মলয়া একটু ইতস্তত করে বলল, ”বড্ড গরম লাগছে, আমি বাইরেই থাকি, তুমি দেখা করে এসো বরং।”
কলাবতী তখন দুলু আর তার ক্যামেরা—হাতে বন্ধুটিকে বলল, ”চলো মজার ব্যাপার দেখবে, দুই বুড়োর ঝগড়া!”
”মজা!” দুলু অবাক হয়ে ঘরের ভিতরে তাকিয়ে বলল, ”জীবনে এই প্রথম বাবাকে ধমক খেতে দেখছি, ওই দ্যাখো।”
ফুলকপির বরফি সেম অ্যাজ লেগ গ্লান্স
ওরা তিনজন ঘরের মধ্যে ঢুকে একধারে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বহুবার ঝলসাল, কিন্তু ঘরের কেউ তাতে ভ্রূক্ষেপ করল না।
”বলেন কী, আমার অ্যাডভাইস আপনি নিলেন না?” হরিশঙ্করের গর্জনে গোপী ঘোষ আর—একটু কুঁকড়ে গেলেন। ”ফুলকপির রোস্ট আর পেস্তার বরফি করেননি?”
”ভাবলুম নতুন একটা কিছু করি, তাই দুটো থেকে আধখানা করে মানে রোস্ট আর পোস্তাটা বাদ দিয়ে করেছি ফুলকপি বরফি….অসাধারণ, নতুন ব্যাপার। ষাট ঘণ্টা ফুলকপিগুলো ভিজিয়েছি পোস্তবাটা জলে। ধুয়ে নিয়ে মাখিয়েছি গোলমরিচ, হিং আর আদা; এগারো ঘণ্টা ধুয়ে সেদ্ধ করে চটকে মাখন মাখিয়ে ছ’ঘণ্টা উনুনে শুধু পাক হয়েছে। তারপর খোয়া ক্ষীর, ছানা, কাঁচা আলু বাটার সঙ্গে মিশিয়ে আবার পাক। তারপর চিনেবাদাম বাটা, চিঁড়ে বাটা….।”
”থাক থাক আর বলতে হবে না।” দু’ হাত মাথার উপর তুললেন হরিশঙ্কর।
”এটা আটঘরার একটা আবিষ্কার।” রাজশেখর উদাসীন ভঙ্গিতে প্রথম জজসাহেবের দিকে তাকিয়ে কথাটা শুরু করে মুখটা সম্পাদকের দিকে ফিরিয়ে ”এডিটোরিয়ালের জন্য ভালো সাবজেক্ট” বলে শেষ করলেন।
”আটঘরার আবিষ্কার মানে তো অখাদ্য। ইসস, পেস্তার বরফিটাই খাব বলে বন্ধুর বাড়িতে কিছুই খেলাম না, শুধু আটটা ফ্রাই আর গোটা দশেক কড়াপাক…ওহ, কী ভুলই করেছি!” হরিশঙ্কর কপালে করাঘাত করার জন্য হাত তুলেই নামিয়ে নিলেন পটল হালদারকে দেখে।
”গোপীবাবু,” পটল পিছন থেকে ঝুঁকে গোপী ঘোষের কানে ফিসফিসিয়ে বলল। হরিশঙ্করের ক্রোধ—গর্জনে গোপী ঘোষ নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। চমকে পিছন ফিরে পটলকে দেখেই রেগে উঠলেন।
”গোপীবাবু কী করবে? এ ঘরে অঞ্চল—প্রধানের কী দরকার? অ্যাঁ….এখানে শ্রেণীসংগ্রাম চলবে না বলছি।”
”আজ্ঞে সংগ্রাম নয়, আমাদের খিদে পেয়েছে।”
”পেয়েছে তো বসে পড়ুন।”
পটল হালদার বসার জায়গার জন্য এধার—ওধার তাকাতে লাগল। জজসাহেবের পাশের খালি জায়গাটুকু নজরে পড়তেই সে এগিয়ে এসে ‘একটু সরুন তো’ বলেই জজের পাঞ্জাবির হাতা চটকে, লোটানো ধুতির কোঁচা মাড়িয়ে সোফায় বসল।
জজসাহেবের গোঁফের ফাঁক থেকে কোলাব্যাঙ ডাকার মতো একটা শব্দ বেরিয়ে এল। পটল হালদার লজ্জিত হয়ে বলল, ”মাপ করবেন….আমি দেখতে পাইনি, ক্ষমা চাইছি।”
”দেখতে পাননি? কী নাম আপনার?”
