”দাদু, ফণী ঘোষের বাইশ বলে নিরানব্বইটা কোন ধরনের ক্রিকেট ছিল?” কলাবতী চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রইল।
রাজশেখরের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল শান্ত হাসি। ”ক্লিন অ্যান্ড ক্ল্যাসিকাল হিটিং। প্রত্যেকটা স্ট্রোকে ছিল ব্যাটিংয়ের গ্রামার। এখনও চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফণী ঘোষের লম্বা রোগা শরীরটা এক পা বেরিয়ে এসে গুডলেংথ বলটা তুলে দিচ্ছে একস্ট্রা কভারের মাথার ওপর দিয়ে। মার খেয়েছি বটে, কিন্তু ওর ব্যাটিং দেখে সুখও পেয়েছি।”
পরদিন সকালে জগ করতে করতে দাদু আর নাতনি প্রগতি সঙ্ঘের মাঠে পৌঁছল। মাঠটির তিনদিকে টানা বারান্দার তিনটি চারতলা বাড়ি। বারান্দার সঙ্গেই পাশাপাশি এক কামরার ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাট আছে মোট আশিটি। মাঠের আর একদিক পাঁচিল ঘেরা, তারপরই রেল লাইন। কলাবতীদের বাড়ি থেকে মাঠটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। মাঠের একধারে একটা ছোট ঘর তাতে ট্যাঙ্কে জল তোলার জন্য পাম্প আছে। তার পাশে কম্যুনিটি হল। এটাই ক্লাবঘর। নাটক হলে এখানেই হয় রিহার্সাল। দুর্গাপুজোর অষ্টমীতে এই হলঘরে টেবল পেতে আশিটি ফ্ল্যাটের লোক খিচুড়ি খায়। মাঠটিতে সিক্স—আ—সাইড ফুটবল টুর্নামেন্ট হয় প্রতি বছর।
কোয়ার্টারের দুই লোহার পাল্লার চওড়া বড় একটা প্রধান দরজা আছে। অধিকাংশ সময়ই সেটা বন্ধ থাকে। বাইরে থেকে মাঠে আসার জন্য আছে ছোট্ট লোহার গেট, যা দিয়ে একজন মানুষ ঢুকতে বা বেরোতে পারে। ওরা দু’জন মাঠে এসে দেখল লম্বা রোগা মাথাভরা পাকা চুল, সাদা ট্রাউজার্সে গোঁজা সাদা টি শার্ট, সাদা কেডস, কুচকুচে কালো গায়ের রং, একটি লোক তাকে ঘিরে জনাপনেরো কিশোরী। বেশিরভাগ মেয়ের পরনে স্কার্ট ব্লাউজ। দু—তিনজন পরেছে সালোয়ার কামিজ। লোকটির হাতে একটি ক্রিকেট ব্যাট। তিনি মেয়েদের কী যেন বলছেন। কলাবতী ধুপুকে দেখতে পেল না।
রাজশেখর উত্তেজিত চাপা গলায় বললেন, ”কালু, এই লোকটাই ফণী ঘোষ। ” বলেই তিনি এগিয়ে গেলেন।
”তোমরা কেউ কি কখনও ক্রিকেট খেলেছ।” ফণী ঘোষ মেয়েদের জিজ্ঞেস করলেন।
সবাই চুপ। শুধু একজন বলল, ”বারান্দায় ছোট ভাইকে গড়িয়ে গড়িয়ে বল করেছি।”
ফণী ঘোষ সবার মুখে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, ”আগে সবাই ব্যাট হাতে নিয়ে ফিল করে দ্যাখো জিনিসটা কেমন। তারপর শিখবে কেমন করে ব্যাট ধরতে হয়, কেমন করে ব্যাট হাতে দাঁড়াতে হয়, কিন্তু সবার আগে দৌড়নোটা শিখতে হবে, একটু ব্যায়াম করে নিতে হবে।” ফণী ঘোষ ব্যাটটা সামনের মেয়েটির হাতে তুলে দিলেন।
”আরে ফণী। তুমি এখানে?” রাজশেখর এগিয়ে মুখোমুখি হলেন ফণী ঘোষের।
”দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল লোকটাকে ঠিক যেন রাজুর মতো দেখতে। তুমি কিন্তু মোটা হয়ে গেছ।” ফণী ঘোষ দু’হাত দিয়ে রাজশেখরের ডান হাতটা চেপে ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন।
”তুমি দেখছি আর একটু রোগা হয়েছ।”
”কত বছর পর দেখা হল!” ফণী ঘোষ আপ্লুত গলায় বললেন, ”ভাবতেই পারছি না সত্যি সত্যিই দেখা হয়ে গেল।”
কলাবতী অবাক হয়ে দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। মেয়েদের হাত ঘুরে ঘুরে ব্যাটটা তার হাতে এল। জীবনে এই প্রথম সে ক্রিকেট—ব্যাট হাতে নিল। বেশ ভারী ভারী লাগল। পুরনো ব্যাট তাতে দু—তিনটে লাল ছোপ। হ্যান্ডেলের রাবারটা জীর্ণ হয়ে গেছে। ব্লেডের তলার দিকটায় সামান্য চকলা ওঠা। ব্যাটটা দাদুর হাতে তুলে দিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ”ধুপুকে দেখছি না যে?”
