মুরারি, অপুর মা, কলাবতী তিনজনে মিলে গোটা তিরিশ জানলা ও দরজা বন্ধ করতে—না—করতেই প্রবল ঝড় আছড়ে পড়ল বাড়িটার ওপর। মিনিটদশেক হাওয়ার মাতামাতি চলার পরই নামল তোড়ে বৃষ্টি। মিনিট কুড়ি পর হাওয়া আর বৃষ্টির দাপট কমে এলে কলাবতী ছাতা মাথায় গাড়ি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। চাঁপাগাছের কচি ডালগুলো ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে আছে। রাস্তার ওপারে ডেকরেটরের দোকানের সাইনবোর্ড আর দুটো লাইট পোস্টে বাঁধা ওয়ান ডে নক আউট ফুটবল প্রতিযোগিতার ফেস্টুন ঝুলে রয়েছে। একটা পুরনো টিনের চালা কোথা থেকে উড়ে এসে বাগানে পড়েছে। টগরগাছটা পাঁচিলে ঠেস দিয়ে কোনওক্রমে দাঁড়িয়ে।
কলাবতী গাড়ি বারান্দার পশ্চিম দিকে সরে গেল। বাগানের এই দিকটা বহু বছর ধরে অবহেলিত। একসময় রাজশেখরের একটা ফিটন ছিল। প্রায়ই তিনি স্ত্রী আর দুই ছেলে, কলাবতীর বাবা দিব্যশেখর ও সত্যশেখরকে নিয়ে বিকেলে গঙ্গার ধারে ফিটনে চড়ে হাওয়া খেতে যেতেন। বাগানের পশ্চিম দিকে ফিটন ও ঘোড়া রাখার জন্য পাকা একটা ঘর তৈরি করেছিলেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ফিটন ও ঘোড়া বিক্রি করে দেন। ঘরটা ফাঁকা পড়ে থাকতে থাকতে ওর অস্তিত্বটাই সবাই ভুলে যায়। বাগানের ওদিকটায় বহু বছর কেউ না যাওয়ায় বড় বড় ঘাস আর ঝোপ গজিয়ে গেছে। বাগানের পাঁচিল ফিটনের ঘরটার পেছনের দেওয়াল আর দু’ধারের দেওয়ালে দুটো মাত্র জানলা। এখন তার কোনও পাল্লা নেই, গরাদও নেই, আছে শুধু জীর্ণ দুটো কাঠের ফ্রেম। ঘরের সামনের দিকে ছিল দুই পাল্লার চওড়া দরজা, যা দিয়ে ফিটনটা ঢুকত, ও বেরোত। পাল্লা দুটোর একটা নেই, অন্যটার থেকে অর্ধেক কাঠ খসে পড়েছে। মেঝের সিমেন্ট ভেঙেচুরে ইট ও মাটি বেরিয়ে রয়েছে।
আকাশে ঘোলাটে মেঘ, আলো খুবই কম, সন্ধ্যা নামার সময় এগিয়ে আসছে। বারান্দা থেকে কলাবতী আলতো দৃষ্টিতে তাকাল ফিটন রাখার ঘরটার দিকে। ঘরের দরজার ভাঙা পাল্লার কাছে কী যেন একটা নড়ে উঠল বলে তার মনে হল। কৌতূহলী চোখে সে তাকিয়ে রইল। ঘরের মধ্যে আলো এত কম, যে সে কিছুই বুঝতে পারল না। কাকার ঘর থেকে বায়নাকুলার এনে চোখে লাগিয়ে সে খয়েরিকে দেখতে পেল। ঝাঁকুনি দিয়ে গা থেকে জল ঝরিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করছে।
কলাবতীর এতক্ষণ ওর কথা মনেই ছিল না। অপুর মা বলেছিল ফটকের বাইরে পাঁচিল ঘেঁষে শুয়ে আছে। ঝড়—বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় খুঁজতে ফিটনের ঘরে ঢুকে পড়েছে। তার মনে হল, ভালই করেছে। বৃষ্টি ধরার কোনও লক্ষণ নেই সারারাত যদি ওখানেই থাকে তো থাকুক।
