”রাজু এই মেয়েরা কিন্তু একদমই দৌড়তে জানে না। দৌড়নোটা শেখার জিনিস। এমনকী হাঁটাও। প্রায়ই চোখে পড়ে লোকে কী বিশ্রীভাবে হাঁটছে। কেউ ঝুঁকে, কেউ বেঁকে, কেউ ডাইনে—বাঁয়ে দুলে দুলে, কেউ থপ থপ করে। এজন্য দশ—বিশ বছর পর হাড়ের রোগ হয় সেটা কেউ ভেবে দেখে না। দৌড়নো কি হাঁটা, সে আবার শিখতে হবে নাকি; এই হচ্ছে মনোভাব!” ফণী ঘোষ বললেন একটু গলা তুলে, যাতে মেয়েরা শুনতে পায়।
রাজশেখর বললেন, ”ঠিক একই ব্যাপার আমাদের বাংলা শেখার ক্ষেত্রেও ঘটে। বাঙালি আমরা, জন্ম থেকেই বাংলায় কথা বলি, বাংলা বই পড়ি, আমাদের আবার এটা শিখতে হবে নাকি? অথচ কী গাদা গাদা ভুল বাংলায় যে লিখি, কত যে বানান ভুল করি তার ঠিকঠিকানা নেই। ব্যাকরণটাও ভাল করে পড়ি না। যাক গে এসব কথা, তোমায় বলি এই মেয়েদের মধ্যে আমার নাতনিও আছে তবে সে কোনজন তা কিন্তু তোমায় বলব না।”
”না বললেও আমি জানি, তোমার সঙ্গে যে কালো মেয়েটি এল, সেই তো? ওর চালচলন অ্যাথলিটদের মতো, সবার মধ্যে আগে চোখে পড়ে যায়।”
এই সময় একটি মেয়ে ফণী ঘোষকে জিজ্ঞেস করল, ”ফণীদা নেট তো লাগানো হয়নি। আমাদের প্র্যাকটিস কখন শুরু হবে?”
”আগে দৌড়তে শেখো, এক্সারসাইজ করে মাসলগুলোকে চাঙ্গা করে তোলো, দু’হাতে বল ধরতে শেখো, থামাতে শেখো, ছুড়তে শেখো, ধৈর্য ধরতে শেখো, তারপর বল করতে ব্যাট করতে শিখবে, তারপর নয় নেটের কথা ভাবা যাবে। আজ তোমাদের শুধু দেখে নিলাম, কাল ঠিক ছ’টায় আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকব, তোমরা আসবে, দৌড় শেখাব। যা বলেছি, সঙ্গে একটা রবারের বল আনবে। কেডস পরে আসবে। সালোয়ার কামিজ চলবে না।”
একটি ছোট্ট মেয়ে বলে উঠল, ”ফণীদা, ছবিতে দেখেছি ইন্ডিয়ান টিম হাফপ্যান্ট পরে দৌড়চ্ছে। আমি হাফপ্যান্ট পরে আসব?”
”বাড়িতে আপত্তি না থাকলে সবাই পরে আসতে পারো। গরমে সেটাই তো ভাল। আপত্তি থাকলে স্কার্ট পরবে। আজ তোমরা বাড়ি যাও। মনে রেখো কাল ছ’টায়।”
.
