”ভেতরে আয়।” কলাবতীর ডাক শুনেও খয়েরি ইতস্তত করল। ”আয় আয়, ভয় কী। এই দ্যাখ,” কলাবতী স্কুলব্যাগ থেকে টিফিন বক্সটা বার করে বাগানের চাঁপা গাছের তলায় ঘাসে বসল।
মাথা নিচু করে পায়ে পায়ে খয়েরি এই প্রথম ফটক পার হল। গুটি গুটি সে কলাবতীর সামনে এল। মাখন লাগানো পাউরুটি খপ করে কামড়ে ধরে কোঁৎ কোঁৎ করে দুই ঢোকে পেটে চালান করে দিল। পরের পাউরুটির টুকরোটা কামড়ে ধরে ঘাসে উপুড় হয়ে পা দুটো সামনে ছড়িয়ে টুকরোটা দুই থাবায় চেপে ধরে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে চিবিয়ে খেল।
জিভটা দুই ঠোঁটে চাটাচাটি করে খয়েরি আরও কিছু পাওয়ার আশা নিয়ে তাকিয়ে রইল। কলাবতী বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল নাড়তে নাড়তে বলল, ”আর তো কিছু নেই, এবার কেটে পড়ো, তবে বাসী রুটি যদি খেতে চাও তো লক্ষ্মী মেয়ের মতো বসে থাকো, আমি এনে দিচ্ছি। তার আগে তুমি আমার আপেল খাওয়া দ্যাখো।”
টিফিন বক্সে ছিল চার টুকরো করে কেটে রাখা একটা আপেল। এই ফলটি খেতে একদমই তার ভাল লাগে না। কিন্তু দাদুর নির্দেশ, ”আপেল মাস্ট। দারুণ ভিটামিন আছে।” কলাবতী আমতা আমতা করে বলেছিল, ”বড়দি বলেছেন ডাঁসা পেয়ারায় আপেলের থেকেও ভিটামিন বেশি আছে।”
বড়দি অর্থাৎ আটঘরার সিংহিদের বংশপরম্পরা প্রতিদ্বন্দ্বী (এবং এখনও) পাশের গ্রাম বকদিঘির জমিদার হরিশঙ্কর মুখুজ্জের একমাত্র মেয়ে মলয়া, যে ডক্টরেট করতে অক্সফোর্ডে যায়। (তখন সত্যশেখরও ব্যারিস্টার হতে লন্ডনে ছিল), যে ডক্টর হয়ে ফিরে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজে অধ্যাপনা না করে কাঁকুড়গাছি উচ্চচ বালিকা বিদ্যালয়ে হেডমিস্ট্রেসের চাকরি নেয়। মাতৃহীনা কলাবতীকে অবিবাহিতা মলয়াই রাজশেখরের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে নিজের স্কুলে ভর্তি করায়।
কলাবতী সিংহকে হেডমিস্ট্রেস একটু বেশি স্নেহ করেন, শিক্ষিকা মহলে এমন একটা কথা চাউর হয়। কথাটা মলয়ার কানে পৌঁছতেই সে স্কুলে কলাবতীর যাবতীয় ব্যাপারে এত কড়া হয়ে যায় যে অ্যানুয়াল পরীক্ষার খাতা আনিয়ে নিজে স্ক্রুটিনি করে প্রতি সাবজেক্টে পাঁচ নম্বর কমিয়ে দিয়েছিল। গতবছর মলয়ার স্কুলের বিরাশিটি মেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়, আশিজন ফার্স্ট ডিভিশন, একজনও ফেল হয়নি। পঞ্চাশটি স্টার পাওয়া স্কুলের বড়দির রংচটা অ্যাম্বাসাডার মোটরটা যখন কাঁকুড়গাছির মোড়ের আইল্যান্ডটা ঘোরে তখন ট্র্যাফিক হোমগার্ডও গাড়িটাকে স্যালিউট ঠুকে দেয়।
