কলাবতী বলল, ”চললে কোথায় অপুর মা?”
ঘোর কৃষ্ণবর্ণ অপুর মা দশাসই মাঝবয়সী বিধবা। অপু তার একমাত্র ছেলে। কলাবতীদের আটঘরাতেই দেশ। দেশের বাড়িতে অপু থাকে মামাতো ভাইবোনেদের সঙ্গে। অপুর মার ভাগের পুকুর, সামান্য জমিজমা তারাই ভোগ করে। এই বাড়িতে সে যা মাইনে পায় সবই দেশে পাঠিয়ে দেয়। মাতৃহারা কলাবতীকে কোলেপিঠে না হোক যত্নে ও যতদূর সম্ভব শাসনে সে দেখাশোনা করে। রান্নাঘরটা অপুর মা’র নিজস্ব সাম্রাজ্য। অসম্ভব সুস্বাদু তার রান্নার হাত। প্রথম প্রথম মুরারি রান্নার বিষয়ে তাকে অযাচিত পরামর্শ দিতে গিয়ে এমন দাবড়ানি খেয়েছিল যে, সঙ্গে সঙ্গে রাজশেখরের কাছে গিয়ে মৃদুস্বরে নালিশও করেছিল।
”কত্তাবাবু আপনার দেশের এই মেয়েটার জিভ বড্ড খরখরে। বললুম ধোঁকায় অত লঙ্কাবাটা দিস না। তা কী বলল জানেন, এ—বাড়ির লোকের কার কেমন জিভের তার আমার জানা আছে। এই বলে আরও এক খাবলা লঙ্কাবাটা দিয়ে বলল, এটা ছোটবাবুর জন্য। কর্তাবাবু আজ রাতে আপনাদের কিন্তু ঝালের চোটে বাপরে মারে বলে টেবিল থেকে উঠে পড়তে হবে। রসগোল্লা কিনে এনে রেখে দেব?”
”কিনবি?” রাজশেখর সেকেন্ড দশেক চিন্তা করে বললেন, ”আটঘরার মেয়ে, ঝালের হাত একটু বেশি তো হবেই, তবে কি জানিস আটঘরার লোকেরা ঝাল একটু বেশিই খায়, তেমনই মিষ্টিটাও। ঠিক আছে, রসগোল্লা এনে রাখ।”
”কতটা আনব?”
”আমার আর কালুর জন্য গোটা আষ্টেক আর সতুর জন্য কুড়িটা হলেই চলে যাবে।”
সেদিন রাতে খাওয়ার টেবলে রান্না করা খাবার রেখে অপুর মা ঘরের বাইরে সিঁটিয়ে থেকে দুরু দুরু বুকে দাঁড়িয়ে রইল। মুরারিদা তাকে রসগোল্লাভরা মালসা দেখিয়ে বলেছে, ”এই দ্যাখ, তোর ধোঁকা খেয়ে সবাই যখন বাবাগো—মাগো করবে তখন এটার দরকার হবে।”
ধোঁকার ডালনার বাটি থেকে চৌকো একটা খণ্ড তুলে প্রথমে সত্যশেখর দাঁতে একটা টুকরো ভেঙে মুখে পুরল। কয়েকবার চিবোল। দুটো চোখ ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল। রাজশেখর তার মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে, মুরারি এবং কলাবতীও।
রাজশেখর দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ”সতু খুব ঝাল কি? রসগোল্লা আছে খাবি?”
সত্যশেখর ধোঁকার বাকিটুকু মুখে পুরে চোখ বুজে চিবোতে—চিবোতে মাথা নাড়তে লাগল, ”ফাসক্লাস, ফাসক্লাস, কালু খেয়ে দ্যাখ। বাবা একটা মুখে দাও, ডিলিসাস। কতদিন পর যে রান্নার মতো একটা রান্না খাচ্ছি।” বলতে বলতে সত্যশেখর একটা আস্ত ধোঁকা মুখে চালান করল।
কলাবতী তখন খুবই ছোট, কাকার দেখাদেখি সেও ধোঁকায় কামড় দিয়ে মন্তব্য করল, ”ঝাল কোথায়! এ তো আমাদের বিরিঞ্চির ঘুগনি আর লালু প্রসাদের আলুকাবলির মতোই।” কথাটা শুনে সত্যশেখর ভাইঝির দিকে সপ্রশংস চোখে তাকায়।
মুরারি ব্যাজার মুখে খাওয়ার ঘর থেকে বেরিয়েই পড়ল অপুর মা’র সামনে। উদ্বিগ্ন স্বরে সে জানতে চাইল, ”হ্যাঁগো মুরারিদা, ছোটবাবু যে ফাসক্লাস ফাসক্লাস বলল, কথাটার মানে কী?”
