”খুবই সরল আইন।” হরিশঙ্করকে সিরিয়াস হতে দেখা গেল। ”বকদিঘির বিষ্টু মিশিরজি ছ’টা বরফি তুলে দেবে আটঘরার সত্যশেখরের হাতে। হরিশ দেখবে বরফিগুলো আস্ত না ভাঙা, ঠিকমতো মুখের মধ্যে গেল কি না, বা মুখ থেকে ফেলে দেওয়া হল কি না, খেতে অযথা দেরি করা হচ্ছে কি না। মলয়া গুনবে কটা খাওয়া হল। সময় রাখবেন গোপীবাবু। জলপান—বিরতির ব্যাপারটা খুবই ভাইটাল। সারা দিনে তিনবার মাঠে জল আসে, তাছাড়া লাঞ্চ অ্যান্ড টি আছে। এখানে তাই পাঁচবার জল দেওয়া যাবে আর দশ মিনিট আর পাঁচ মিনিটের দুটো ব্রেক। মিশিরজির পর পতু বরফি দেবে কালুকে। মানে কলাবতীকে।” ঘরের সকলের দিকে চোখ বুলিয়ে হরিশঙ্কর অনুমোদন প্রত্যাশা করলেন। অনেকেই মাথা নাড়িয়ে তাঁকে সমর্থন জানাল।
”এখানে কি আউট নেই?” জানলার বাইরে থেকে অজানা কণ্ঠস্বরে প্রশ্ন এল।
”নিশ্চয় আছে। এদের মধ্যে কেউ খাওয়ায় নিবৃত্ত হলে আটঘরার অন্য কেউ নামবে। এই তো চণ্ডী রয়েছে, পটলবাবু রয়েছেন….।” হরিশঙ্করের আঙুল পটল হালদারের দিকে উঁচিয়ে রইল।
”অ্যাঁ! আআআ…মি!” পটল হালদার বরফির স্তূপের দিকে সভয়ে তাকিয়ে বলল। ”আমি তো ক্রিকেট কখনও খেলিনি।”
”খেলেননি ঠিক কথা। কিন্তু কখনও কি কিছু খাননি…..ভাত ডাল তরকারি মাছ এইসব?” জজসাহেব তার বিপুল গোঁফের ভেতর থেকে একটা মুচকি হাসি বার করলেন।
”তা খেয়েছি। কিন্তু তাতে তো এমন গন্ধ…মানে এটা নতুন জিনিস তো, সমিতির নির্দেশ না পেলে….”
”পটলদা, এটা সংগ্রাম, ঝাঁপিয়ে পড়ো।” চণ্ডীর আবেদন পটল হালদারকে বিচলিত করার আগেই রাজশেখর জলদকণ্ঠে বললেন, ”থাক, আমি তো আছি।”
চণ্ডী বিড়বিড় করল। শোনার জন্য বিষ্টু মিশির গলা বাড়িয়ে দিল।
”অ্যাঁ। কী বললি? দুর্গন্ধ? এমন আবিষ্কার কি কেউ বিয়েবাড়িতে খাইয়ে বউনি করে?”
”গোলাপজল ঢেলে গন্ধ চাপতে গিয়েই কেস খারাপ করে ফেলেছে। ওদিকে পাতে এতক্ষণ বিরিয়ানি নিশ্চয় এসে গেছে। ব্যাচটা উঠলেই বসে পড়ব।”
”আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাস ভাই।”
মেলবোর্ন টাই—টেস্টের মতো এক্সাইটিং
হঠাৎ নির্ঘোষ শোনা গেল হরিশের গলায়, ”প্লে”।
নাক কুঁচকে বিষ্টু গুনে গুনে ছ’টা বরফি ট্রে থেকে তুলে বাড়িয়ে ধরল। সত্যশেখর ছ’টাই খপ করে তুলে নিয়ে মুখে পুরে কোঁত করে গিলে ফেলল। সবিস্ময়ে হর্ষধ্বনি উঠল দরজায়, জানলায়।
”ছক্কা, প্রথমে ওভারেই ছক্কা!”
