”আমাদের কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে।” দরজার কাছ থেকে কথাগুলো ভেসে এল।
”পাক। আর—একটা সংগ্রাম সামনে, আটঘরার আবিষ্কারের উদ্বোধন—ভক্ষণ হবে সেঞ্চুরি দিয়ে আর সতুবাবুর থেকে সুযোগ্য কেই বা আছেন এই কাজের জন্য? ….উফফ, দু’দুটো স্তম্ভ গড়তে হবে…স্যার, আপনাকে কিন্তু দুটোরই…না না, কোনো আপত্তি শুনব না।”
সত্যশেখর বলল, ”বাবা, এসব খাওয়া কি উচিত হবে? ডায়াট চার্টে তো বরফি নেই!”
রাজশেখর একটু ভেবে গম্ভীর হয়ে বললেন, ”আটঘরা বা সিংগিবাড়িরই নয়, তোমার নিজের সম্মানও বিপন্ন। জিভ দেখিয়ে, প্যাঁচামুখো বলে যে গোলমাল পাকিয়েছ, তাতে সেঞ্চুরি না করলে…” হরিশঙ্করের দিকে তাকিয়ে কথা শেষ করলেন, ”মুখ দেখানো যাবে না।”
”আমি কি বরফি এখানেই আনতে বলব?” গোপী ঘোষ জজসাহেবকেই প্রশ্ন করলেন।
”তাই বলুন।”
চিরেতা, ত্রিফলা, থানকুনি হল গিয়ে নেট প্র্যাকটিস
সত্যশেখরের মুখ ইতোমধ্যে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, একটু ঔজ্জ্বল্যও যেন ফুটে উঠেছে। ঘাড় ফিরিয়ে কলাবতীর দিকে তাকাল, তারপর মলয়ার দিকে। তখন জিভটা ঠোঁটের বাইরে একটু বেরিয়ে এসেছিল। জজসাহেব সেটা লক্ষ করে গম্ভীর হলেন।
”পটলদা, উনি একা—একা সেঞ্চুরি করবেন কী করে?” হরিশ মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করল। ”বল করবে কে? ফিল্ড করবে কে? নো—বল কিংবা ওয়াইড হলে ডাকবে কে? অন্তত জনাচারেক যদি মাঠে না থাকে…।”
”ঠিক কথা, তোমরাও তাহলে সতুর সঙ্গে নেমে পড়ো।” রাজশেখর চারজনকে ঘরের মধ্যে আসার জন্য হাত নাড়লেন।
”ব্যাট তো দুজনে করবে, তাহলে আর একজন….?” জজসাহেব সারা ঘরে চোখ বোলালেন।
”আমি হব কাকার পার্টনার।” কলাবতী এগিয়ে এল।
”আসল লোককেই ঠিক করা হল না, স্কোরার, গুনবে কে?”
মিনিট কয়েক বাদানুবাদ চলল। অবশেষে মলয়া বলল, ”আমি স্কোরার হব। স্কুলে অঙ্কের টিচার না এলে আমিই ক্লাস নিই, যোগ—বিয়োগে কোনো অসুবিধা হয় না। অবশ্য কেউ যদি আপত্তি তোলেন…।” মলয়া কথা শেষ করল সত্যশেখরের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে।
মলয়াই স্কোরার নিযুক্ত হল পটল হালদারের আপত্তি সত্ত্বেও, কেননা জজসাহেব বা সম্পাদক ছাড়া রাজশেখরও মলয়ার পক্ষে সায় দেন।
কলাবতী ফিসফিস করে বলল, ”কাকা, বড়দিকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে।”
সত্যশেখর একটু গলা চড়িয়ে বলল, ”সিংগিদের জব্দ করার ব্যবস্থা হলেই কেউ কেউ সুন্দর হয়ে যায় মজা দেখব বলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত তা দেখতে দেব না।”
হঠাৎ সারা ঘরে একটা হালকা কিম্ভূত ধরনের দুর্গন্ধের সঞ্চার হল। গোপী ঘোষ ঘরে ঢুকলেন, তার পিছনে দুটি লোকের কাঁধে ট্রে ভর্তি বরফি। ট্রে দুটি তারা টেবলে রেখে চলে গেল। সারা ঘরের চোখ ট্রের উপর।