মাস্টারমশাই ক্ষুদিরামবাবুর কাছে কলাবতী অঙ্ক বুঝে নিচ্ছিল যখন সত্যশেখর বাড়ি ফিরল। কাকার সেরেস্তার পাশেই তার পড়ার ঘর। হঠাৎ তার কানে এল কাকা সদর দিয়ে ঢুকেই চেঁচাচ্ছে, ”আরে আরে এটা আবার এল কোত্থেকে। মুরারি, মুরারি শিগগির এটাকে তাড়া, অ্যাই ভাগ, ভাগ।” এর পরই ‘কেঁউ, কেঁউ’ শব্দ উঠল আর্তনাদের। কলাবতী বুঝল কাকা কিছু একটা দিয়ে আঘাত করেছে খয়েরিকেই।
”আসছি সার।” কলাবতী ক্ষুদিরামবাবুর অনুমতির জন্য অপেক্ষা না করেই ছুটে ঘর থেকে বেরোল। সদর দরজায় পৌঁছে দেখল ফটক দিয়ে খয়েরি ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে চেঁচিয়ে ডাকল, ”আয়, আয়।” খয়েরি থমকে পেছন ফিরে তাকাল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। কলাবতী ছুটে গেল। ততক্ষণে খয়েরি ফটক পার হয়ে গেছে।
বিষণ্ণ মনে ফিরে এল কলাবতী। অপুর মার দেওয়া কাবলি ছোলার ঘুগনি সে মুখে দিল না। ক্ষুদিরামবাবু এক চামচ মুখে দিয়েই ”উহহ, কী ঝাল।” বলে প্লেটটা সরিয়ে রাখলেন। একটু পরে খালি প্লেট নিতে এল মুরারি। ”এ কী! কেউই তো খাননি, খুব ঝাল হয়েছে বুঝি। অপুর মা’র হাতের রান্না তো!”
মুরারি প্লেট দুটো তুলে মুচকি হেসে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কলাবতী বলল, ”কাকা খেয়েছে।”
চোখ দুটো বিস্ফারিত করে মুরারি বলল, ”খেয়েছে মানে! চেয়ে চেয়ে দু’বার খেয়েছে। তারপরই ”আঃ উঃ’ করতে করতে সেরেস্তায় দৌড়ল, এক ঘণ্টা ধরে মক্কেল বসে।”
ক্ষুদিরামবাবু চলে যাওয়ার পর অপুর মা’র কাছ থেকে দুটি রুটি চেয়ে নিয়ে কলাবতী ফটকের বাইরে এসে দু’দিকে তাকাল, কাদা আর গাছের পাতায় ফুটপাথ নোংরা হয়ে রয়েছে। ঝড়ের দাপটে রাস্তার আলো জ্বলছে না। সে খয়েরির কোনও চিহ্ন খুঁজে না পেয়ে, ”আয় আয় আয়, চুক চুক” করে ডাকল দু—তিনবার। হঠাৎ দেখল অন্ধকার ফুটপাথ ধরে খয়েরি এগিয়ে আসছে। কলাবতী উবু হয়ে বসে রুটি ছিঁড়ে ওর মুখের সামনে ধরল। খয়েরি ল্যাজ নাড়তে লাগল কিন্তু রুটি কামড়াল না। ”খুব হয়েছে আর রাগ করতে হবে না। কাকাটা খুব পাজি, আমি বকে দেব, এখন খা।”
রুটির টুকরোটা সে খয়েরির মুখে ঠেকাল। খয়েরি কামড়ে ধরে সামনে দু’পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খেল। ”এই তো লক্ষ্মী মেয়ে।” রুটি দুটো খাইয়ে কলাবতী খয়েরিকে জিজ্ঞেস করল, ”রাতে থাকবি কোথায়? যদি আবার বৃষ্টি আসে!” খয়েরি কী বুঝল কে জানে, ল্যাজ নেড়ে যেতে লাগল।
”আয় আমার সঙ্গে, যে ঘরটায় বিকেলে শেল্টার নিয়েছিলি সেখানেই রাতটা কাটিয়ে দিবি, তারপর সকালে যেখানে তোর ইচ্ছে সেখানে চলে যাবি। আয়।”
