তখনই রাজশেখর চেঁচিয়ে ডাকলেন, ”কালু এবার বাড়ি চল।”
”আয় আমার সঙ্গে, কিনে দেব আর একটা”—কলাবতী চাপাস্বরে বলল খয়েরিকে। খয়েরি বুঝতে পারল কলাবতীর মমতাভরা কথার মানেটা। তাকে অনুসরণ করে সে রাজশেখরের কাছে এসে কলাবতীর পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।
”আবার এসো রাজু। বাচ্চচাদের সঙ্গে দৌড়লে ওরা উৎসাহ পাবে, সিরিয়াস হবে, তোমারও উপকার হবে।” ফণী ঘোষ বললেন।
”উপকার মানে তো খিদে বাড়বে।” রাজশেখর বললেন, ”আসব, তবে রোজ আসতে পারব না।”
ফণী ঘোষ কলাবতীকে বললেন, ”তুমি কিন্তু রোজ আসবে। বাড়িতে এমন এক দাদু থাকতে তোমাকে আমি আর কী ক্রিকেট শেখাব। গোড়ার ব্যাপারগুলো ওর কাছেই শিখে নিও। কীগো রাজু, শেখাতে পারবে না?”
রাজশেখর হাসলেন, ”চল কালু, বেলা বাড়ছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে।”
ওরা কোয়ার্টারের গেট থেকে বেরোচ্ছে, তখন খয়েরি ছুটে এল। রাজশেখর আগেই খয়েরিকে লক্ষ করেছিলেন, বললেন, ”সেই কুকুরটা মনে হচ্ছে। ওকে তো খাওয়ালি, এবার আর তোকে ছাড়বে না। ও তোকে বুঝে গেছে।”
”কী বুঝে গেছে?” কলাবতী জানতে চাইল।
”তুই ওকে ভালবাসিস। জন্তু—জানোয়ার, পাখিরা মানুষ চেনে। কে ভাল, কে দুষ্টু ওরা ঠিক বুঝতে পারে।” রাজশেখরের মুখে হাসি ফুটে উঠল। ”তুই পাশ করে গেছিস।”
দাদুর কথায় কলাবতীর মন আনন্দে ভরে গেল। খয়েরি জানিয়ে দিয়েছে সে ভাল লোক। ”দাদু ওকে আর একটা পাউরুটি কিনে দাও না! একটা খেয়ে ওর খিদে যায়নি। দেখছ কী রোগা হয়ে গেছে না খেতে পেয়ে।”
নাতনির চোখেমুখে দয়া করুণা মমতা উপচে উঠছে দেখে রাজশেখর মনে—মনে অত্যন্ত প্রীত হলেন। তিনি এটাই তো দেখতে চান, কলাবতী সুন্দর একটা মন পাক, চমৎকার স্বাস্থ্য পাক।
বাড়ি ফেরার পথে আর একটা দোকান থেকে রাজশেখর বড় সাইজের একটা পাউরুটি কিনলেন।
”রাস্তায় নয়, বাড়ি গিয়ে ওকে খেতে দেব।”
”ওকে বাড়ি নিয়ে যাব?” অবিশ্বাসের সুর কলাবতীর প্রশ্নে গোপন রইল না।
”ওকে পুষতে তোর ইচ্ছে করছে?”
”হ্যাঁ।” কলাবতী মাথাটা হেলিয়ে কাঁধে ছুঁইয়ে দাদুর হাত ধরল।
ক্ষুধার্ত খয়েরি ওদের দু’জনের সঙ্গে এবং পাউরুটির পিছু নিয়ে সিংহিবাড়ির ফটক পেরিয়ে ঢুকল। বাড়ির সদর দরজার সামনে পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
”বাড়ির মধ্যে ঢোকাসনি, গায়ে ভীষণ নোংরা। এখানেই খেতে দে।” রাজশেখর মোড়কে মোড়া পাউরুটিটা কলাবতীর হাতে দিয়ে বললেন, ”সবটা খাইয়ে দিসনি।”
”দাদু ওকে চান করাব?” কলাবতী মোড়ক খুলে পাউরুটির খানিকটা ছিঁড়ে খয়েরির মুখের সামনে ধরে বলল।
”রাস্তার কুকুর, চান করার অভ্যেস তো নেই। গায়ে জল ঢাললেই ছুটে পালাবে। ধরেবেঁধে করাতে গেলে চেঁচামেচি করবে, কামড়ে দিতেও পারে। বাচ্চচা কুকুর তো নয়।”
পাউরুটির আর একটা টুকরো ছিঁড়ে কলাবতী বলল, ”বড়দির মঙ্গলার মতো একটা বকলেস আর চেন কিনে দেবে দাদু?”