ফণী ঘোষ বললেন, ”ধুপু কাল সন্ধেবেলা সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পা মচকেছে। বিছানায় শুয়ে। আজ এক্স—রে হবে, ওর যমজ ভাই ধুজু রাতে জানিয়ে গেছে।”
”ফণী এটা কি সেই ব্যাট, যেটা দিয়ে ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছিলে?”
ফণী ঘোষ হেসে মাথাটা হেলালেন শুধু। ”তুলে রেখেছিলুম আজ বার করলুম।”
রাজশেখর ব্যাটটা কলাবতীর হাত থেকে নিয়ে কপালে ঠেকালেন। ফণী ঘোষ পকেট থেকে পুরনো একটা ক্রিকেট বল বার করলেন।
”এবার তোমরা এটা হাতে নিয়ে দ্যাখো কেমন লাগে।”
বলটা হাতে হাতে ঘুরল।
”কেমন লাগল?”
”বড্ড শক্ত ফণীদা,” একজন বলল। ”গায়ে লাগলে হাড় ভেঙে যাবে।”
”গায়ে লাগবে কেন? লাগার আগে সরে যাবে নয়তো লুফে নেবে। সেজন্য আগে লোফাটা শিখে নিতে হবে। প্রথমে শুরু করবে রাবারের বল দিয়ে। সবাই একটা করে রাবারের বল কিনে নাও। দেওয়ালে বল মেরে সেটা ক্যাচ করো। কীভাবে ধরবে সেটা তোমাদের দেখিয়ে দেব। আচ্ছা, এবার তোমরা মাঠটায় চক্কর দিয়ে চারপাক দৌড়ও দেখি, আস্তে—আস্তে, বেশি জোরে নয়। তারপর কিছু এক্সারসাইজ, এসব কিন্তু রোজ তোমাদের করতে হবে।” বলেই ফণী ঘোষ নিজে প্রথম দৌড় শুরু করলেন তাকে অনুসরণ করে মেয়েরা ছুটতে শুরু করল, তার মধ্যে কলাবতীও আছে। ওরা যখন প্রায় চল্লিশ মিটার এগিয়েছে তখন রাজশেখর আর থাকতে পারলেন না। চনমন করে উঠে দৌড়তে শুরু করলেন। দৌড় মানে জগিংই প্রায়।
বাড়ি থেকে জগ করে মাঠে এসেছেন তারপর আবার এই পরিশ্রম, রাজশেখর দু’পাকের পর দাঁড়িয়ে পড়লেন। ফণী ঘোষ একই তালে পা ফেলে, ছোটার গতি একটুও না কমিয়ে চারপাক শেষ করে রাজশেখরের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
”তোমার ছোটা দেখে মনে হচ্ছে তোমার অভ্যেস আছে।” রাজশেখর প্রশংসামেশানো গলায় বললেন বুকে বাতাস টানতে টানতে। শুনে ফণী ঘোষ শুধু বললেন,
