কলাবতী ফটক দিয়ে বাড়িতে ঢুকল, তার সঙ্গে খয়েরিও। বাগানটা অন্ধকার। পশ্চিমে ফিটন রাখার ঘরটা আরও অন্ধকার দেখাচ্ছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন একটা হাতি দাঁড়িয়ে আছে। সে খয়েরির কোমরে চাপ দিয়ে ঠেলে দিল। ”যা এবার কোনও ভয় নেই।” খয়েরি দু—তিন পা গিয়ে ফিরে তাকাল। ”যা, যা, ভয় কী?”
গাড়ি বারান্দায় আলো জ্বলে উঠল। আলোয় বাগানের অনেকখানিই দেখা যাচ্ছে। রাজশেখরের গলা শোনা গেল, ”কালু কী করছিস বাগানে এই অন্ধকারে?”
”ওর থাকার ব্যবস্থা করছি দাদু।”
”ও—টা কে?”
”দেখতে পাচ্ছ না, ওই তো দাঁড়িয়ে।” আঙুল তুলে কলাবতী দেখাল। রাজশেখর দেখতে পেলেন।
”ওর থাকার কথা তোকে ভাবতে হবে না, চলে আয়।” গলার স্বর একটু কঠিন করে রাজশেখর বললেন। কলাবতী বার দুই খয়েরির দিকে তাকিয়ে ফিরে এল বাড়ির মধ্যে। খয়েরি মিনিটখানেক অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থেকে পায়ে পায়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে এসে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
কলাবতী পরদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় খয়েরিকে যেখানে দেখবে ভেবেছিল, সেই সত্যানন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তার এপার—ওপার চোখ বোলাল। দেখতে পেল না। টিফিন বক্সে জেলি মাখানো দু’স্লাইস পাউরুটি রাখা আছে। মিনিট দুই অপেক্ষা করে সে বাড়ির দিকে রওনা হল। পথে যত গলি পড়ল সে থমকে দাঁড়িয়ে যতদূর চোখ যায় গলির মধ্যে তাকাল। দেখতে পেল না। বাড়ির ফটকে পৌঁছে পাউরুটির স্লাইস দুটো ফটকের ধারে রেখে দিল। যদি খয়েরি আসে!
পরদিন ভোরে কলাবতী ছুটে গিয়ে দেখল পাউরুটির স্লাইস দুটো যে ভাবে রাখা ছিল তেমনই রয়েছে। এইভাবে পাঁচটি দিন কেটে গেল। সে খয়েরির দেখা আর পেল না। তখন সে মনে মনে বলল, রাস্তার কুকুর তো, কত আর ভাল হবে! আঁস্তাকুড়ের খাবার না পেলে ওদের পেট ভরে না। ভেবেছিলুম দাদুকে বলে খালি ফিটনের ঘরটায় ওকে থাকতে দেব। তা তো পছন্দ নয়। যাকগে, যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াক। আর কখনও দেখা হলে ওকে কিছু খেতে দেব না।
.
শুক্রবার রথযাত্রা, স্কুলের ছুটি। তার আগের দিন ছুটির পর কলাবতী যখন স্কুল থেকে বেরোচ্ছে, গেটে তাকে ধরল ধূপছায়া ওরফে ধুপু।
”এই কালু, তোর জন্যই দাঁড়িয়ে, কথা আছে। চল, হাঁটতে হাঁটতে বলছি।” ধুপু একই ক্লাসের, তবে অন্য সেকশনে পড়ে। একটু মোটাসোটা কিন্তু অসম্ভব চটপটে, সবসময় হাসিখুশি মুখ। স্কুলে ছোট—বড় সবার সঙ্গে ওর ভাব। স্কুলের স্পোর্টসে ১০০, ২০০ মিটার দৌড়ে তৃতীয় বা চতুর্থ স্থান ওর বাঁধা। দড়ি—টানাটানি আর ক্রিকেট বল ছোড়ায় ধুপু ছাড়া প্রথম আর কাউকে ভাবাই যায় না। ওর গায়ে যেমন জোর মনটিও তেমনই নরম।
”তুই জানিস পূর্ব কলকাতা ক্রিকেট ক্লাবে আমি খেলি।” হাঁটতে হাঁটতে ধুপু বলল।
কলাবতী বলল, ”শুনেছি, তবে কখনও খেলতে দেখিনি।”
”এবার আমাদের পাড়ায় মেয়েদের নিয়ে একটা ক্রিকেট টিম তৈরি করা হবে, তুই খেলবি?”
