কলাবতী বলল, ”আমার দাদুও তো ওই সময়ে টাউন ক্লাবে খেলতেন। দেখেছিস আমার দাদুকে? গায়ের রং ঠিক আমার উলটো, খুব ফর্সা, সাড়ে ছফুট, তেমনই স্বাস্থ্য, ভীষণ খাইয়ে কিন্তু ভুঁড়ি নেই, রোজ জগ করেন। খুব মজা করে কথা বলেন।”
কথা বলতে বলতে দু’জনে কলাবতীদের ফটকের সামনে পৌঁছল। কলাবতী বলল, ”ভেতরে আয় না, দাদুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।”
ধুপু বলল, ”আজ থাক, এখন যাব রাধারানীদের বাড়ি। ওর খুব ক্রিকেট শেখার ইচ্ছে কিন্তু মা পারমিশন না দিলে খেলতে পারবে না। মাসিমার সঙ্গে কথা বলব। উনি চান মেয়ে মাধ্যমিকে প্রথম দশজনের মধ্যে যেন থাকে। তাঁর ধারণা খেলাধুলো করলে পড়ার ক্ষতি হবে। রাধু আমায় ধরেছে ওর মাকে গিয়ে বোঝাতে। কী বোঝাব বল তো? বছর বছর ফার্স্ট হয়ে রাধু তো নিজের সর্বনাশ নিজেই করেছে। মা বলেছে দশজনের মধ্যে না থাকলে বিষ খেয়ে মরবে, বাবা বলেছে ঝি ছাড়িয়ে ওকে দিয়ে বাসন মাজাবে, ঘর মোছাবে। আমি বলেছি, এখনও মাধ্যমিকের জন্য তিন বছর হাতে আছে, তুই রেজাল্ট খারাপ করতে শুরু কর, বাবা—মার পাগলামিটাকে আস্তে আস্তে নর্মাল করে দে।”
কলাবতী বলল, ”আমার দাদু কি কাকা ফার্স্ট সেকেন্ড হওয়ার জন্য একটুও চাপ দেন না। দাদু বলেন, ভালমতন একটা মানুষ হয়ে ওঠো আগে, সেজন্য খেলাধুলোটা খুবই জরুরি। ক্রিকেট খেলতে চাই শুনলে দাদু খুশিই হবেন। আমি কাল যাব। আচ্ছা ধুপু এই জুন মাসের গরমে কেউ ক্রিকেট খেলে? এখন তো ফুটবল সিজন!”
”হোক না ফুটবল সিজন। মেয়েরা তো দুপুরে ম্যাচ খেলতে মাঠে নামছে না। ফণীদা বলেছেন, এখন শুধু সকালে এক ঘণ্টা ব্যাট বল নিয়ে নাড়াচাড়া করা, একটা ধারণা পাইয়ে দেওয়া। এজন্য ক্রিকেট সিজনের অপেক্ষায় থাকার কোনও দরকার নেই।”
সেদিন রাতে খাওয়ার টেবলে বসেই কলাবতী ঘোষণা করে দিল, ”দাদু, কাকা, আমি কাল থেকে ক্রিকেট শিখব।”
সত্যশেখর ডিমের কালিয়ার বাটিতে তর্জনী ডুবিয়ে ঝোল চাখবার জন্য আঙুলটা মুখের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, থমকে গেল। ”কী বললি, ক্রিকেট? কেন পৃথিবীতে কি আর খেলা নেই? স্নুকার আছে, বিলিয়ার্ডস আছে, রাইফেল শুটিং আছে, শেখার আরও কতরকমের খেলা রয়েছে, তা নয়—” সত্যশেখর আঙুলটা মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে চুষতে শুরু করল।
”নিশ্চয় নিশ্চয় আরও কতরকমের খেলা রয়েছে—ব্যাগাটেলি, লুডো, তাস, দাবা, ক্যারম।” রাজশেখর খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন, ”সতু, এগুলোতেও তো ছোটাছুটি করে ঘাম ঝরাবার দরকার হয় না, বেশ আরামেই খেলা যায়।” রাজশেখর চোখ পিটপিট করে হাসি চেপে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সত্যশেখর কালিয়ার ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মুখটা বাটির ওপর নামাল।
”কোথায় শিখবি?” রাজশেখর জিজ্ঞেস করলেন কলাবতীকে।
