”বলরাম, প্র্যাকটিস পিচ ইজ দ্য মোস্ট ভাইটাল থিং ইন দ্য মেকিং অফ এ ক্রিকেটার। এখান থেকেই ব্যাটসম্যান গড়ে ওঠে, পিচের বাউন্স যদি অসমান হয়, পিচে যদি একটা সর্ষেদানার মতোও কাঁকর থাকে…” রাজশেখর একটা অ্যাম্বাসাডারকে ফটক দিয়ে ঢুকতে দেখে কথা বন্ধ করলেন।
একটু পরেই মুরারি এসে গোপীনাথ ঘোষের আগমন বার্তা জানাল।
”বসিয়েছিস?…শরবত দে।”
মিনিট পাঁচেক বাদে রাজশেখর বৈঠকখানায় এলেন। গোপী ঘোষ আর দুলুর হাতে কাঁচা আমের শরবতের গ্লাস। সত্যশেখর কথা বলছে ওদের সঙ্গে।
”আরে গোপীবাবু যে, কী সৌভাগ্য আমার…বসুন বসুন…বোসো খোকা। তারপর?”
”আমার বড়মেয়ের বিয়ে এই সামনের আঠাশে, অনুগ্রহ করে আপনাকে পায়ের ধুলো দিতে হবে।” গোপী ঘোষ জোড়হাতে নিবেদন করলেন।
”কিন্তু বিয়েবাড়ি যাওয়া তো আমি অনেকদিনই বন্ধ করেছি।”
”বাবা, সেই কথাই তো আমি ওঁকে বলছিলাম যে, গত পঁচিশ বছর আপনি কোনো বিয়েবাড়িতে যাননি।”
”তা না যান, আমার মেয়ের বিয়েতে কিন্তু যেতেই হবে। এই তো একটু আগে হরিশঙ্করবাবুও বললেন তিনি কোথাও যান না। সবাই যদি না যান বলেন…মতি, নন্তু, পরমেশ ওইদিনই ওদের নেমন্তন্ন আত্মীয়বাড়িতে, কেউই আসতে পারছে না, হরিশঙ্করবাবুও…”
”কে? হরিশঙ্কর…হরি?”
”আজ্ঞে হ্যাঁ, বকদিঘির।”
”কতদিন যায় না বলেছে?”
”তা জিজ্ঞেস করিনি।”
”করে আসুন। খাওয়ার নেমন্তন্ন পেলে ওই পেটুকটা যাবে না আবার? বুঝলি সতু…”
এই সময় কলাবতী বৈঠকখানার পাশ দিয়ে বাড়ির ভিতরে যাচ্ছিল। দুলুকে দেখতে পেয়ে সে থমকে দাঁড়াল। তারপর ঘরে ঢুকে ”হাই” বলে সে কাকার পাশে বসল।
”সেই ম্যাচের পর এই প্রথম দেখা…সেদিন আমরা চলে আসার পরেই নাকি মাঠে খুব ঝঞ্ঝাট হয়েছিল?” কলাবতী জিজ্ঞাসা করল দুলুকে।
”ঝঞ্ঝাট তো বাধালে তুমিই। এমন প্যাঁচে ফেললে যে আমায় ম্যালেরিয়ার রুগি সেজে কাঁপতে হল সারাক্ষণ বকদিঘির লোকেদের দেখিয়ে। তার উপর লাঞ্চটাও খেতে পেলাম না। তিনদিন গায়ে ব্যথা ছিল শরীর কাঁপাতে গিয়ে।”
”সরি, ভেরি সরি। কিন্তু ড্রেসিংরুমে যে বেঞ্চে তুমি শুয়ে ছিলে তার তলায় একটা রসগোল্লার হাঁড়ি লাঞ্চের পর চুপিচুপি রেখে এলাম যে? তাতে তো গোটা পনেরো অন্তত ছিল।”
”মাত্র পনেরোটায় কিছু হয়?”
