”আগে তাহলে বলুন, আমাকে প্যাঁচামুখো কে বলেছে?”
পটল হালদার ফ্যাকাসে বিব্রত মুখে গোপী ঘোষের দিকে তাকিয়ে দেখল তিনি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, কলাবতীরা হাসি চাপছে, রাজশেখর ব্যস্ত হয়ে সম্পাদকের দিকে ঝুঁকে আফ্রিকার সিংহদের কেশর গির—সিংহদের থেকে ঝাঁকড়া কিনা জানতে চাইলেন।
হরিশঙ্কর নখ খুঁটতে খুঁটতে আনমনে বললেন, ”পটলবাবু তখন যেন সতুর নাম বললেন বলে মনে হল।”
”সতু কে? ডাকুন তো তাকে।” জজসাহেবের কণ্ঠে এজলাসের স্বর ফুটে উঠল।
হরিশঙ্কর টিপ্পনী কাটলেন, ”আসবে কি?”
”সতু আমার ছেলে, একটু আগেই তাকে দেখেছেন।” রাজশেখর কেশর—ফোলানো সিংহের মতো তেজি ভঙ্গিতে হরিশঙ্করের দিকে তাকালেন। ”নিশ্চয় সে আসবে, সিংগিবাড়ির ছেলে যখন, ভয় পাবে কেন…কালু, ডেকে আন তো কাকাকে।”
সেই সময় বাইরে থেকে শোনা গেল : ”দুটো পাত খালি রয়েছে, আর—কেউ থাকেন তো পাঠিয়ে দাও।”
তাই শুনে বিষ্টু আর চণ্ডী একসঙ্গে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। দুজনের চোখ হরিশ অর পতু মুখুজ্যের উপর। কী দেখল কে জানে, ওরা দুজন আবার ধীরে—ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।
”মাত্র দুটো পাত।”
”আমরা চারজন।”
”পটলদা সেই যে গেল!”
উদ্বোধন ভক্ষণ সেঞ্চুরি দিয়ে
ঘরের মধ্যে তখন ঘোর উত্তেজনা। কাগজের রেকাবিতে মাখা—ময়দার মতো দেখতে হরতন—আকৃতির পাতলা কয়েকখণ্ড বরফি নিয়ে গোপী ঘোষ দাঁড়িয়ে। মুখে গদগদ ভাব। হরিশঙ্কর দুই আঙুলে চিমটের মতো একটি বরফি সন্তর্পণে তুলে নাকের কাছে এনেই মুখ বিকৃতি করলেন। কয়েক সেকেন্ড রাজশেখরের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার শুঁকলেন। ঘরের সবাই প্রবল উৎকণ্ঠায় তাঁর মুখভাব লক্ষ করে যাচ্ছে। হরিশঙ্করের নাক কুঁচকে রয়েছে, শরীর যেন ঘোলাচ্ছে।
”হরিবাবু তো বিরোধী পক্ষ, ওনার কাছে আটঘরার আবিষ্কার তো খারাপ লাগবেই।”
পটল হালদার তার সুবিজ্ঞ সিদ্ধান্ত পেশ করে মিটিমিটি হাসতে লাগল।
”তা বটে। নিরপেক্ষ কারুর মতামতই এক্ষেত্রে গ্রাহ্য হওয়া উচিত, কী বলেন জজসাহেব?” সম্পাদক বললেন।
”তার আর দরকার হবে না।” ফুলকপির বরফি খুবই পরিতোষের সঙ্গে চিবোতে চিবোতে হরিশঙ্কর জানালেন। ”অসাধারণ, সত্যিই আবিষ্কার! নেহাত একটা নেমন্তন্ন খেয়ে এখানে এসেছি, নইলে…” হরিশঙ্কর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আবার বললেন, ”….নইলে এখুনি খাওয়ার সেঞ্চুরি করে দিতাম। অদ্ভুত জিনিস, সত্যিই একটা আবিষ্কার।”
”সেঞ্চুরি করা সোজা ব্যাপার নয় হরিশঙ্করবাবু, সেজন্য প্রেরণা চাই…চাই জনগণের শুভেচ্ছা। সতুবাবুর সেঞ্চুরির পিছনে আছে জনগণকে সঠিক পথ দেখাবার ইচ্ছা।”
”তাহলেই সেঞ্চুরি করা যাবে?” জজসাহেব কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।
”নিশ্চয় যাবে। বকদিঘি থেকে রটনা হচ্ছে, লাঞ্চে রসগোল্লা খেতে না পেরে সতুবাবু নাকি সেই রাগে বেধড়ক ব্যাট চালিয়ে সেঞ্চুরি করেছেন…..এটা কি একটা যুক্তি হল?”
