কলাবতী দাঁড়িয়ে পড়ল। স্কুলব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বার করে তাই থেকে মাখন লাগানো পাউরুটির দুটো স্লাইস নিয়ে হাতে ধরে ওকে ডাকল, ”আয় আয়” বলে জিভ দিয়ে ”চুক চুক” শব্দ করল। কুকুরটি হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল। কলাবতীর মনে হল, ও বিশ্বাস করতে পারছে না মাখন লাগানো রুটি নেওয়ার জন্য তাকেই ডাকা হচ্ছে। কলাবতী আবার ডাকল। এবার সে ছোট্ট করে ল্যাজ নাড়ল। চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একটা ‘কুঁই’ শব্দ মুখ থেকে বেরিয়ে এল, বোধ হয় বুঝতে পেরেছে তাকেই খেতে ডাকছে। কিন্তু তাই বলে মাখন—রুটি! তার অবিশ্বাসের ঘোর তখনও কাটেনি। কলাবতী দু’পা এগিয়ে গেল। ”আয়, আয়,” মিষ্টি নরম স্বরে সে আবার ডাকল।
কয়েকজন পথিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে চলে গেল। একজন যেতে যেতে মন্তব্য করে গেল, ”মানুষ খেতে পায় না, কুকুরকে খাওয়াচ্ছে!” কথাটা কানে যেতেই তার মাথা গরম হয়ে উঠল। লোকটা দূরে চলে গেছে নইলে সে বলত, ”মানুষ তো তার নিজের খাবার ভিক্ষে করেও জোগাড় করে নিতে পারে। কিন্তু কুকুর কি তা পারে?”
কলাবতী আরও দু’পা এগিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। কুকুরটি দুটো কান ঘাড়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে মুখটা নামিয়ে ঘন ঘন লেজ নাড়তে লাগল! কলাবতী একটা স্লাইস ওর মুখে ঠেকাল। কপ করে সেটা কামড়ে নিয়ে মুখে ঢুকিয়ে ফেলল এবং দুই ঢোকে গিলে নিল। অন্য স্লাইসটারও একই অবস্থা হল। টিফিন বক্সে আছে আপেল আর ছানা। কুকুর আপেল খায় কিনা কলাবতীর জানা নেই। ছানা বোধ হয় খেতে পারে, এই ভেবে সে মুঠোয় ছানা নিয়ে খয়েরির মুখের সামনে ধরল। একবার গন্ধটা শুঁকে নিয়ে তার তালু থেকে ছানা খেয়ে তালুটা চেটেও দিল। সুড়সুড়ি লাগতে কলাবতী মজা পেয়ে হাত বাড়িয়ে রইল, খয়েরি আরও তিন—চারবার চাটল। টিফিন বক্স কিছুটা হালকা করতে পেরে সে স্বস্তি পেল। বক্স খুলে অপুর মা যদি দেখে সে টিফিন খায়নি তা হলে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার গজগজানি থামবে না।
কুকুরটিকে পাউরুটি আর ছানা খাইয়ে কলাবতী বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। একবার পেছনে তাকিয়ে দেখল হিজ মাস্টার্স ভয়েস গ্রামোফোন রেকর্ডে ছাপমারা কুকুরটির মতো দুটো পা সামনে রেখে উবু হয়ে বসে তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। কলাবতীকে তাকাতে দেখে সে লেজ নেড়ে উঠে দাঁড়াল, কিছুটা গিয়ে কলাবতী আবার মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখল কুকুরটি তাকে অনুসরণ করে পিছু পিছু আসছে। বাড়ির ফটক দিয়ে ভিতরে ঢুকে বাগান পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলাবতী ফটকের দিকে তাকিয়ে রইল, সাত—আট সেকেন্ড পরে কুকুরটি ফটকের সামনে এসে হাজির হয়ে ভেতর দিকে তাকিয়ে কলাবতীকে দেখতে পেয়ে লেজ নেড়ে যেতে লাগল কিন্তু ভেতরে ঢুকল না।
”ভাগো এবার।” চেঁচিয়ে বলার সঙ্গে সঙ্গে সে হাত নেড়ে চলে যেতে বলল, ”অনেক দিয়েছি, আর দিতে পারব না।”
কলাবতী বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল, দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল মুরারি। সে বলল, ”কাকে কী দিতে পারবে না কালুদি?” কলাবতী বলল, ”একটা কুকুরকে, খাবার।… দ্যাখো তো মুরারিদা, এখনও গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কিনা, খয়েরি রঙের।” উঁকি দিয়ে দেখে মুরারি বলল, ”কই কেউ নেই তো!”