”জনগণ আপনার সাথে আছে; সতুবাবু, চালিয়ে যান।” পটল হালদার প্রবল উদ্দীপনায় তার পাশের ঊরুতে চাপড় মারল।
”আবার আপনি…”
”আর হবে না, স্যার….কিন্তু আপনাকে আমি আটঘরায় নিয়ে যাবই।”
কলাবতী অবাক হয়ে কাকার মুখের দিকে তাকিয়ে। সত্যশেখর তাচ্ছিল্যের ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ”বাটা নিমপাতা এর থেকেও কুইক গিলতে পারি।”
এবার পতু মুখুজ্যের পালা। মুখবিকৃতি করে সে ছ’টা বরফি তুলল। কলাবতী প্রত্যেকটা থেকে সামান্য ভেঙে মুখে দিয়ে হাত নেড়ে জানাল আর খাবে না।
”মেডেন দিল। খুব চালাক মেয়ে তো!” সম্পাদক ফিসফিস করে জজসাহেবকে বললেন। হরিশঙ্করের মুখে মৃদু হাসি ভেসে বেড়াচ্ছে। আপনমনে বললেন, ”দেখা যাক।”
সাত মিনিট পর দেখা গেল সত্যশেখর সাতটি ওভার বাউন্ডারি এবং একটি বাউন্ডারি গিলে হাফ সেঞ্চুরির দরজায় পৌঁছে গেছে। স্টাইল দেখাতে ছুঁড়ে মুখের মধ্যে পাঠাতে গিয়ে দুটো বরফি ঠোঁটে লেগে মাটিতে পড়ে না গেলে সে আটচল্লিশে পৌঁছে যেত। কলাবতী এখনও স্কোর করেনি।
”দারুণ চালাচ্ছে তো আপনার ছেলে।” জজসাহেব ঝুঁকে রাজশেখরকে বললেন। ”মনে হচ্ছে সেঞ্চুরি করবে।”
”মনে হচ্ছে মানে?” পটল হালদার সোফা থেকে এক বিঘত উঠে দুই মুঠো ঝাঁকিয়ে বলল, ”দুটো স্তম্ভের আবরণ আপনাকে উন্মোচন করতে হবে। ….সতুবাবু, এগিয়ে চলুন।”
স্কোর পঞ্চাশ পার হতেই তুমুল হাততালির কোলাহলের এবং ঘনঘন ক্যামেরার আলোর ঝলসানির মাঝে বাইরে শোনা গেল : ‘ওরে, বরকে ছাঁদনাতলায় নিয়ে আয়!”
”গোপীবাবুকে তো এবার যেতে হবে।” সম্পাদক বললেন। বাইরে সানাই বেজে উঠল।
”অসম্ভব! আটঘরার প্রেস্টিজ এখন কঠিন সঙ্কটে।”
চণ্ডী ফিসফিস করল, ”হ্যাঁ রে, মনে হল ওদিকে যেন পান আনতে বলল। এবার তো রেডি হতে হয়।”
বিষ্টু ঝুঁকে হরিশের কানে কানে বলল, ”নতুন ব্যাচ বসবে, তাড়াতাড়ি শেষ করে না দিলে…”
হরিশ বলল, ”তিনটে তিনটে দিয়ে ওভার করুন….আর পতু মুখুজ্যে যেন টের না পায়।”
কলাবতী তার কাকাকে তখন বলল, ”স্কোরিং রেট খুব ফাস্ট হচ্ছে, এবার গোটাকতক মেডেন দাও।”
”উঁহু, তাহলে ওরা মাথায় চড়ে বসবে।” এই বলে সত্যশেখর তার জিভ ইঞ্চি তিনেক বার করে মলয়ার দিকে ঘুরে তাকাল। মলয়ার চোখ কটমট হয়ে উঠতেই জজসাহেব স্মিত হেসে বললেন, ”পারমিসিবল, ফিফটি হয়ে গেছে তো; তবে সেঞ্চুরির পর উনি আর একবার মাত্র দেখাতে পারবেন।”
এরপর প্রবল উত্তেজনা আর চিৎকারের মধ্য দিয়ে স্কোর ষাট থেকে সত্তরের কোঠায় উঠল। সত্যশেখরকে অবশ্য এর মধ্যে কয়েকবার বিস্মিত হয়ে বিষ্টুর দিকে তাকাতে দেখা গেছল।
ছিয়াত্তর থেকে বিরাশিতে পৌঁছতেই সম্পাদক বলে উঠলেন, ”উফফ, এ যে মেলবোর্ন টাই—টেস্টের মতো এক্সাইটিং লাগছে।”
রাজশেখর আড়চোখে হরিশঙ্করের দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিলেন। হরিশঙ্করের গম্ভীর মুখ আরও গম্ভীর হল।
