”আমার খুব ইচ্ছে করে শিখতে।”
”জিজ্ঞেস করব। যদি তোমাকে শেখাতে রাজি হন তো জানাব।”
”ঠিক?”
”ঠিক।”
ফাঁসির খাওয়া খাব
বাড়ির সামনের ফুটপাথ রঙিন কাপড়ে ঘিরে চেয়ার পেতে অভ্যাগত আর বরযাত্রীদের বসার ব্যবস্থা হয়েছে আর বাড়ির লাগোয়া খালি জমিটা তাদের খাওয়ানোর ব্যাপারে লেগেছে। বাড়ির রকে সানাই বসেছে।
নাতনিকে পাশে নিয়ে রাজশেখর ১৯২৮—এর ফোর্ড গাড়িটা চালিয়ে যখন পৌঁছলেন, তখন গিজগিজে ভিড়। বর এসে গেছে। তিনটে মিনিবাস রাস্তার মোড়ে। তাছাড়া গোটা পঁচিশ মোটর সার দিয়ে রাস্তার দুধারে। রাজশেখর তাঁর ফোর্ডকে কোথায় রাখবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সামনে কোথাও রাখার স্থান না পেয়ে গাড়িটাকে পিছু হটিয়ে আনছিলেন কলাবতীর নির্দেশ অনুসরণ করে।
”দাদু, বড়দিদের গাড়ি।” কলাবতী গলা নামিয়ে চাপাস্বরে বলল।
”কই?”
রাজশেখর ব্রেক প্যাডেলে পা চাপলেন।
”ওপারে, সবশেষের সবুজ অ্যাম্বাসাডারটা।”
”ঠিক দেখেছিস, হরিরই তো?”
”হ্যাঁ ঠিক দেখেছি। বড়দি তো ওটাতেই রোজ স্কুলে আসেন।”
মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ফোর্ড এসে সবুজ অ্যাম্বাসাডারের পিছনে এমনভাবে দাঁড়াল যে, উভয়ের বাম্পারের মধ্যে দূরত্ব রইল ইঞ্চি—ছয়েক। সামনের স্টেশন ওয়াগনটা বা পিছনের ফোর্ড জায়গা না দিলে অ্যাম্বসাডার বেরোতে পারবে না।
”সতুর আজকেই কিনা মক্কেলদের দিয়ে গুজুর—গুজুর করার তাড়া পড়ল। একসঙ্গে এলে কত ভালো দেখাত।” গাড়ি থেকে নেমে লুটোনো কোঁচাটা বাঁ হাতের দু’ আঙুলে আলতো তুলে ধরে রাজশেখর কাঁধের মুগার চাদরটা ডান হাতে গুছিয়ে নিতে নিতে ক্ষুব্ধ কণ্ঠেই বললেন।
”কাকার এখন নাম হয়েছে, পসার হচ্ছে,” কলাবতী বিজ্ঞের মতো সান্ত্বনা দেবার স্বরে বলল, ”এখন ফাঁকি দেওয়াটা ঠিক হবে না।”
উপহারের জন্য শাড়ির বাক্সটা সে গাড়িতেই ফেলে রেখে নেমে পড়েছিল। রাজশেখর মনে করিয়ে দিতেই সে ”ইসস” বলে জিভ কাটল।
দু’জনে বিয়েরবাড়ির সামনে পৌঁছতেই গোপী ঘোষ এগিয়ে এলেন দুই কর জোড়া করে।
”আমার কী সৌভাগ্য, আপনি এলেন….এইমাত্র হরিশঙ্করবাবুও পৌঁছলেন আর এক জায়গায় নেমন্তন্ন সেরে….হেঁ হেঁ, ঠিকই আপনি বলেছিলেন…যাও মা, তুমি ভিতরে যাও, ওরে, দুলুকে ডাক। …আপনি এদিকের ঘরে এসে বসুন, ওদিকটা বরযাত্রীদের জন্য।”
রাজশেখরকে তিনি যে—ঘরে আনলেন, সেটি তাঁর আম দরবার। তাঁর বিধানসভা এলাকার লোকেদের সঙ্গে এই ঘরে দেখা করেন। ঘরের তিন দেয়াল ঘেঁষে লম্বা সোফা। একটা বিরাট টেবল। সোফায় বসে আছেন হাইকোর্টের এক জজ, খবরের কাগজের একজন সম্পাদক, আর হরিশঙ্কর।
”আয় রাজু, আয়।”
হরিশঙ্কর উৎফুল্লভাবে সোফায় তাঁর পাশের খালি জায়গাটা চাপড়ে বললেন। ঘরের সবাই গৌরবর্ণ দশাসই চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি হরিশঙ্করের পাশে গিয়ে বসলেন।
”একটা তো সেরে এলি, আবার এখানেও খাবি?”
