”পুরনো কলকাতা, আমাদের ছোটবেলার দিনকালের কথা, রাজু, মাঝে মাঝে ভাবি। আর অবাক হয়ে যাই। তোমার কি মনে আছে ইডেন গার্ডেনস আগে কীরকম ছিল? দেবদারু গাছে ঘেরা খোলা মাঠ। গঙ্গা থেকে বয়ে আসত বাতাস, কাঠের প্যাভিলিয়ন, বিরাট একা গোল ঘড়ি, তার তলা দিয়ে প্লেয়াররা মাঠে নামত। একটা কাঠের দোতলা স্কোর বোর্ড, তার একতলায় ছোট একটা ট্রেডল মেশিন নিয়ে ছাপাখানা, সেখানে স্কোর কার্ড ছাপা হত খেলা শুরুর আগে, লাঞ্চের সময় আর টি—এর সময় স্কোর ছাপা কার্ড বিক্রি হত। মোটা কাছির রোপ—এর ধারে ঘাসে হাত—পা ছড়িয়ে বসে আমি জীবনে প্রথম রঞ্জি ট্রফি ম্যাচ দেখি। মেজোকাকা নিয়ে গেছলেন তখন আমার বয়স বারো বছর।” একটানা বলতে বলতে মনা ভটচায ষাট বছর পিছিয়ে গিয়ে তার প্রথম দেখা রঞ্জি ম্যাচটাকে চোখের সামনে ভাসিয়ে তোলার চেষ্টায় চোখ মুছলেন। কলাবতী লক্ষ করল তার দাদুর চোখ অন্যমনস্কের মতো মনা ভটচাযের হাতের লাঠিতে তাকিয়ে।
”মনা, সেটায় বেঙ্গল খেলেছিল কার সঙ্গে বলো তো?”
”সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার সঙ্গে।”
”আরে আমিও তো ম্যাচটা দেখেছি। তিনদিনের ম্যাচ আড়াই দিনেই শেষ, থার্ড ডে লাঞ্চের পর। মুস্তাক আলির ওভারের শেষ বলে এক রান নিয়ে কার্তিক বোস এ—ধারে এল। বেঙ্গলের তখন জিততে দুটো রান দরকার, হাতে আটটা উইকেট। ক্যাপ্টেন ওয়াজির আলি বল করতে এল। কার্তিক বোস পুল করলে শর্ট স্কোয়্যার লেগে বিজয় হাজারে বলটা থামাল। পরের বলেই লেট কাট—বল থার্ডম্যান বাউন্ডারিতে যাচ্ছিল, ভায়া পয়েন্ট থেকে ছুটে গিয়েছিল বলটা ধরতে। অ্যালেক হোসি চিৎকার করে বলছিল, ‘বোস রান।’ ছুটে ওরা দুটো রান নেয়। ভায়া বলটা উইকেটকিপারের হাতে ছুড়ে দেওয়ার আগেই।” বলতে বলতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল রাজশেখরের মুখ। কলাবতী ভাবল, ছোটবেলা কী অদ্ভুত সময়, এত বছর পরও দুই বুড়ো হুবহু সব মনে রেখেছে। তাকেও সব মনে রাখতে হবে, এদের কথাবার্তাও। কে হাজারে, কে মুস্তাক আর ওয়াজির আলি সে জানে না তবে দাদু যেরকম সম্ভ্রম করে নামগুলো উচ্চচারণ করলেন তাতে তার মনে হল তিনজন খুবই বড় খেলোয়াড় ছিলেন।
”জানো রাজু, এই ম্যাচ দেখেই আমার ইচ্ছে হয়, উইকেটকিপার হব। বাংলার কিপার ছিল ভ্যান্ডারগুচ সাহেব। রোগা, সাড়ে ছ’ফুট লম্বা। মনে হত একটা সারস উইকেটের পেছনে উবু হয়ে বসে। ফার্স্ট ইনিংসে সুঁটে ব্যানার্জির বলে হাজারের যে ক্যাচটা ডান দিকে ঝাঁপিয়ে নিল, দেখে মনে হয়েছিল সারস উড়ল। সেকেন্ড ইনিংসে হাজারেকে স্টাম্পড করল টম লংফিল্ডের মিডিয়াম পেস বলে, ভাবতে পারো! আর একটা স্টাম্পড করল কমল ভটচাযের বলে ওয়াজির আলিকে।” বৃদ্ধ মনা ভটচায উৎসাহে উঠে দাঁড়ালেন লাঠি না ধরেই। রাজশেখর তাকে টেনে বসালেন।
”বোসো তো, মনা তোমার স্মৃতিশক্তি কেমন এবার তার পরীক্ষা নেব। বলো তো ওই ম্যাচে ক’টা বাঙালি খেলেছিল? বাংলা আট উইকেটে জিতে পরে কার সঙ্গে খেলে?”