”কারেক্ট, ঠিক বলেছ ওইটুকু টুকু পিং পং বল সাইজের রসগোল্লায় কী হয়? সাইজ হবে এইরকম ডিউজ বলের মতো।” প্রবল উৎসাহে সত্যশেখর ডান হাতের তালু দিয়ে আকারটা বোঝাল। ”তাহলে ওভারবাউন্ডারি হাঁকিয়ে সুখ আছে। হাফভলিতে আঙুলে তুলবে আর টকাস করে মুখে ফেলবে।”
বিরাট হাঁ করে সত্যশেখর কাল্পনিক রসগোল্লাটা মুখের মধ্যে ফেলতে গিয়ে চোখাচোখি হল রাজশেখরের সঙ্গে। হাতটা ধীরে—ধীরে নেমে এল আর গলা দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদের মতো বেরিয়ে এল, ”রসগোল্লা কিন্তু আমার একদমই ভালো লাগে না।”
”সিংগিমশাই, তাহলে আপনি কিন্তু আসছেন।”
”হরি শেষ পর্যন্ত কী বলল, আসবে?”
”জিজ্ঞেস করলেন কী কী আইটেম হবে। শুনে উনি সাজেস্ট করলেন ফুলকপির রোস্ট আর পেস্তার বরফি। কিন্তু আসবেন কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চয়তা দিতে পারলেন না। ওইদিনই আবার ওনার বন্ধুর নাতনির বিয়ে। সেখানে ওঁকে যেতে হবেই।”
”হরি আসবে। বছর চল্লিশ আগে জানি একরাতে তিন জায়গায় বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়েছিল। বাজি ধরে বলতে পারি, হরি আপনার মেয়ের বিয়েতে খেতে আসবে।”
”তাহলে আপনি…”
”হরি আইটেম সাজেস্ট করবে আর আমি তাই খেতে যাব?”
”না না সে কী কথা!” গোপী ঘোষ জিভ কেটে শিউরে উঠলেন। ”আমি আটঘরার লোক, আমি কেন বকদিঘির সাজেশান মানতে যাব। তবে বকদিঘি তো আমার কনস্টিটিউয়েন্সির মধ্যেই তাই ভাবছি ফুলকপি রেখে রোস্ট বাদ দেব আর পেস্তা বাদ দিয়ে বরফি রাখব। ফুলকপির বরফি করা যায় কি না এ সম্বন্ধে হালুইকরের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ভাবছি নতুন একটা খাদ্য তৈরি করব।”
”আমি যাব কি না সে সম্পর্কে হরি কিছু বলল?”
”আবার সেই ছেঁদো কথা। বললেন, আটঘরা জোচ্চচুরি করে ম্যাচ জিতেছে। একজনের বদলে এমন একজন খেলেছে, টিমের লিস্টেই যার নাম নেই। পতু মুখুজ্যে নাকি কোর্টে যাবে।”
”প্রমাণ আছে?”
”ছবি তোলা আছে।”
”সে—ছবি দেখেছি। কালুর নাকটা ছাড়া আপনার ছেলের সঙ্গে ওর কোনো অমিল নেই।” রাজশেখর কলাবতীর মুখের দিকে চোখ সরু করে তাকালেন। কলাবতী নিজের নাক দু আঙুলে ধরে দুলুর পাশে গিয়ে বসল।
”আমারটা কি খুব লম্বা?”
সত্যশেখর নানান দিক থেকে দুজনের নাক পরীক্ষা করে মাথা নেড়ে বলল, ”প্রমাণ করা শক্ত।”
গোপী ঘোষ বললেন, ”আগে কোর্টে যাক তো, তারপর দেখা যাবে…তাহলে আপনারা, সতুবাবু কলাবতী সবাই আসছেন। …না না, কোনো আপত্তি শুনব না, আঠাশে বুধবার…আইটেমে রাজভোগ আছে, তবে ওটাকে ডিউজ বল সাইজের করতে বোধহয় অসুবিধে হবে না, হালুইকরের সঙ্গে একবার কথা বলব…আর ফুলকপির বরফিটা যদি করা যায়, একটা নতুন আবিষ্কার হবে…আটঘরার টুপিতে আর একটা নীল ফিতে!”
কলাবতী গাড়ি পর্যন্ত এল ওদের সঙ্গে। দুলুকে সে জিজ্ঞাসা করল, ”পরীক্ষা তো হয়ে গেল এখন কী করছ?”
”ম্যাজিক শিখছি।”
”ম্যাঅ্যাঅ্যা…জিক। দারুণ, কার কাছে, কোথায় শিখছ?”
”পাড়াতেই একজন বুড়ো লোক আছেন, অনেক রকমের ম্যাজিক জানেন।”