”চেন দিয়ে বেঁধে রাখার মতো কুকুর তো এরা নয়, এরা ছাড়া থাকলেই ভাল থাকে। তবে একটা বকলেস পরালে লোকে জানবে ও বাড়ির পোষা কুকুর, আচ্ছা কিনে এনে দেব।” এই বলে রাজশেখর বাড়ির মধ্যে ঢুকতে গিয়ে থেমে গেলেন। ”আর একটা রবারের বল।”
সত্যশেখর সকালে একবার সেরেস্তায় বসে কোর্টে বেরোনোর আগে। সেদিন যার মামলা পড়েছে এমন দু—তিনজন মক্কেল তখন আসে। দোতলা থেকে নেমে সেরেস্তায় ঢোকার সময় খোলা সদর দরজার দিকে তার চোখ পড়ল।
”আরে কালু, ওটা আবার এসেছে আর তুই ওকে খাওয়াচ্ছিস?”
”আমি নয়, দাদু খাওয়াচ্ছে। দাদুই তো পাউরুটি কিনে ওকে ডেকে আনল।” কলাবতী জানে চুলে পাক ধরলেও কাকা এখনও ভয় পায় দাদুকে। সে তাই বর্মের মতো দাদুকে সামনে রেখে খয়েরিকে আড়াল করল।
”বাবা, ডেকে আনল।” সত্যশেখর ভ্রূ কুঁচকে সেরেস্তায় ঢুকে গেল।
মুরারি বেরিয়ে এল ভেতর থেকে। কলাবতী তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ”চললে কোথায় মুরারিদা?”
”মুদির দোকানে। আজ রথযাত্রা, ছোটবাবু তেলেভাজা খাবে। পাঁপড় আর ব্যাসম কিনতে যাচ্ছি।” মুরারির চোখমুখ কুঁচকে গেল খয়েরিকে দেখে। ”রথের দিন প্রাণীকে খাওয়ালে পুণ্যি হয়। খাওয়াও। জগন্নাথ বাবা খুশি হবেন।”
”শুধু আজ নয়, খয়েরি রোজ দু’বেলা খাবে। ও এবার থেকে এখানেই থাকবে, আমি ওকে পুষব।”
”য়্যা!” মুরারি প্রায় বজ্রাহতের মতো সাত—আট সেকেন্ড তাকিয়ে রইল খয়েরির দিকে। ”এই চিমড়ে রাস্তার নেড়ি কুকুরাকে পুষবে তুমি? মাথা খারাপ হয়েছে তোমার! কত ভাল—ভাল লোমওলা সুন্দর—সুন্দর বিলিতি কুকুর থাকতে শেষে কিনা—কত্তাবাবু জানে?”
”জানে মানে। দাদুই তো ওকে নিয়ে এল। খাইয়ে দাইয়ে মোটা করে দেব। দেখবে তখন বিলিতি কুকুরের থেকেও সুন্দর হয়ে যাবে, তাই না রে খয়েরি?” কলাবতী ওর মাথার হাত বুলিয়ে দিল, খয়েরি লেজ নাড়ল।
”ও বাব্বা, নামকরণও হয়ে গেছে, খয়েরি!” আকাশের দিকে তাকিয়ে মুরারি বলল, ”বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে, যাই দোকানটা সেরে আসি।”
”এখানে বোস। জল এনে দিচ্ছি।”
খয়েরিকে বসতে বলে কলাবতী ভেতরে গেল। অপুর মা রান্নাঘরে।
”একটা বাটিতে জল দাও তো, খয়েরি খাবে।”
অপুর মা অবাক হয়ে বলল, ”খয়েরি কে?”
”সেই কুকুরটা, যাকে সেদিন তুমি গেটের কাছে দেখেছিলে।”
”আবার এসেছে। জানতুম আসবে। ডেকে খাইয়েছ যখন, তখন রোজ আসবে। পেলাসটিকের ওই মগটায় করে জল দাও।”