”পটল হালদার।”
”কী করেন।”
”আটঘরা অঞ্চল সমিতির প্রধান। …আপনি?” বিনীতভাবে পটল জানতে চাইল।
”আমি হাইকোর্টের একজন বিচারপতি।”
”অ।” বলেই পাঁচ সেকেন্ড পর পটল হালদার স্প্রিংয়ের মতো সিধে হয়ে বসল। ”তাই বলুন! আপনিই সেই জজ, যার কথা সতুবাবু বলে দিলেন।”
”কে সতুবাবু? কী বলেছেন?”
”সত্যশেখর সিংহ, চেনেন না? আপনাদের হাইকোর্টেরই তো ব্যারিস্টার। ….আহা, কী ব্যাটটাই না এবার করলেন। শতরান—স্তম্ভ আমি তুলবই, স্যার আপনাকে গিয়ে উদ্বোধন করতে হবে…না না, কোনো কথা শুনব না….আটঘরার জনগণ আপনাকে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে।” পটল হালদার জজসাহেবের ঊরুতে দু’হাতের তালু রেখে মিনতি জানাল।
”উহুহু, করছেন কী?”
”আপনাকে যেতেই হবে। আমার প্রধানত্বে আটঘরায় কিনা হাইকোর্টের জজ! ….উহহ, ভাবতে পারেন কতবড় প্রাপ্তি হবে সেটা?”
দুই তালু দিয়ে এবার সে ঊরু খামচে ধরল। জজসাহেব রেগে হাতদুটো সরিয়ে দিলেন।
”আপনি বড্ড বেয়াড়া লোক তো!”
”যেতেই হবে। নইলে হাইকোর্টে মিছিল আনব, ধর্না দেব, ঘেরাও করব।”
”তিনমাসের জন্য তাহলে চালান করব।”
”মানে?”
”মানে ঘানি ঘোরাবার ব্যবস্থা করব। ….হাত সরান।”
পটল হালদার মাথাটা কাত করে সরু চোখে আট সেকেন্ড জজসাহেবের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”আপনি কেমন বিচারপতি, মশাই, জনগণের ইচ্ছাকে….সতুবাবু দেখছি ঠিকই বলেছিল, আপনি প্যাঁচামুখোই বটে।”
”কে, কে, কে বলেছে।”
ঘরের অন্যদিকে তখন হরিশঙ্করের মুখের কাছে মুখ এনে রাজশেখর দাঁত চেপে গজরালেন, ”আটঘরার আবিষ্কার অখাদ্য? আবিষ্কার কথাটার মানে জানিস? আবিষ্কার হচ্ছে নতুন জিনিস, ইনভেনশন, যা আগে কখনও পৃথিবীতে ছিল না….সুইং বোলিং আর গুগলি কী করে খেলতে হয়, প্রথম দেখাল জ্যাক হবস, লেগ গ্লান্স প্রথম দেখাল রঞ্জি, একেই বলে আবিষ্কার। আটঘরার ফুলকপির বরফিও সেম অ্যাজ লেগ গ্লান্স….লোকের পাতে পড়বে আর গণ্ডায় গণ্ডায় বাউন্ডারি পেরিয়ে যাবে। গোপীবাবু, গোটাকতক হরিকে এনে দিন তো।”
”এখুনি মেয়েদের ব্যাচ বসবে, একেবারে সেখানেই তো….”
”না না, মেয়েদের সঙ্গে বসে নয়। এখানে এখুনি ওকে দিন। আটঘরার আবিষ্কার অখাদ্য কি না সেটা জজসাহেব রয়েছেন, এডিটার রয়েছেন, ওঁদের সামনেই প্রমাণ হয়ে যাক।”
”হ্যাঁ, এঁদের থেকে যোগ্য ব্যক্তি….হাইকোর্টের জজ, কাগজের এডিটার….আর কে হতে পারেন?” পটল হালদার ছিলে—ছেঁড়া ধনুকের মতো দাঁড়িয়ে উঠল। ”যদি হরিশঙ্করবাবু বলেন অখাদ্য, তাহলে এনারা চেখে দেখবেন। এনারা যদি বলেন সুস্বাদু, তাহলে আমি কথা দিচ্ছি, আটঘরা অঞ্চল সমিতি তার এলাকার প্রতিটি মেহনতি মানুষকে এক কেজি করে এই আবিষ্কার উপহার দেবে এবং সেই উপহার—অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন…” পটল মুখ নামিয়ে বলল, ”স্যার অনুষ্ঠানে আপনাকে যেতেই হবে…না না, আর আপত্তি করবেন না, এবার রাজি হয়ে যান।”
