল আর কে দুষ্টু লোক। সেদিন মক্কেলটি আড়ষ্ট হয়ে যেতে খয়েরি একটু একটু ল্যাজ নেড়ে জানিয়ে দিল, ভয় নেই গো আমি কামড়াব না। লোকটি তারপর সদর দরজার দিকে এগোলে খয়েরি তার পিছু নিয়ে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে।
কলাবতী ঘরে ফিরে আসতেই মনা ভটচার্য জিজ্ঞেসা করলেন, ”কেমন দেখলে?”
”দারুণ। এত ভাল কুকুর আমি আগে দেখিনি।” কলাবতী গলায় আন্তরিকতা ঢেলে দিয়ে বলল।
”সে কী দেখোনি! কলকাতায় বহু লোকই তো পুষছে। যেমন ইন্টেলিজেন্ট তেমনই ফেরোসাস আবার ডিসিপ্লিনডও। দেখলে তো, বেল বাজতেই ডেকে উঠল, আবার ‘কোয়ায়েট’ বলতেই চুপ করে গেল। আমি খুব সস্তায়ই পেয়েছি, তিন হাজারে।”
”আপনি ওকে আদর করেন?”
”আমি! না না, আমার কাজের লোক মৃত্যুঞ্জয় ওকে দেখাশোনা করে, খেতেটেতে দেয়। অ্যাঞ্জেলার গায়ে ও ছাড়া আর কেউ হাত দেয় না, দিতে দেয় না।”
