”আপনার সেঞ্চুরি যে প্রতিক্রিয়াশীলদের কবর খুঁড়বে, তা নিশ্চয় আপনি জানতেন?”
”অবশ্যই জানতুম।”
”অথচ দেখুন এরা তথ্যকে বিকৃত করে প্রচার করছে আপনি নাকি বুর্জোয়া সংস্কৃতির অন্যতম ধারক যে রসগোল্লা, শোষক সম্প্রদায়ের লোভ দেখানোর বস্তু যে রসগোল্লা, তাই ভক্ষণ থেকে বঞ্চিত হয়ে নাকি সেদিন সেঞ্চুরি করেছিলেন, শত্রুকে প্রহার করে অতৃপ্তির শোধ নিয়েছিলেন?”
”হতে পারে।”
”সে কী, জনগণের প্রতি নিবিড় ভালোবাসা কি আপনার প্রেরণা ছিল না? আপনি কি বকদিঘির অপপ্রচারকে সমর্থন করবেন?”
”অ্যাঁ! বকদিঘি এই রকম কথা বলছে?” সত্যশেখর বিপন্ন হয়ে তাড়াতাড়ি যোগ করল, ”রসগোল্লা আমি যে মোটেই ভালোবাসি না, পতুবাবু আপনি কি তা জানেন না?”
”আমি কী করে জানব! আপনি উচ্ছে ভালোবাসেন না করলা ভালোবাসেন, তা কি আমার জানার কথা?”
এই সময় চণ্ডী কম্পাউন্ডার ঝুঁকে হরিশ কর্মকারকে বলল, ”লক্ষ করলি, সন্দেশের মতো কী একটা দুবার রিপিট করল, কিন্তু কেউ নিল না! শুঁকেই পাতে ফেলে রাখছে।”
”বোধহয় মিষ্টি বেশি হয়ে গেছে।”
”এটা উচ্ছে—করলার প্রশ্ন নয়, পতুবাবু।” অঞ্চল—প্রধান চোখ বুজে দু’হাত নাড়ল। ”আপনি রসগোল্লাকে প্রেরণা বলছেন, অথচ উনি রসগোল্লাই ভালোবাসেন না, খান না….দেখতে পর্যন্ত পারেন না। আপনি ভুল তথ্য দিয়ে আমাদের বিভ্রান্ত করছেন।”
”পটলদা, তুমি যে বলেছিলে সতুবাবুর সেঞ্চুরির জন্য সভা করবে, মিছিল করবে, শতরান—স্তম্ভ গড়বে, সে—সবের কী হল?” হরিশ সরল বোকাবোকা মুখ করে জানতে চাইল।
”হবে। সভা হবে, মিছিলও হবে। সতুবাবু ব্যস্ত মানুষ, সময় যেদিন দিতে পারবেন সেদিনই….” সত্যশেখরকে কিছু একটা বলার জন্য হাঁ করতে দেখেই পটল হালদার দ্রুত যোগ করল, ”জানি জানি আপনি কাজের লোক, তাই তো বিরক্ত করিনি।”
”পটলদা, স্তম্ভটা?”
”হাইট কতটা হবে তাই নিয়ে নিয়মিত আলোচনায় বসছি। আপাতত তিন ফুট থেকে চার ফুটে আমরা উঠেছি।”
বাড়ির ভিতর থেকে এই সময় একটা চিৎকার ভেসে এল ”আর দু’মিনিট পর মেয়েদের নামতে বলরে, পাত রেডি হচ্ছে।”
বিষ্টু আর চণ্ডী একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল। পান চিবোতে চিবোতে লোকেরা বেরিয়ে আসছে।
”বেশ খাইয়েছে…..ফ্রাইটা জোর সাঁটিয়েছি।”
”আমি তেরোটার বেশি আর টানতে পারলুম না।”
”আরে মিহিদানাটা অত খাচ্ছিলিস কেন বোকা! সরভাজা আছে জানতিস না?”