এহেন বড়দি বলেছে আপেলের থেকে পেয়ারায় ভিটামিন বেশি আছে। রাজশেখর কথাটার প্রতিবাদ না করে দোতলায় লাইব্রেরিতে চলে যান। খাদ্যের গুণাগুণ সম্পর্কিত গোটাদুয়েক বই খুলে পড়ে, কলাবতীকে জানান, ”হরির মেয়েটা অ্যাত সব জানল কী করে বল তো? ওদের তো মুখ্যুর বংশ।” রাজশেখর দু’চক্ষে হরিশঙ্করকে দেখতে পারেন না বটে কিন্তু মলয়া বা মলুকে স্নেহ করেন নিজের মেয়ের মতো।
কলাবতী আপেলের একটা টুকরোয় কামড় দিয়ে মুখবিকৃত করল, টক। মুখ থেকে টুকরোটা বার করে ঘাসে ছুড়ে ফেলতেই খয়েরি এগিয়ে গিয়ে সেটা মুখে পুরে চিবিয়ে খেয়ে নিল। কলাবতী তো অবাক। কুকুর মাংসাশী প্রাণী বলেই সে জানে। এরা যে নিরামিষভোজীও সেটা এবার জানল, আপেলের বাকি টুকরোগুলো সে ছুড়ে ছুড়ে দিল। খয়েরি চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে নিল।
দোতলার গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাজশেখর যে অনেকক্ষণ ধরেই তাদের লক্ষ করে যাচ্ছিলেন, কলাবতী সেটা দেখেনি।
”কালু ওকে কোথায় পেলে?” রাজশেখরের গম্ভীর গলার প্রশ্নে কলাবতীর বুক দুরদুর করে উঠল। নিশ্চয় বকুনি দেবেন।
”আমার সঙ্গে সঙ্গে এল দাদু। ওর খুব খিদে পেয়েছিল তাই খেতে দিলুম। এই এবার ভাগ।” কলাবতী হাত তুলল। খয়েরি এক—পা পিছিয়ে গিয়ে আড়চোখে কলাবতীর দিকে দু’বার তাকিয়ে ধীরে ধীরে ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেল।
কলাবতী দোতলায় উঠে আসতেই রাজশেখর বললেন, ”এ বাড়িতে এই দ্বিতীয়বার কুকুর ঢুকল। তোর জন্মের আগে সতুর একটা আলসেশিয়ান ছিল, হিটলার। নামের মতো মেজাজটাও ছিল হিটলারি। সারারাত বাগানে ঘুরে বেড়াত। একবার একটা চোরের পিঠ থেকে কামড়ে এক খাবলা মাংস ছিঁড়ে নিয়েছিল। দিনের বেলায় একতলার সিঁড়ির নীচে চেন দিয়ে বাঁধা থাকত। তবু বাইরের লোক ঢুকতে ভয় পেত। সতু ছাড়া কাউকে গায়ে হাত দিতে দিত না। সেই চোরটার দলের লোকেরা, এই আমাদের পেছনেই মালোপাড়া বস্তিতে থাকে, প্রতিশোধ নিতে একদিন রাতে বিষমাখা মাংস খাইয়ে হিটলারকে মেরে ফেলল। সতু সাতদিন কিছু মুখে দেয়নি, বিছানায় শুয়ে ছিল। তারপর থেকে বছর পঁচিশ এ—বাড়িতে আর কুকুর পোষা হয়নি। হিটলারের এক বোন ছিল লিজা, এলিজাবেথ। তাকে নিয়েছিল মলয়া। এখন লিজার নাতনি আছে মুখুজ্জে বাড়িতে।”
কলাবতী বলল, ”হ্যাঁ দেখেছি, মঙ্গলা, খুব ঠাণ্ডা স্বভাবের। ওকে আমার খুব ভাল লাগে। কিন্তু ওর দিদিমা না ঠাকুমা, হিটলারের বোন ছিল এটা তো জানতুম না।”
একটু পরেই অপুর মা ফিরল।
”কালুদি কুকুরটাকে রুটি দিয়েছ? দেখলুম ফটকের বাইরে পাঁচিল ঘেঁষে শুয়ে রয়েছে। বাব্বা, কী মেঘ করেছে! পশ্চিমের আকাশটা মোষের মতো কালো হয়ে গেছে।”
”সে কী!” কলাবতী ছুটে বারান্দায় ঘিরে আকাশ দেখে এসে বলল, ”পাঁচ মিনিট আগেও তো আকাশ পরিষ্কার ছিল। খুব ঝড় আসবে মনে হচ্ছে। জানলাগুলো বন্ধ করে দাও শিগগির।”
