এই সময় দরজার কাছে সত্যশেখরকে হাসি মুখে উঁকি দিতে দেখা গেল। কিন্তু ঘরের মধ্যে টাকমাথা এবং আশু মুখুজ্যে—গোঁফ সম্বলিত জজসাহেবকে দেখেই সে জিভ কেটে শটকান দিল। রাজশেখর সঙ্গে সঙ্গে ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন। জজসাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ”এইমাত্র যে উঁকি দিল…ব্যারিস্টার সিনহা, গতকাল আমার বেঞ্চেই আর্গু করতে করতে অন্তত পাঁচবার আমাকে জিভ দেখিয়েছে।”
হরিশঙ্কর মুচকি হেসে চোখ টিপলেন রাজশেখরকে।
‘আপনি কিছু বলেননি?” হরিশঙ্কর খুবই ভালোমানুষী গলায় বললেন।
”নিশ্চয়। বলেছি ফারদার জিভ বার করলে আমার এজলাসে আর ঢুকতে দেব না।”
”তারপরও কি আর জিভ বেরিয়েছে ?” রাজশেখর গম্ভীরভাবে জানতে চাইলেন।
”না, তারপর এখানে এইমাত্র দেখলুম।”
”ব্যারিস্টার সিনহা এরই ছেলে।” হরিশঙ্কর ভিজে বেড়ালের মতো চোপসান স্বরে এবং মুখটি নিরীহ করে বললেন। রাজশেখর কটমটিয়ে তাঁর দিকে তাকালেন। জজসাহেব অপ্রতিভ হয়ে টাকে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, ”ইয়ে, কিছু মনে করবেন না, আমি জানতাম না যে….”
”মনে করব কেন।” রাজশেখর ধমকের ধমকের মতো কণ্ঠে বললেন, ”ঠিকই বলেছেন ওকে, আমি হলে তো, তিনবারের পরই এজলাস থেকে বার করে দিতাম। …উফফ, কতদিন আমি এটাই ভয় করেছি যে, সতু এমন কাণ্ড করবে। ওর এই বদ অভ্যাসটা তৈরি করেছে তোর মেয়ে।”
”মলয়া!”
”নিশ্চয়। হাতে সব সময় ক্যামেরা, আর সতু জিভ বার করলেই ছবি তুলে নেয়। ছবি তোলাবার লোভ থেকে সতুর তাই জিভ বার করার অভ্যাসটা দাঁড়িয়ে গেছে।”
”তোর ছেলে তো সিংগি, তাহলে ষাঁড়েদের মতো স্বভাব কেন?”
”মানে?”
”ষাঁড়ের সামনে লাল কাপড় নাড়লেই খেপে যায়। তোর ছেলের সামনে ক্যামেরা ধরলেই…”
”কিনিয়ার সাফারি পার্কে আমি খুব কাছের থেকে সিংহদের ছবি তুলেছি, কিন্তু সিংহরা তো একবারও খেপে যায়নি!” খবরের কাগজের সম্পাদক বললেন।
”আফ্রিকার সিংহরা একরকম আটঘরার সিংহরা আর—একরকম।” হরিশঙ্কর বিনীত ভঙ্গিতে জানালেন, ”ওরা হরিণ খায়, শুওর খায়, জেব্রা খায়, আর এরা খায় কলা!”
”সিংহ খায় কলা!” ঘরের সবাই বিস্ময়ে একসঙ্গে বলে উঠলেন।
”ওঁকেই জিজ্ঞেস করুন। ক্রিকেট ম্যাচে বাজি ধরেছিল রসগোল্লা বা সন্দেশ নয়…কলা।”
রাজশেখর মুখ লাল করে নীরব রইলেন।
ঘরের অনেকেই মুচকি হাসলেন। এইসময় বাইরে সামান্য কোলাহল শোনা গেল। একব্যাচ খেয়ে উঠে বেরিয়েছে, সম্ভবত এরা বরযাত্রী। শামিয়ানা—ঘেরা বসার জায়গায় কন্যাপক্ষের লোকদের মধ্যে বকদিঘির বিষ্টু মিশির, ক্যাপ্টেন পতু মুখুজ্যে আর হরিশ কর্মকারকে দেখা যাচ্ছে। একটা ম্যাচে হরিশ এবং গোপী ঘোষ আম্পায়ার ছিল। তাই হরিশের নিমন্ত্রণ। মিশিরের স্টোরেজে গোপী ঘোষের খেতের আলু থাকে।
আটঘরার চণ্ডী কম্পাউন্ডার, পঞ্চায়েত—প্রধান পটল হালদার রয়েছে ওদের সামনের সারির চেয়ারে।
”পটলবাবু, এবারের ম্যাচে লাঞ্চের জন্য হাবু ময়রা নাকি মাত্র দু’ হাঁড়ি রসগোল্লা দিয়েছিল?”