”রাগটা নিশ্চয় খুব মহান ছিল!” তির্যক মন্তব্য করলেন হরিশঙ্কর।
”খিদের চোটে মানুষ অবশ্য অনেক কিছু অবিশ্বাস্য কাজ করে ফেলে।” সম্পাদক টীকা যোগ করলেন।
”পৃথিবীতে বিপ্লবের জন্মই তো খিদে থেকে।” পটল হালদারের কণ্ঠ থেকে দৃপ্ত শব্দগুলি বেরিয়ে আসতে না আসতেই দরজার কাছ থেকে কাতর স্বর ভেসে এল, ”পটলদা!”
সবাই চমকে উঠে দেখল চারটি লোক বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে। তাদের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে আর—একটি ভীত মুখ। পটল হালদার হাত তুলে তাদের অপেক্ষা করতে বলল।
”বাবা, তুমি ডাকছ আমায়?” জড়োসড়ো সত্যশেখরের ক্ষীণ স্বর ঘরে ভেসে এল।
”এখানে এসো।” সিংহ—গর্জনে আহ্বান গেল।
মেঝেয় চোখ রেখে সত্যশেখর এগিয়ে এল রাজশেখরের সামনে। তার পিছনে কলাবতী এবং মলয়া।
”জজসাহেবকে জিভ দেখিয়েছিলে আর্গু করার সময়?”
সত্যশেখর মাথা হেঁট করে রইল। রাজশেখর কড়া চোখে মলয়ার দিকে তাকালেন। ”সঙ্গে ক্যামেরা এনেছ নাকি?”
বিভ্রান্ত মলয়া মাথা নেড়ে বলল, ”না তো!”
”জজসাহেবকে প্যাঁচামুখে বলেছ?”
চমকে পটল হালদারের দিকে তাকাল সত্যশেখর।
পটল কুঁকড়ে গেল। পাংশু মুখটা ফিরিয়ে সে দরজায় দাঁড়ানো চারজনের দিকে অসহায় চোখ রাখল।
”হ্যাঁ।” সত্যশেখর ঢোঁক গিলে কাঁদোকাঁদো মুখে জজসাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল।
রাজশেখর গর্বভরে হরিশঙ্করের দিকে এমনভাবে ভ্রূ তুললেন যেন বলতে চান, একেই বলে সিংহ।
”কিন্তু জজসাহেবের মোটেই প্যাঁচার মতো মুখ নয়। এখনও ওনাকে বাংলা ফিল্মের নায়কের ভূমিকায় নামানো যায়। তোমার অবজার্ভেশন যে এত খারাপ, আমি জানতুম না। কী করে যে আইন নিয়ে….যাক গে, জজসাহেব, আপনি যা শাস্তি দিতে চান দিন।”
জজসাহেব বিমূঢ় হয়ে আমতা—আমতা শুরু করলেন। ব্যাপারটা যে এই পর্যায়ে আসবে বুঝতে পারেননি। রুমালে ঘনঘন মুখ মুছতে লাগলেন।
গলা খাঁকারি দিয়ে হরিশঙ্কর বললেন, ”শাস্তি কেন? এই সত্যবাদিতার জন্য সত্যশেখরকে তো তারিফ করা উচিত।”
”ঠিক, ঠিক।” জজসাহেব যেন অকূলে কূল পেলেন। ”শাস্তি নয়, বরং অভিনন্দন জানানোই ভালো।”
”মানপত্র দেওয়া যেতে পারে।” পটল হালদারের মুখে স্বাভাবিক রঙ ও কণ্ঠস্বরের উদ্দীপনা ফিরে এসেছে।
”আটঘরা—বকদিঘি বাৎসরিক ক্রিকেট ম্যাচ এতবছর ধরে চলছে। কিন্তু সত্যশেখর ছাড়া কেউই আজ পর্যন্ত সেঞ্চুরি করতে পারেনি।” হরিশঙ্কর যেন বকদিঘির নয়, আটঘরার লোক, এমনভাবে কথাগুলো বললেন। ”আমার মনে হয় এই প্রথম এবং একমাত্র কৃতিত্বকে যথার্থ সম্মান দেওয়া হবে যদি আটঘরার আবিষ্কার ফুলকপির বরফি দিয়ে প্রথম সেঞ্চুরি করার সুযোগটাও সত্যশেখরকে দেওয়া হয়। এই সুস্বাদু আবিষ্কারের জন্য ব্যাপক পাবলিসিটিও তো দরকার।” সম্পাদকের দিকে তাকিয়ে হরিশঙ্কর মাথা দোলালেন। সম্পাদকের মাথাও দুলে উঠল সায় দিয়ে, ”নিশ্চয় নিশ্চয়, স্পেশাল স্টোরি করা উচিত।”
