মনা ভটচায উচ্ছ্বসিত স্বরে বললেন, ”হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে আছে। ফণী আজ দুপুরে ফোন করেছিল। তোমার নাতনিকে উইকেট—কিপার করতে চাও। এটা তো একটা থ্যাঙ্কলেস জব, তাও আবার মেয়েদের ক্রিকেট! মাঠে খেলা দেখার লোক হয় না, কাগজে রিপোর্টও করে না, আমি তো ভাল করে হাঁটতে পারি না, ওকে নিয়ে কাল বিকেলে আমার বাড়িতে এসো, যা বলার বলে দেব, করে দেখাতে তো পারব না। হাঁটু মুড়তে পারি না, আমার ঠিকানাটা লিখে নাও।”
রাজশেখর ঠিকানা লিখে নিয়ে বললেন, ”কাল বিকেলেই যাচ্ছি। খুঁজে বার করতে অসুবিধে হবে না, পার্ক সার্কাসের ওদিকটা আমার চেনা। আমার ছেলে সতু ডন বস্কোয় পড়ত।”
পরদিন কলাবতী স্কুল থেকে ফিরে পোশাক বদল করেই বেরিয়ে পড়ল। ১৯২৮ সালে তার ঠাকুর্দার বাবার কেনা হুড খোলা লম্বা পাদানি থাকা নিয়মিত ঝাড়মোছ করা ফোর্ড গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে রাজশেখর, তার পাশে গিয়ে বসল কলাবতী।
রাজশেখর ”পঁক পঁক” শব্দে বল হর্ন বাজাতেই মুরারি ছুটে গিয়ে ফটকের দুটো পাল্লা খুলে দিল। গাড়ি বেরিয়ে গিয়ে থামল। মুরারি আবার ফটক বন্ধ করে গাড়ির পেছনের সিটে এসে বসল। মানিকতলার মোড়ের কাছে রাজশেখর মোটর থামিয়ে পাঞ্জাবির বুক পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বার করে কলাবতীর হাতে দিয়ে বললেন, ”ওই যে ছোট্ট মিষ্টির দোকানটা দেখছিস, কড়াপাক নিয়ে আয়, মুরারি সঙ্গে যা।”
কলাবতী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ”একশো টাকার?”
জবাব দিল মুরারি, ”তবে না তো কী?”
দোকানের দিকে যাওয়ার সময় মুরারি চাপা গলায় চলল, ”কত্তাবাবু যখন বলে দেননি কত টাকার কিনতে হবে তখন ধরে নেবে সব টাকারই কিনতে হবে।”
দোকানটা সত্যিই ছোট্ট। একটা লম্বা কাচের শো—কেস। ওপরের তাকে স্টিলের ট্রেতে থরে থরে সাজানো সন্দেশ। নীচের তাকে গামলায় রসগোল্লা, রাজভোগ, ছোট একটা ক্যাশবাক্স নিয়ে দেওয়াল ঘেঁষে চেয়ারে বসে শীর্ণকায়, সাদা কদমছাঁট চুল, ফতুয়া গায়ে এক প্রৌঢ় বসে।
মুরারি তাকে বলল, ”নমস্কার ঘোষমশাই, কত্তাবাবু পাঠালেন। কড়াপাক দিন একশো টাকার। উনি গাড়িতে বসে। এই ওঁর নাতনি, দোকানটা চেনাতে পাঠালেন।”
ঘোষমশাই দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন শশব্যস্ত। গাড়ির কাছে এসে দু’হাত জোড় করে দাঁড়ালেন।
রাজশেখর বললেন, ”কেমন আছো গো ফেলু।”
ফেলু ঘোষ জানালেন, ”ভগবান আর আপনাদের দয়ায় ভালই আছি। আপনি ভাল তো? ছোটকর্তার বিয়ে হয়েছে?”