”গন্ধ কীসের?” জজসাহেব রুমাল দিয়ে নাক মুছলেন।
”আজ্ঞে, গোলাপজলের।” গোপী ঘোষ একগাল হাসলেন।
”উঁহু।” সম্পাদক পকেট থেকে রুমাল বার করলেন। ”শুধু গোলাপজল নয়, আরও কিছু যেন….বলুন তো কীসের?” প্রশ্নটা জজসাহেবকে।
”বোকা পাঁঠার।”
”তাই কি?” সম্পাদক পতু মুখুজ্যের দিকে তাকালেন।
”মনে হচ্ছে গোবর—পচানো সারের।”
পটল নড়ে—চড়ে বসল। ডান হাতের মুঠি এক গজ উপর থেকে নামিয়ে বাম তালুতে সশব্দে রাখল। ”এসব অপপ্রচার। আমি তো গোলাপজলের ছাড়া অন্য কোনো গন্ধ পাচ্ছি না।”
”কিন্তু জজসাহেব পেয়েছেন।” পতু হুঙ্কার দিল। পটলের মুখ শুকিয়ে গেল।
”বোধহয় একটু ভেপসে গন্ধ হয়েছে।” গোপী ঘোষ কাঁচুমাচু হয়ে জানালেন।
”আমি দেখেছি, কেউ খাচ্ছিল না….সবাই পাতে ফেলে রাখছিল।” চণ্ডী কম্পাউন্ডার একটা গূঢ় রহস্য ফাঁস করার মতো ফিসফিস স্বরে বলল।
”চঅন…ডী।” পটল হালদার দাঁতে দাঁত চেপে ক্রোধ সংবরণ করল। ”মনে রাখিস, তুই আটঘরার লোক….এটা আটঘরার আবিষ্কার।”
চণ্ডীর ফ্যাকাসে মুখে ভয় ছড়িয়ে গেল। বিভ্রান্তের মতো বলল, ”আমি তো….আমি তো বলিনি বরফি খাচ্ছিল না। নিশ্চয় খেয়েছে, আলবাত খেয়েছে।”
হরিশঙ্কর মুচকি হেসে বললেন, ”চণ্ডী হয়তো ভুল দেখেছে। আলবাত খেয়েছে, রাজু তো বলল রান্না এক জিনিস আর খাওয়া আর—এক জিনিস। রান্নার পর্ব তো হয়েই গেছে, এবার খাওয়ার পর্ব আমরা দেখব। সবাই তো শুনেছেনই রাজু বলছে এটা আবিষ্কার, এডিটোরিয়াল লেখার সাবজেক্ট! ভালো কথা। খাওয়ার ব্যাপারটা নাকি সিংগিরাই ভালো বোঝে! হবেও বা। এখুনি তা প্রমাণ হয়ে যাবে।”
কথাটা কীভাবে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল। দরজার কাছে ভিড়, ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেছে। জানালা ভরে গেছে উঁকি—দেওয়া মুখে। যারা পরিবেশন করছিল, তাদের কয়েকজনকে ভিড়ের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। দুলু দু’হাত ছড়িয়ে ভিড় ঠেলতে—ঠেলতে বলল, ”আপনারা কেউ ঘরের মধ্যে ঢুকবেন না, তাহলে কনসেন্ট্রেশন নষ্ট হয়ে যাবে।”
দুলুর বন্ধু ইতোমধ্যে কয়েকটা ছবি তুলে ফেলেছে। টেবলের ধারে কলাবতী আর সত্যশেখর দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে কথা বলছে।
”কাকা, পারবে তো?”
ঠোঁট বেঁকিয়ে সত্যশেখর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ”কালমেঘের থেকেও খারাপ লাগবে কি? গ্যাঁদাল পাতা, ব্রাহ্মী শাক, চিরেতা, ত্রিফলা, থানকুনি…এই সব হল গিয়ে নেট প্র্যাকটিস। তুই শুধু মেডেন ওভার দিয়ে যাবি আর নজর রাখবি মলয়ার দিকে, মনে হচ্ছে স্কোরে গোলমাল করবে।”
”সাইলেন্স….সাইলেন্স।” জজসাহেবের প্রচণ্ড স্বর গমগম করে উঠতেই ঘরটা স্তব্ধ হয়ে গেল। ”হরিশঙ্করবাবুকে অনুরোধ করছি, এই ভক্ষণ—ম্যাচের রুলস সম্পর্কে আমাদের অবহিত করতে।”
