নিরানব্বুই! পটল হালদার দু’হাত বাড়িয়ে সত্যশেখরের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। জজসাহেব তার কাছা টেনে ধরলেন।
”এখনও শেষ হয়নি, একটা বাকি রয়েছে যে!”
পটল হালদার সোফায় ফিরে এল কাছাটা জজসাহেবের মুঠো থেকে ছাড়াতে না পেরে।
”আপনি যাবেন তো, জোড়া স্তম্ভ…”
”যাব যাব, সুস্থির হয়ে বসুন তো।”
পতু মুখুজ্যে খুঁতখুঁতে গলায় হরিশ কর্মকারকে বলল, ”ঠিকমতো দেখেছ তো? ষাট থেকে স্কোরটা বড্ড ফাস্ট উঠল যেন!”
”উঠবেই তো, চোখ….মানে স্টমাকটা সেট হয়ে গেছে তো।”
নিরানব্বুই!
জজসাহেব রুমালে কপাল মুছলেন, ঠোঁট চাটলেন। সম্পাদক হাতছানি দিয়ে দুলুর বন্ধুকে ডেকে বললেন, ”সেঞ্চুরি করছে….সবে মুখের মধ্যে দিয়েছে, এমন একটা ছবি চাই, এক্সক্লুসিভ।”
সত্যশেখর একটা বরফি পতুর হাত থেকে তুলে কী ভেবে আর—একটা তুলল। পেটে হাত বুলিয়ে ঘরের চারপাশে তাকিয়ে হাসল। তারপর একসঙ্গে কপাত করে মুখে পুরে ঢোঁক গিলে বিরাট হাঁ করে মুখের মধ্যে পুরে ভিতরটা দেখাল। ক্যামেরার আলো ঝলসাল বারবার।
এরপর ঘরের মধ্যে কী হুলুস্থুলু কাণ্ড ঘটল তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
সর্বাগ্রে হরিশ, বিষ্টু আর চণ্ডী খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ভিড় ঠেলে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছল। পটলের কাছা জজসাহেবকে দু’হাতে টেনে রাখতে হয়েছিল। সম্পাদক গোপী ঘোষকে আগামীকাল সকালে রেডি থাকতে বললেন, চিফ রিপোর্টার আসবে ইন্টারভ্যু করতে। পতু বারবার মলয়াকে জিজ্ঞাসা করেছিল ঠিকমতো গোনা হয়েছে কি না। রাজশেখরের চোখ দিয়ে শুধু কয়েক ফোঁটা জল ঝরেছিল। জজসাহেব রুমালটা এগিয়ে দিতে তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে সেটি নিয়ে চোখ মোছেন, আর বলেন, ”আশা করি ওর জিভ বার করা মার্জনা করবেন।” জজসাহেব জিভ কেটে বললেন, ”কী যে বলেন। এত বড় গুণী আমি জানতাম না। নিশ্চয় জিভ দেখাবে…কিন্তু আপনি কি সিরিয়াসলি মনে করেন সিনেমায় নায়ক হওয়ার মতো…”
রাজশেখর ততক্ষণে হরিশঙ্করের দিকে তাকিয়ে হাসছেন।
”রাজু, তোর ছেলে পারল কী করে বল তো? সত্যি বলছি, এমন উৎকট গন্ধওলা জিনিস আমি জীবনে দেখিনি!”
”সিংগিবাড়ির ছেলে তো….বংশের মান রাখতে…”
”না না, ভুল বলছেন, আটঘরার জনগণের নিবিড় প্রেরণা….জনগণকে সঠিক পথ দেখাবার…”
.
বাড়ি ফেরার সময় রাজশেখর ট্র্যাফিকের লাল আলো দেখে গাড়ি থামাতেই কলাবতী বলল, ”দাদু, সেঞ্চুরির জন্য আমাদের কোনো উপহার দেবে না?”
”নিশ্চয় নিশ্চয়, কী চাই তোদের?”