কলাবতী দাঁড়িয়ে গেল, অবাক হয়ে বলল, ”আমি! আমি তো জীবনে ব্যাটই ধরিনি, টিভিতে শুধু ওয়ান—ডে দেখেছি।”
”তার মানে ক্রিকেটে তোর ইন্টাররেস্ট আছে, ওতেই হবে। এবার খেলাটা শিখে নে, তারপর খেলতে খেলতে ক্রিকেটার হয়ে যাবি। আমিও তো কিছু জানতুম না। এখন আমি ব্যাটে ওপেন করি, লেগব্রেকও দিতে পারি। তবে গুগলিটা এখনও পারি না, চেষ্টা করছি।”
শুনে ধুপুর প্রতি সমীহ জাগল কলাবতীর। স্কার্টের পকেট থেকে চুইংগাম বার করে ধুপুকে একটা দিয়ে নিজে একটা মুখে পুরল।
”তুই গুগলির চেষ্টা করছিস! আমার দাদুও দিত। দেওয়া নাকি খুব শক্ত।”
ধুপু গম্ভীর মুখে বলল, ”ভীষণ শক্ত। গাদা গাদা অফব্রেক বোলার পাবি কিন্তু ভাল লেগব্রেক গুগলি বোলার মেরেকেটে একটা—দুটো। বেঙ্গলে একটাও মেয়ে নেই, যে গুগলি দিতে পারে।”
”তুই কবে পারবি?” কলাবতী খুবই সম্ভ্রমভরে জানতে চাইল।
ধুপু আকাশের দিকে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে বলল, ”পাঁচ বছর যদি একনাগাড়ে প্র্যাকটিস করি তা হলে পারব।”
”তোদের ক্লাবের মাঠটা কোথায়?”
”মানিকতলা হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের মাঠে প্র্যাকটিস হত। ওরা আর বাইরের ক্লাবকে মাঠ দেবে না তাই আমরা সল্ট লেকের একটা মাঠে এবার থেকে খেলব। তবে এই যে নতুন ক্রিকেট সেন্টারটা নভিসদের জন্য করা হবে সেটা রেল লাইনের ধারে সি আই টি কোয়ার্টারের ভেতরের মাঠে। ওটা তুই চিনিস?” ধুপু প্রশ্ন করে দাঁড়িয়ে পড়ল। এখান থেকে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে গেলে তার বাড়ি।
কলাবতী বলল, ”হ্যাঁ চিনি। খুব আলোয় সাজিয়ে দুর্গাপুজো হয় মাঠে।”
”ওখানে প্রগতি সঙ্ঘ বলে কোয়ার্টারের একটা ক্লাব আছে, ফুটবল ক্রিকেট খেলে। ফণীদা ওদের সঙ্গে ব্যবস্থা করে মেয়েদের শেখাবার দায়িত্ব নিয়েছেন। আমাকে বলেছেন কিছু মেয়ে জোগাড় করে দিতে। স্কুলে অনেককে বললুম, কেউ রাজি নয়।”
কলাবতী জিজ্ঞেস করল, ”ফণীদা কে?”
ধুপু চুইংগাম মুখ থেকে ফেলে দিয়ে বলল, ”একজন রিটায়ার্ড লোক, দেখে বয়স বোঝা যায় না। পঞ্চাশ হতে পারে, আবার সত্তরও। কোয়ার্টারেই চারতলায় থাকেন, শুধু বউ আছে। ছেলেপুলে নেই। অনেক ক্লাবে খেলেছেন, শেষ খেলেছেন সান স্পোর্টিংয়ের হয়ে ফিফটি নাইনে। চল তোর সঙ্গে আর একটু হাঁটি।”