মেয়েরা সবাই চলে যাচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ে ফণী ঘোষ রাজশেখরকে বললেন, ”বাচ্চচাদের উৎসাহটা দেখলে, এখনই নেট চাই! গাছে না উঠেই এককাঁদি, এই মনোভাবটা বদলানো দরকার। ক্রিকেট ধৈর্যের খেলা, গাওস্করের একটা ইনিংস যদি এদের দেখাতে পারতুম।” ফণী ঘোষ আফসোসে মাথা নাড়ালেন।
রাজশেখর বললেন, ”এই মনোভাবটাই শেষ করে দিয়েছে একদিনের ক্রিকেট। ক্রিকেট এখন দেড় ঘণ্টার ফুটবল ম্যাচের মতো খেলা হচ্ছে। আরে বাবা বিজয় হাজারের হাত জমাতেই তো দেড় ঘণ্টা লেগে যেত।”
দুই বৃদ্ধ যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরনো আমলের গৌরব রোমন্থনে ব্যস্ত তখন কলাবতীর চোখ পড়ল কমিউনিটি হল ও পাম্পঘরের মাঝে তিন হাত চওড়া গলির মতো ফাঁকা জায়গাটার দিকে। মিশরের পিরামিডের পাশে দুটি পা সামনে রেখে বসে থাকা সিংহের দেহ আর মানুষের মাথাওলা স্ফিংসের মতো বসে কিছু একটা মুখে নিয়ে চিবোবার চেষ্টা করছে যে কুকুরটি তাকে সে দূর থেকেই চিনতে পারল মাথার সাদা টুপিটি দেখে—খয়েরি। খয়েরিকে যে সে আবার দেখতে পাবে কখনও মনে হয়নি। তাই সে খুব অবাক হল। তার মনে হল এটা যেন ভাগ্যের লুকোচুরি খেলা।
সে দ্রুত হেঁটে খয়েরির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুখ নিচু করে খয়েরি সাদা একটা হাড় কামড়ে ভাঙার চেষ্টা করছে। হাড়টা একটা পাঁঠার টেংরি, তাতে এককণাও মাংস লেগে নেই। কলাবতী বুঝল খিদের জ্বালায় ওই হাড়টাই ভেঙে খাওয়ার চেষ্টা করছে। হাড়টা মোটা তাই পারছে না। হঠাৎ একজনকে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে খয়েরি চোখ কপালের দিকে তুলে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড পর চিনতে পেরে ল্যাজ নাড়ল, উঠে বসল। কলাবতী দেখল খুব রোগা হয়ে গেছে খয়েরি। কোমরের দুটো হাড় প্রকট হয়ে উঠেছে। বুকের পাঁজরের হাড়ও দু—তিনটে গোনা যায়।
খয়েরির সামনে উবু হয়ে হাঁটু ভেঙে বসল কলাবতী। ডান হাত ওর মাথায় রাখতেই আহ্লাদে কান দুটো ঘাড়ের সঙ্গে মিশিয়ে জোরে জোরে ল্যাজটা নাড়তে লাগল। মুখ দিয়ে ”কুঁই—কুঁই’ শব্দ বেরিয়ে এল। তারপর সে মাথায় রাখা কলাবতীর হাত চাটার জন্য মুখটা এপাশ—ওপাশ করতে লাগল।
”খুব খিদে পেয়েছে।” কলাবতী জানতে চাইল। ”আয় আমার সঙ্গে। বাড়িতে রুটি আছে। মাখন, জেলি, ডাল, ভাত, মাছ, দুধ সব আছে। খাবি তো আমার সঙ্গে আয়।” এই বলে সে হাঁটতে শুরু করল দাদুকে লক্ষ করে। কয়েক পা গিয়ে সে ফিরে তাকিয়ে দেখল খয়েরি আসছে না।
”আয়, আয়” বলে সে কয়েকবার ডাকল। খয়েরি ল্যাজ নাড়ল কিন্তু এগিয়ে এল না। কলাবতী দাদুর কাছে এসে বলল, ”দুটো টাকা দাও তো।”
”কী হবে টাকা?” রাজশেখর বললেন।
”দাও না, দেখতেই পাবে।” বায়নাধরা আদুরে গলায় কলাবতী বলল।
রাজশেখর ট্রাউজার্সের পকেট থেকে কয়েকটা নোট বার করে তার থেকে একটা নোট নাতনির হাতে দিলেন। ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে কলাবতী তীরবেগে কোয়ার্টারের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। এখানে আসার সময় সে দেখেছে কোয়ার্টারের পাঁচিলের লাগোয়া একটা ছোট্ট স্টেশনারি দোকানের কাউন্টারে থাক দিয়ে পাউরুটি সাজানো।
যাওয়ার মতোই তীরবেগে সে ফিরে এল। খয়েরি আবার হাড়টা নিয়ে কামড়াকামড়ি শুরু করেছে।
”থাক ওটা আর খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে না, এবার এটা খা।” মোড়ক থেকে পাউরুটি বার করে আধখানা ভেঙে সে খয়েরির মুখের সামনে ধরল। সঙ্গে—সঙ্গে সেটা পেটের মধ্যে চালান হয়ে গেল। বাকি আধখানারও একই হাল হল। এর পর খয়েরি জুলজুল করে তাকিয়ে আছে দেখে কলাবতীর মন কষ্টে ভরে গেল। বেচারা, এখনও খিদে যায়নি। সে ভাবল, আবার একটা পাউরুটি কিনে আনবে কি?