পাশে একটা সবুজ অ্যাম্বাসাডার এসে থামল। রাজশেখর মুখ ফিরিয়ে তাকালেন।
”তোমার ডায়েট চার্ট এবার বন্ধ হোক।”
”অ্যাঁ! আমি তো ভাবছিলাম কাল থেকে চার্টে আরও কয়েকটা…”
”চার্ট বন্ধ না করলে কাল থেকে আমি আর কাকা অনশন শুরু…”
বলতে বলতে কলাবতী পিছনের সিটের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখল সত্যশেখর জিভ বার করেছে আর পাশের গাড়ির জানালা দিয়ে বড়দি গম্ভীর মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
কলাবতী ও খয়েরি (১৯৯৯)
কলাবতী ও খয়েরি (১৯৯৯) – মতি নন্দী / প্রথম সংস্করণ: জানুয়ারি ১৯৯৯ / আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা ৯ পৃ. ১১৮ / মূল্য ৪৫.০০। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় / উৎসর্গ: সুলেখক ডাঃ অনিরুদ্ধ ঘোষ স্নেহাস্পদে
খয়েরির সঙ্গে কলাবতীর পরিচয় হয় রাস্তায়। সেদিন স্কুল থেকে সে প্রতিদিনের মতো হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। পিঠে স্কুলব্যাগ, তার মধ্যে টিফিন বক্স, কাঁধে ঝুলছে ওয়াটার বটল। সেদিন টিফিন বক্সটা খোলার তার দরকার হয়নি, খাবার যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে। তাদের ক্লাসের মিঞ্চুর মা এন্তার পাটিসাপটা বাড়িতে তৈরি করেছিলেন, তারই অনেক পলিথিন ব্যাগে ভরে মিঞ্চু নিয়ে এসেছিল তাই খেয়েই কলাবতীর টিফিন করা হয়ে যায়।
দুপুরে টিফিনে পাউরুটি চিবোতে তার একদমই ভাল লাগে না। জেলি আর মাখন লাগানো রুটির স্লাইস সে প্রায় রোজই মিঞ্চুকে দিয়ে দেয়। পাউরুটি খেতে মিঞ্চুর খুব ভাল লাগে, স্কুল থেকে বাড়ি আসার পথে স্কুটার—মোটরবাইক সারাবার দোকানটার পাশে পাঁঠার মাংসের একটা দোকান, তার পেছনে টিনের এবং টালির চালের অনেক বাড়ি। মাংসের দোকানের সামনে ফুটপাথে কয়েকটা ষণ্ডামার্কা কুকুরকে কলাবতী রোজই দু’বেলা দেখে, ওরা রাস্তা দিয়ে যাওয়া লোকজনের দিকে ফিরেও তাকায় না। বেশ নিরীহ বলেই মনে হয়। তবে দোকান থেকে হাড় বা মাংসের ছাল ছুড়ে দিলে সেটা খাওয়ার জন্য ওরা নিজেদের মধ্যে তুলকালাম ঝগড়া ও কামড়াকামড়ি শুরু করে দেয়।
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় কলাবতী ওই কুকুরগুলোর থেকে একটু তফাতে নতুন একটি কুকুরকে বসে থাকতে দেখল। তার রং খয়েরি কিন্তু মাথার তালুর লোম সাদা, খুবই রুগণ, কোমরের ও বুকের হাড় প্রকট। মাংসওলা একটা ছোট হাড় ওর দিকে দয়াপরবশ হয়ে ছুড়ে দিল। সে হাড়টা মুখে নিতে যাচ্ছে তখন দুটো ষণ্ডা কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। তাকে ফুটপাথে ফেলে একটা কুকুর ঘাড় কামড়ে দিতেই সে পরিত্রাহি আর্তনাদ তুলে লেজটা দু’পায়ের ফাঁকে গুটিয়ে ছুটে পালাল সেইদিকে যেদিকে কলাবতী যাবে।
হাঁটতে হাঁটতে কলাবতী সব লক্ষ করল। তার মনে হল, কুকুরটা বোধ হয় অন্য এলাকার, খিদের জ্বালায় এই এলাকায় খাবার খুঁজতে এসেছিল। বাড়ির কাছাকাছি এসে সে কুকুরটিকে আবার দেখতে পেল সত্যানন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে ফেলে দেওয়া মালসা থেকে দই চেটে খাচ্ছে। বেচারা! নিশ্চয় সারাদিন খাওয়া জোটেনি।