মনা ভটচায মুখভরা হাসি নিয়ে বললেন, ”এ আর বলতে পারব না, ম্যাচটা হয়েছিল জানুয়ারির গোড়ায় আর পরের ম্যাচ জানুয়ারির শেষে ইডেনেই হায়দরাবাদের সঙ্গে, সেটা রঞ্জি সেমিফাইনাল। আর সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার সঙ্গে ম্যাচে তো বাঙালি ছিল। কার্তিক বোস, কমল ভটচায আর সুঁটে ব্যানার্জি, তিনজন। এ কামাল নামে একজন ছিল, তবে বাঙালি নয়। পরের ম্যাচেও ছিল এই তিন বাঙালি, আর এক সাহেবকে বাদ দিয়ে এল সুশীল বোস, চারজন।”
”এই হায়দরাবাদ ম্যাচেই বাংলার পক্ষে প্রথম একটা ব্যাপার হয়েছিল, বলতে পারো সেটা কী? আমার অবশ্য তখন অতশত বোঝার মতো বয়স ছিল না, পরে বাবার কাছে শুনি।” রাজশেখর মিটমিট হেসে তাকিয়ে রইলেন মনা ভটচাযের দিকে। তিনি চোখ কুঁচকে মুখ তুলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। দশ সেকেন্ড পর মুখ নামিয়ে আনলেন চন্দ্রপুলির বাক্সে। আনমনে বাক্সের ঢাকনা রাবার ব্যান্ড থেকে মুক্ত করে খুললেন। কিশমিশ বসানো আধফালি চাঁদের মতো থাক দেওয়া পুলির একটা তুলে তিনি রাজশেখরের দিকে এগিয়ে ধরলেন। রাজশেখর আড়চোখে লাজুক ভাবে নাতনির দিকে তাকিয়ে চন্দ্রপুলিটা হাতে নিলেন। কলাবতী আগে কখনও এইভাবে কারও হাত থেকে দাদুকে খাবার জিনিস নিতে দেখেনি।
বাক্সটা কলাবতীর সামনে ধরে মনা ভটচায বললেন, ”নাও।” সে দাদুর দিকে তাকাল।
রাজশেখর তখন চন্দ্রপুলিতে কামড় দিচ্ছেন। মাথা নেড়ে বললেন, ”তুলে নে। ফেলু ঘোষ দারুণ বানিয়েছে। মনা তুমিও তোলো।”
কলাবতী চন্দ্রপুলি তুলে নিয়ে তার একটা কোণ দাঁতে কাটল। মিহি করে বাটা নারকেল, ছানা আর ক্ষীর দিয়ে তৈরি পুলি মুখের মধ্যে দিয়ে চুষতেই মিলিয়ে গেল। কলাবতী অবাক হয়ে ভাবল, এমন একটা জিনিস আগে কখনও কেন খাইনি! সে অন্য দু’জনের দিকে তাকাল। মনা ভটচাযের হাতেরটা আধখানা, দাদুর হাত শূন্য।
”রাজু বসে আছ কেন, হাত চালাও।” নিজেরটা শেষ করে মনা ভটচায বাক্সের দিকে হাত বাড়ালেন। ”আমি কিন্তু আর খাব না, ডায়বিটিসটা একটু বেশির দিকেই।”
”মনা, আমার প্রশ্নের জবাবটা কিন্তু এখনও পেলাম না।”
”দেব, দেব, একটু ভাবতে দাও। নাও, আর একটা তোলো। কলাবতী লজ্জা কোরো না। আর একটা নাও। এত চন্দ্রপুলি খাবে কে? বাড়িতে তো আমি আর আমার বউ, তিনি তো মেয়ের বাড়ি গেছেন।…নাহ মনে পড়ছে না, তুমিই বলো।” মনা ভটচায হাল ছেড়ে দিলেন।