”খয়েরি” শব্দটি মুখ থেকে বেরোতে তখনই কলাবতী মনে মনে নামকরণ করে ফেলে— খয়েরি!
এইভাবেই খয়েরির সঙ্গে কলাবতীর প্রথম আলাপ। পরদিন স্কুলে টিফিন খাওয়ার সময় কলাবতীর মনে ভেসে উঠেছিল খয়েরির ক্ষুধার্ত চাহনি। আর খাবার পেয়ে কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে থাকার ছবিটা। সে পাউরুটির দুটো স্লাইস না খেয়ে রেখে দেয় যদি আবার দেখা হয় রাস্তায় তা হলে খেতে দেবে।
আবার তাদের দেখা হল সত্যানন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে। উবু হয়ে বসে ছিল খয়েরি, তাকে দেখেই লেজ নাড়ল। কলাবতী ওকে না—দেখার ভান করে পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল। মুখটা সামান্য ফিরিয়ে আড়চোখে দেখল খয়েরি বসেই আছে এবং তাকে লক্ষ করে যাচ্ছে। কলাবতী ঘুরে তাকাল। খয়েরিও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। এগোবে কি এগোবে না, ইতস্তত করছে। তারপর অনুভূতি থেকে কী বুঝল খয়েরি প্রায় পা টিপে টিপে কলাবতীর দিকে এগিয়ে এল। কলাবতীর ভাল লাগল ওর কাছে আসাটা। একটা পশু তাকে ভাল লোক হিসেবে বুঝেছে বলেই তো তার কাছে আসছে। ওরা মানুষ চেনে। স্বার্থপর, নিষ্ঠুর লোক দেখলে পশুপাখি দূরে সরে যায়। দাদুর কাছে শুনেছে মানুষের থেকে ওদের নাকি একটা বাড়তি ইন্দ্রিয় আছে, খয়েরিরও তা হলে আছে।
খয়েরি কলাবতীর কাছে এসে মুখ তুলে লেজ নাড়তে লাগল। তার মনে হল খয়েরি যেন বলছে, ”তোমার ওই ব্যাগের মধ্যে কৌটোটায় কিছু আছেটাছে নাকি? থাকলে বার করো না, খুব খিদে পেয়েছে।” কলাবতী বলল, ”এখানে দেব না, আয় আমার সঙ্গে।” এই বলে কলাবতী বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার পিছু নিল খয়েরি।
কলাবতীর মজা লাগল একটা কথা ভেবে, তার মনে হচ্ছে, কুকুরের মনে মনে বলা কথা সে বোধ হয় বুঝতে পারে। নয়তো ”এখানে দেব না’ বলে হাঁটতে শুরু করামাত্র খয়েরি তার পিছু নিল কেন! সে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেল, খয়েরিও তার কথা বুঝতে পারে। বোঝাপড়াটা হল খাওয়ার অর্থাৎ পেটের টানে।
ফটকের কাছে এসে কলাবতী রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে বাড়ির দিকে তাকাল কেউ তাকে দেখছে কিনা দেখার জন্য। অপুর মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফটকের দিকে আসছে, হাতে ঝুলছে বাজার করার প্লাস্টিকের ব্যাগ।