”ভগবান একটা পেট দিয়েছেন, সেটার সেবা করতে হবে তো!”
”ভগবান সবাইকেই পেট দিয়েছেন, কিন্তু তাই বলে….”
এইভাবে দেখামাত্র দুজনে তর্ক বাধিয়ে যখন কথার পিঠে কথা চাপাতে লাগলেন, তখন দুলু কলাবতীকে পৌঁছে দিয়েছে কনের ঘরে। সাজগোজ করা মেয়েদের ভিড়ের মধ্যে ঘরের এককোণে বড়দিকে দেখে কলাবতী তো স্তম্ভিত। হেডমিস্ট্রেস মলয়া মুখার্জি যে এত সুন্দরী, সে এতদিন বুঝতে পারেনি।
বড়দির হাতছানিতে সে ভিড় কাটিয়ে পাশে গিয়ে বসল।
”কী দারুণ আপনাকে দেখাচ্ছে না!”
মলয়া বিব্রত এবং রক্তিম মুখ সামলাতে সামলাতে বলল, ”আচ্ছা আচ্ছা, তোমাকেও তো সুন্দর দেখাচ্ছে….কখন এলে, সবাই এসেছ?”
”এইমাত্র, দাদু আর আমি এসেছি।”
”শুধু দুজনে!”
কলাবতীর মনে হল, বড়দির মুখটা পলকের জন্য যেন হতাশ ম্লান দেখাল।
”কাকা চেম্বারের কাজ শেষ করেই আসবে, হয়তো ইতিমধ্যে এসেও গেছে।”
তার মনে হল, বড়দির মুখ এবার আগের থেকেও ঝকঝকে হয়ে উঠল।
”ওহ, তোমার কাকাও আসবে বুঝি?”
”তাই তো কথা আছে।”
ওরা দুজন যখন ঘরের মধ্যের প্রভূত সোনা, বেনারসি ও সুগন্ধী নির্যাসে ডুবে গিয়ে গলা নামিয়ে কথা বলছে তখন গোপী ঘোষের আমদরবারে রাজশেখর আর হরিশঙ্করের দিকে সারা ঘরের চোখ আর কান তটস্থ হয়ে নিবদ্ধ।
”খাওয়ার তুই কী বুঝিস? কচুরি আর রাধাবল্লভীর তফাত জানিস? মুলো—ছেঁচকি আর থোড়—ছেঁচকি খেতে দিলে বলতে পারবি কোনটে কী? ছানাবড়া আর কালোজামের কথা তো ছেড়েই দিলাম।”
রাজশেখর মিটমিটিয়ে হাসছিলেন আর শুনছিলেন। বললেন, ”সব জিনিস কি আর সবাই জানে, আইনের ব্যাপারে জজসাহেব যতটা জানবেন, কাকে খবর বলে সেই সম্পর্কে সম্পাদকমশাই যতটা জানেন, তুই—আমি কি ততটা জানব? ক্রিকেটের আমি কিছুই জানি না, তবু যতটা জানি, তুই তো তাও জানিস না। হ্যাঁ, রান্নার তুই কিছু—কিছু বুঝিস এটা আমি মানব, কিন্তু রান্না আর খাওয়া তো দুটো আলাদা ব্যাপার, একেবারেই এক জিনিস নয়। রেঁধে পাতে সাজিয়ে দেওয়া পর্যন্ত একটা পর্ব। তারপর শুরু হয় বাকি পর্ব। এই শেষেরটা সম্পর্কে তোর থেকে আমি ভালোই জানি। কচুরি—রাধাবল্লভীর মধ্যে তফাত জানতে একবার করে কামড় দিলেই তো জানা যাবে, সেজন্য কি গবেষণার দরকার হয়? রসগোল্লা আর রাজভোগের মতোই একটা হুক আর একটা পুলের মধ্যে তফাত বুঝতে কি মাথার চুল ছিঁড়তে হবে? চোখ থাকলেই বোঝা যায়।”