পতু মুখুজ্জে কী বলতে চায়, তা বুঝতে না পেরে পটল হালদার সাবধান হয়ে গেল।
”দু হাঁড়ি কি দশ হাঁড়ি তাতে কী এসে যায়, সবাই পেটভরে তৃপ্তি করে খেয়েছে কি না, সেটাই বড় কথা।”
”তা তো ঠিকই, নিশ্চয়, আসলকথা হল তৃপ্তি। কিন্তু আমি শুনেছিলাম রসগোল্লা কম পড়ে গেছল? আর তাইতে নাকি আধপেটা সতু সিংগি রেগে বকদিঘির বোলারদের পিটিয়ে সেঞ্চুরি ভক্ষণ করে!”
”একদম বাজে কথা।” পটল হালদারের উত্তেজিত কনুই পাশে বসা আটঘরার মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান চণ্ডী কম্পাউন্ডারকে খোঁচা দিল। চণ্ডী তখন ব্যাকুল চোখে শামিয়ানার প্রবেশপথের ফাঁক দিয়ে খাওয়া দেখছিল। হঠাৎ পাঁজরে খোঁচা খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ”রসগোল্লার সাইজটা বেশ ভালোই মনে হচ্ছে।”
”দূর মশাই রসগোল্লার সাইজ, পতুবাবু কী বললেন তা শুনেছেন?”
”শুনিনি মানে? রসগোল্লা কম খেলে রাগ হয়, আর তাহলেই সেঞ্চুরি ভক্ষণ করে রাগ মেটাতে হয়। তাই তো?”
এই সময় দেখা গেল সত্যশেখর কাঁচুমাচু মুখে কেমন জড়োসড়ো ভঙ্গিতে বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। ওকে দেখেই পটল হালদার উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠল।
”সতুবাবু….এদিকে, এই যে, এখানে একবার আসুন তো।”
মনে হল সত্যশেখর এই আহ্বান শুনে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কোঁচাটা হাঁটু পর্যন্ত তুলে প্রায় ছুটে এল।
”আচ্ছা বলুন তো, আপনার সেঞ্চুরি করার পিছনে কীসের প্রেরণা ছিল?”
এমন একটা প্রশ্নের সামনে যে পড়তে হবে, সত্যশেখর তা ভাবেনি। ফ্যালফ্যাল করে সে সদাসংগ্রামশীল ও বিপ্লবী আটঘরা অঞ্চল সমিতির প্রধান পটল হালদারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
”আমার তো মনে হয় আটঘরার প্রগতিশীল মেহনতি মানুষের ঐক্য জোরদার করার জন্যই, তাদের বুর্জোয়া বিরোধী চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই আপনি ব্যাট হাতে দেখিয়ে দিয়েছেন কী করে শত্রুর মোকাবিলা করতে হয়। আর এর পিছনে ছিল আটঘরার জনগণের সমবেত শুভেচ্ছা ও শত্রুর প্রতি বৈপ্লবিক ঘৃণা, যা সংগ্রামের সঠিক পথে চালিত হবার জন্য মদত দিয়েছিল। ঠিক বলছি কিনা?”
সত্যশেখর মুহূর্ত বিলম্ব না করে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।
”আপনার সেঞ্চুরি যে জনগণকে সঠিক পথ দেখাবে, এটা নিশ্চয় আপনি জানতেন?”
”নিশ্চয় জানতুম।”
