”খয়েরি মোটেই হ্যাংলা নয়। ও তো আসতেই চাইছিল না। দাদুই তো ওকে সঙ্গে করে আনতে বলল।”
”কত্তাবাবু বলেচেন! ভালই হল। বাগানটা ফাঁকা পড়ে থাকে। রেতে পাহারা দেবে। আটঘরায় আমাদের ময়রা পাড়ায় এই কুঁদো কুঁদো পাঁচ—ছ’টা কুকুর আছে। দিনের বেলা ঘুমোয় আর রেতে জেগে ঘোরাঘুরি করে। চোর—ছ্যাঁচোড় ভয়ে ও পাড়ার ধারেকাছে ঘেঁষে না। কিন্তু পাড়ায় মানুষকে ঠিক চেনে। কিচ্ছু বলে না। কালু দিদি তোমার মতো বয়সে আমার একটা সাদা কুকুর ছিল, নাম রেখেছিনু সায়েব। আমার হাতে ছাড়া কারুর হাতে ভাত খেতনি।” হঠাৎ অপুর মা’র গলা ধরে এল। ”বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি চলে গেনু। সায়েব আমাকে দেখতে না পেয়ে খাওয়া বন্দো করে দিল। তিনদিন খায়নি।” অপুর মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছল। ”বুঝলে গো বড্ড মায়া পড়ে যায়।”
”তারপর ভাতটাত খেত?” কলাবতীর স্বরে উৎকণ্ঠা ফুটে উঠল।
”খাবেনি কেন। তবে আগের মতো আর ছেল না। লাপানি—ঝাঁপনি, চিৎকার চেঁচামেচি কমে গেছল। আমি বাপের বাড়ি এলে তখন সবসময় আমার কাছে কাছে থাকত। বুড়ো হয়ে দু’দিনের অসুখে সায়েব মরে গেল। খবর পেয়ে আমি দু’দিন খেতে পারিনি।” অপুর মা আবার চোখে আঁচল দিল।
”এবার তুমি আমার খয়েরিকে দেখো।”
”দেখব।”
.
নাতনিকে ক্রিকেটের অ আ ক খ শেখাতে গিয়ে রাজশেখরের বয়স যেন পঞ্চাশ বছর কমে গেল। প্রতিদিন কলাবতীর সঙ্গে প্রগতি সঙ্ঘের মাঠে যান। মেয়েদের সঙ্গে থপ থপ করে একপাক দৌড়েই হাঁফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। ফণী ঘোষকে ঘিরে মেয়েরা দশ মিটার দূরত্বে গোল হয়ে দাঁড়ায়, তাদের সঙ্গে রাজশেখরও থাকেন। ফণী ঘোষ এক—একজনকে রবারের বল ছুড়ে দেন। প্রথম প্রথম বেশিরভাগ মেয়েরই হাতে লেগে বল ছিটকে যেত, রাজশেখরেরও তাই হত। পরে মেয়েরা ক্যাচ ধরাটা রপ্ত করে ফেলে, এমনকী তিনতলা উঁচু বল ছুড়ে দিলে এখন প্রায় সব মেয়েই লুফতে পারে। যারা পারে না ফণী ঘোষ তাদের দেখিয়ে দেন দুটো তালু ক্যাচ ধরার সময় কেমনভাবে রাখতে হবে, শরীরের অবস্থান তখন কেমন হবে আর বারবার বলে দেন বলের থেকে একদম নজর সরাবে না।
বল লোফা, জোরে গড়িয়ে দেওয়া বল ছুটে এসে কুড়িয়ে তুলে ছুড়ে ফেরত দেওয়া আর ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম কিছুদিন করার পর একটি মেয়ে সবার হয়ে একদিন বলল, ”ফণীদা, আমরা কবে ব্যাট করব?”
ফণী ঘোষ ওদের আশ্বস্ত করে বললেন, ”হবে হবে। আগে ব্যাট ধরা, ব্যাট হাতে ক্রিজে দাঁড়ানো, ব্যাট তোলা, এগিয়ে পিছিয়ে বল থামানো এগুলো না শিখলে ব্যাট করা যায় না। তোমাদের কারুর ব্যাট আছে?”