”বিরিয়ানিটাই বেস্ট….কী একটা বরফি বলে দিল, মাগো, যা বোঁটকা গন্ধ! অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসছিল।”
শুনতে শুনতে চণ্ডীর চোখমুখ কখনও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল, কখনও চুপসে যাচ্ছিল। কাতর স্বরে সে বলল, ”পটলদা, পেটের মধ্যে খিদের স্তম্ভটা যে দশ ফুট ছাড়িয়ে গেছে। এবার তো দেখছি মেয়েরা বসবে…ভেতরে গিয়ে হালচাল বুঝে এসো না।”
বিষ্টু বলল, ”তুমি হলে গিয়ে অঞ্চল—প্রধান, দেখবে না আমাদের? হলামই বা আমরা বকদিঘির।”
পতু মুখুজ্যের পাকস্থলিতেও মোচড় দিচ্ছে। সে গাম্ভীর্য বজায় রেখে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলল, ”যাদের ট্রেন ধরতে হবে, তাদের আগে ছেড়ে দেওয়া উচিত।”
পটল হালদার আমতা—আমতা করে বলল, ”কিন্তু আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না….”
”বাড়ির ভেতরে যান। গোপীবাবু ভেতরে আছেন আর তিনি তো আপনাকে বিলক্ষণই চেনেন।” পতু মুখুজ্যে সেকেন্ড স্লিপকে থার্ডম্যানে যেতে বলার মতো বাড়ির দরজার দিকে আঙুল দেখাল।
পটল হালদার গুটিগুটি এগোল। তখন সত্যশেখর খপ করে তার হাত টেনে ধরে বলল, ”ঢুকেই বাঁ দিকের ঘরে বাবা, হরিকাকা বসে আছেন। দেখবেন ফর্সা, টেকো, গুঁপো, একটা প্যাঁচামুখো লোকও আছে। লোকটা কখন বিদেয় হবে সেটা কায়দা করে জেনে আসতে হবে, পারবেন?”
”হেঁ হেঁ হেঁ, কায়দাই যদি না জানি, তা হলে কি অঞ্চল প্রধান হতে পারতুম। নিশ্চিন্ত থাকুন, দু’ মিনিটে খাওয়ার ব্যবস্থা আর আপনার খবর…”
সত্যশেখর তাকিয়ে রইল পটল হালদার বাঁ দিকের ঘরটায় না ঢোকা পর্যন্ত। তখন দোতলা থেকে মেয়েরা আর বাচ্চচারা কলকল করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। কে চেঁচিয়ে বলে উঠল, ”এখনও রেডি হয়নি…একটু অপেক্ষা করুন, আর দু’ মিনিট।”
দুলু এবং ক্যামেরা হাতে একটি ছেলের সঙ্গে কলাবতী গল্প করতে করতে নামছিল। দূরে কাকাকে দেখে সে মুখের কাছে গরাস ধরে ইশারায় জানতে চাইল খাওয়া হয়েছে কি না। পেটে হাত রেখে সত্যশেখরের বিষণ্ণ মাথা নাড়া দেখে কলাবতী পিছনে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ”বড়দি, এখনও কাকার খাওয়া হয়নি।”
”এসেছেন বুঝি?”
”হ্যাঁ। মনে হচ্ছে খুবই কষ্ট পাচ্ছে। দাদুর ডায়েট চার্টের এফেক্ট শুরু হয়ে গেছে। আজকাল যা খিদে পায় না কী বলব!”
”এই যে বললে লুকিয়ে লুকিয়ে তোমরা খাও।”
”খেলেই বা! ইদানীং দাদুর কেমন যেন সন্দেহ হয়েছে আমরা ডায়েট চার্ট ফলো করছি না। মুরারিদাকে প্রায় সাসপেন্ড করে রেখেছেন। বাড়ির বাইরে এক পা—ও যেতে দেন না। বলরাম দোকান—বাজার করে। দাদু নিজের হাতে এখন আমাদের ভোর থেকে রাত পর্যন্ত সামনে বসে খাওয়ান…উফফ বড়দি, সে যে কী ভীষণ, বোঝাতে পারব না! এখন রাক্ষসের মতো খিদে হয়েছে, কাকার তো আরও বেশি! আজই বলছিল, ফাঁসির খাওয়া খাব।”
সিঁড়ির মুখে ভিড় জমে গেছে। পাশের ঘরে দাদুকে দেখতে পেয়ে কলাবতী বড়দিকে বলল, ”ভিতরে যাবেন?”