”হলে তো তুমিই আগে জানতে পারতে।”
”সন্দেশটা আজ নেবেন না বড়কর্তা। ছানাটা টিউকলের জলের কাটানো, বরং ক্ষীরের চন্দ্রপুলি আছে, সেটাই দিয়ে দিই।”
”চন্দ্রপুলি! এ আবার জিজ্ঞেস করে? দাও দিয়ে দাও, সন্দেশ থাক।”
এক—একটা পাঁচ টাকা। কুড়িটা চন্দ্রপুলির বাক্স একটা পলিথিন ব্যাগে হাতে ঝুলিয়ে মুরারি কলাবতীকে সঙ্গে নিয়ে ফিরল। মনা ভটচাযের বাড়ি খুঁজে নিতে ওদের অসুবিধে হল না। কোলাপসিবল গেটের পাশে কলিং বেলের বোতাম। গাড়ি থেকে নেমে মুরারি সেটা টিপতেই ভেতর থেকে ভারী গম্ভীর গলায়, ”ঘৌ ঘৌ ঘৌ” শব্দ উঠল। শুনলেই বোঝা যায় বড় বিদেশি কুকুরের ডাক। কেউ একজন চুপ করতে বলছে ওকে। আর কুকুরের ডাক শোনা গেল না।
মুরারি বলল, ”নির্ঘাত বিলিতি কুকুর। তাই এত সভ্য, চুপ করতে বললে চুপ মেরে যায়।”
কলাবতী বুঝল কথাটা খয়েরিকে ঠেস দিয়ে বলা হল। রাতে এক—একদিন ফটকের কাছে গিয়ে রাস্তার দিকে মুখ করে খয়েরি তারস্বরে চিৎকার করে রাস্তার কুকুরদের বাড়ির সামনে থেকে তাড়ায়। মুরারির ধমকানিকে সে তখন গ্রাহ্য করে না।
ভেতর থেকে গেটে এসে যে দাঁড়াল তাকে দেখেই বোঝা যায় সে এই বাড়ির মুরারি। গাড়িতে বসেই রাজশেখর ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ”এটা কি মণীন্দ্র ভটচাযের বাড়ি?”
”আজ্ঞে হ্যাঁ।”
”আছেন?”
”আজ্ঞে হ্যাঁ। অপেক্ষা করছেন।”
কলাবতী বুঝল, তারা যে আসবে সেটা বলে রাখা আছে। মুরারি পলিব্যাগটা হাতে নিয়ে দু’জনের পেছনে থেকে বাড়ির মধ্যে ঢুকে বৈঠকখানায় দরজা পর্যন্ত এসে ব্যাগটা কলাবতীর হাতে দিয়ে গাড়িতে ফিরে গেল।
”এসো, রাজু, এসো, কতকাল পরে—” মনা ভটচায সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন লাঠিতে ভর দিয়ে, দু’হাত বাড়ালেন। মাঝারি উচ্চচতা, টাক মাথা, বড় ভুঁড়ি, থলথলে চেহারা। কলাবতী হতাশ হল প্রাক্তন উইকেটকিপারের বপু দেখে। রাজশেখর ওকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ”তা তিরিশ—পঁয়ত্রিশ বছর তো হল।”
কলাবতী চন্দ্রপুলির বাক্স ভরা ব্যাগটা টেবলে রেখে মনা ভটচাযকে প্রথমে তারপর দাদুকে প্রণাম করল।
”এই বুঝি নাতনি, কী নাম গো তোমার?”
”কলাবতী সিংহ।”
”উইকেটকিপিং শিখবে? কিন্তু আমি তো ভাই, দেখছই, নড়াচড়া করতে পারি না লাঠি ছাড়া। এটা কী আনলে?”
পলিব্যাগ থেকে বাক্সটা বার করে রাজশেখর বললেন, ”তোমাকে কালুর প্রণামী—চন্দ্রপুলি। খেয়ে দেখো।”
”চন্দ্রপুলি! ওহহ, এ তো আজকাল চোখেই দেখা যায় না। খোঁজ করেছি, আমাদের এদিককার একটা দোকানেও নেই। নারকেলের মিষ্টি খাওয়ার লোক নাকি এখন আর পাওয়া যায় না।”
গলায় চাপা গর্ব মাখিয়ে রাজশেখর বললেন, ”থাকবে কী করে, এসব পুরনো কলকাতার আদি জিনিস। সকালবেলায় মাথায় হাঁড়িতে চন্দ্রপুলি, তিলকূট নিয়ে হাজির হত কেশবচরণ। বাবা খুব খেতেন। তাঁর কাছ থেকেই খাওয়াটা শিখেছি।”