সবাই চুপ, কলাবতীও। দাদুর ছিল পঞ্চাশ বছর আগে। এক বন্ধুর ছেলেকে সেটি দিয়ে দেন খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর।
একটি ছোট্ট মেয়ে বলল, ”আমার দাদার ব্যাট আছে। আমাকে একদম হাত দিতে দেয় না। ছাদে একা—একাই ব্যাট চালায় আর বলে এই দ্যাখ শাস্ত্রীর চাপাটি শট, এই দ্যাখ কপিলদেবের নটরাজ শট।”
ফণী ঘোষ বললেন, ”তুমি যেন এখনি চাপাটি—নটরাজ করতে যেও না। আগে অ—য় অজগর আসছে তেড়ে, তারপর রাখাল অতি সুবোধ বালক, তারপর ঐক্য বাক্য মাণিক্য—এইভাবে ধাপে ধাপে শিখতে হবে।”
কমিউনিটি হলের সামনেটা সিমেন্ট করা একটা চাতালের মতো। ফণী ঘোষ একদিন একটা টেনিস বল আর নিজের ব্যাটটা নিয়ে শুরু করলেন সেই চাতালে ব্যাটিং শেখানো। কয়েক মিনিটেই হতাশ হয়ে পড়লেন। ব্যাটটা ওদের পক্ষে বড়। লম্বা কলাবতী এবং আর একটি মেয়ে ছাড়া আর একজনও ব্যাট সোজা রেখে খেলতে পারছে না। অনেকের পক্ষে ব্যাটটা ভারীও।
ব্যাটিং শেখানো বন্ধ করে ফণী ঘোষ বললেন, ”রবারের বল খেলার জন্য কম দামি ছোট সাইজের চল্লিশ—পঞ্চাশ টাকার ব্যাট দোকানে পাওয়া যায়। তোমরা তাই কিনে আনো।”
তিনদিন পরে একটিমাত্র মেয়ে ব্যাট হাতে এল। একজন জানাল, ”বাবা বলেছে এই তো জুতো, প্যান্ট কিনে দিলুম, এখন আর ব্যাট কিনে দিতে পারবে না।” অন্যরা প্রায় একই ধরনের কথা বলল।
একদিন রাজশেখরের খেয়াল হল শুধু ব্যাট, বল, ফিল্ডিং করে তো একটা টিম খেলতে পারে না, একজন উইকেটকিপারও তো চাই। কথাটা ফণী ঘোষকে বলতে, তারও ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ”এটা আমি অনেকদিন আগেই ভেবেছি।” ফণী ঘোষ বললেন, ”গোলকিপারের মতো উইকেটকিপারও জন্মায়। ওদের তৈরি করা যায় না। আমি লক্ষ করেছি তোমার নাতনিটির মধ্যে উইকেটকিপার হওয়ার গুণগুলো আছে, ওকে উইকেটকিপিং প্যাড আর গ্লাভস কিনে দাও আর বাড়িতে প্র্যাকটিস করাও আলাদা ভাবে।”
রাজশেখর অসহায়ভাবে বললেন, ”কিন্তু আমি তো উইকেট কিপিংয়ের বিন্দুবিসর্গও জানি না।”
ফণী ঘোষ বললেন, ”কালীঘাটের মনা ভটচাযকে মনে আছে? গোটা দশেক রঞ্জি ম্যাচে উইকেটকিপ করেছে। এখন লাঠি নিয়ে হাঁটে, বাতে পঙ্গু। টেকনিক্যালি সাউন্ড ছিল। ফিফটি নাইনে পুনা ক্যাম্পে একটা ট্রায়াল ম্যাচে সুভাষ গুপ্তের বলে দাত্তু গায়কোয়াড়ের স্টাম্পিং মিস করে ওর ইংল্যান্ড ট্যুরে যাওয়া হয়নি, গেল নানা জোশি। মনার টেলিফোন নাম্বার দিচ্ছি, ওর সঙ্গে কথা বলে নাতনিকে নিয়ে ওর কাছে যাও। খুব খুশি হবে।”
সেদিনই সন্ধ্যায় রাজশেখর ফোন করলেন মনা ভটচাযকে।
”আমি রাজশেখর সিংঘি বলছি। মনে পড়ছে, টাউন ক্লাবের রাজু সিংঘি।”