”মানে, জঘন্য জঘন্য।” মুরারি মুখবিকৃত করে মানেটা আরও স্বচ্ছ করে বুঝিয়ে দিল।
অপুর মা ঘরের ভেতর উঁকি দিয়ে বলল, ”ওম্মা ছোটবাবু তো সবটাই খেয়ে নিল।”
সিংহি বাড়িতে লোকজন কম, কেউ গলা চড়িয়ে কথা বলে না তাই শান্ত শব্দহীন থাকে কিন্তু এর পর থেকে অপুর মার দাপুটে গলা একতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত মাঝে মাঝে পৌঁছতে লাগল।
.
এহেন অপুর মা সেদিন প্লাস্টিকের বাজার করার ব্যাগ হাতে বাড়ি থেকে বেরোবার সময় স্কুল—ফেরত কলাবতীর মুখোমুখি হয়ে পড়ল। কলাবতী একবার পেছনে তাকিয়ে দেখে নিল খয়েরি কোথায়, তারপর বলল, ”অপুর মা, এমন সময় কোথায় যাচ্ছ?”
”ছোটবাবু টেলিফোন করে বলল, অপুর মা কাবলে ছোলার ঘুগনি খাব, বিরিঞ্চির থেকেও বেশি ঝাল দিয়ে। ঘরে তো কাবলে ছোলা নেই, মুরারিদা যে কোথায় গেছে দুপুর থেকে, যাই আমিই কিনে আনি। ওম্মা এ কুকুরটা কোথা থেকে এল!” কলাবতীর পাশে এসে দাঁড়ানো খয়েরিকে দেখে অপুর মা বলল। তার স্বরে প্রশয়ের আভাস পেয়ে কলাবতী উৎসাহিত হয়ে বলল, ”দ্যাখো না, কাল ওকে আমার টিফিনটা খাইয়েছি, আজও আমার পিছু নিয়েছে, আজও ওর চাই।”
”টিফিনটা খাইয়েছ মানে? তুমি খাওনি?”
অপুর মার স্বরে ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে কলাবতী ঢোক গিলে বলল, ”অত অত টিফিন দিলে কি সব খাওয়া যায়, একটু পড়ে ছিল সেটাই দিয়েছি। রোজ রোজ পাউরুটি—মাখন কি ভাল লাগে? কাল বরং ঘুগনি দিও।”
”তা দেব, এখন এটাকে কী খেতে দেবে?”
”কিচ্ছু না। অ্যাই ভাগ ভাগ।” কলাবতী ফুটপাথে’ক্রুদ্ধভাবে পা ঠুকে এগিয়ে গেল খয়েরির দিকে। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে খয়েরি দাঁড়িয়ে রইল। লেজটা নড়ছে। জেনে ফেলেছে কলাবতীর রাগটা নকল।
”ও এখন তোমায় ছাড়বেনি। রান্নাঘরে বাসী রুটি আছে, তাই দুটো এনে দাও।” এই বলে অপুর মা মুদির দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।
অপুর মা একটু দূরে যেতেই কলাবতী ”আয়।” বলে ফটক পার হয়ে পাঁচিলের ধারে লুকিয়ে দাঁড়াল। খয়েরি ফটকের সামনে এসে ভেতর দিকে তাকিয়ে কলাবতীকে দেখতে না পেয়ে মৃদু স্বরে ”ভুক ভুক” শব্দ করে উবু হয়ে বসে পড়ল। মিনিটখানেক পরে কলাবতী উঁকি দিল। খয়েরি তাকে দেখতে পেয়েই ”ঘৌওউওউ” করে ডেকে উঠে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়তে শুরু করে দিল।