কলাবতী এর পর দুপুর কাছে যা যা শুনেছে সবিস্তারে দাদুকে বলল।
”ফণীদাটা কে?” সত্যশেখর জানতে চাইল।
”দাদু তুমি বোধ হয় চিনতে পারো। নাইনটিন ফিফটি নাইনে উনি সান স্পোর্টিংয়ে শেষবার খেলেছেন, তখন তো তুমি টাউন ক্লাবে।”
”ফণী ঘোষ!” রাজশেখর টেবলে জোরে থাবড়া মেরে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। ”ফণীদা যদি সেই ফণী ঘোষ হয় তা হলে চিনি। বাপস কী ছয় হাঁকাত। আমার ছ’টা বলে ছ’টা ওভার বাউন্ডারি মেরেছিল গ্রিয়ার মাঠে। এই রোগা লম্বা চেহারা।” রাজশেখর ডান হাতের তর্জনীটা নাড়ালেন। ”অদ্ভুত টাইমিং ছিল আর ব্যাটের ঠিক শাঁসে বল লেগে বুলেটের মতো যেত বাউন্ডারিতে। আর সেই এক ওভারে ছত্রিশ রান নেওয়ার খবর কী করে যেন তোর বড়দির বাবা হরিশঙ্করের কানে পৌঁছে যায়। কানে ঠিক নয়, চোখে পড়ে যায়, পরদিন সব কাগজে খবরটা বেরিয়েছিল। অবশ্য বেরোবার মতোই খবর—একটা ছোট ম্যাচে ব্র্যাডম্যান বাইশ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন। আর ফণী ঘোষ সেদিন বাইশ বলে নিরানব্বুই করে বোল্ড হয়।”
”কে বোল্ড করল?”
”আর, সিনহা।” রাজশেখর নিস্পৃহ স্বরে নামটা বলে মুখ নিচু করে রুটি ছিঁড়ে কালিয়ার বাটিতে ডোবালেন।
”তারপর হরিকাকা কী করল? নিশ্চয় বাড়িতে কেত্তন লাগিয়ে দিল।” সত্যশেখর দ্বিতীয় ডিম শেষ করে তৃতীয়টা হাতে নিয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল।
”না, কেত্তন বসায়নি। চারটে খবরের কাগজের কাটিং একটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দেয়, সঙ্গে একবাক্স ভীমনাগের সন্দেশ। বাক্সের মধ্যে ছিল একটা চিরকুট, তাতে লেখা : ”সার ডনের তরফ থেকে এই উপহার।”
”উফফ কী সাঙ্ঘাতিক লোক এই মলয়ার বাবা হরিশঙ্কর মুখুজ্জে।” সত্যশেখর দাঁতে দাঁত চেপে বলল। ”আমার সঙ্গে যখনই দেখা হয় খালি খাওয়ার কথা তোলে—সতু ফুচকার ইনিংসে হায়েস্ট স্কোর তোমার কত? সতু আলুর চপের ম্যারাথনে তোমার বেস্ট টাইম কত? সতু মিহিদানার পাওয়ার লিফটিংয়ে কত কেজি তুলেছ?”
”যাকগে হরির কথা।…কালু আমি তোর সঙ্গে সকালে গিয়ে দেখব লোকটা সেই ফণী ঘোষ কি না। কিন্তু তোর তো ক্রিকেটের ড্রেস নেই, ব্যাট প্যাড গ্লাভসও নেই। ওগুলো তো কিনতে হবে।” রাজশেখর উদ্বিগ্ন চোখে তাকালেন কলাবতীর দিকে।
”কেন, আমার তো জিনস আর টপ রয়েছে, তাই পরেই নেট প্র্যাকটিস চলে যাবে, যাবে না?” কলাবতী যতটা হালকা সুরে বলল, ততটাই গম্ভীর স্বরে রাজশেখর বললেন, ”একদম নয়। ওয়ান ডে ক্রিকেট দেখে দেখে তোর রুচিটা বদলে গেছে। ট্র্যাডিশনের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে কখনওই সেটা ক্লাসিক হয়ে উঠতে পারে না। লাল নীল হলুদ ট্রাউজার্স, চকরাবকরা জামা, সাদা বল দিয়ে ধুমধড়াক্কা ব্যাট চালিয়ে কি ক্রিকেট খেলা হয়? পা থেকে গলা পর্যন্ত ধবধবে সাদা, সেটাই হল ক্রিকেটারের পোশাক, হ্যাঁ নেটেতেও ওই পোশাকে প্র্যাকটিস করতে হয়।”
