”মোটেই আমার খিদে মরেনি।” সত্যশেখর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দই আর কড়াপাকের দিকে সেইভাবে তাকাল, বাউন্সার—হুক—করা ব্যাটসম্যানের প্রতি ফাস্ট বোলার যে—ভাবে তাকায়।
”আসলে স্বাস্থ্যকর, পুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে খেয়ে আমার এখন অন্য কিছু বিশেষত ভাজাভুজি, ঝালঝোল, মশলা দেওয়া কিছু আর মুখে তুলতে ইচ্ছে করে না। বাঙালিরা এই সব খায় বলেই তো যত রাজ্যের পেটের রোগে ভোগে, অকালে বুড়িয়ে যায় আর অল্পবয়সে মারা যায়, তাই না বাবা?”
”তার থেকে বড় কথা, সতু”, রাজশেখর এক কেজি ভাঁড় থেকে এক চামচ দই তুলে প্লেটে রাখতে রাখতে বললেন, ”খারাপ স্টমাক নিয়ে পরিশ্রম, চিন্তা, কল্পনা কোনোকিছুই করা যায় না, তাই তো বাঙালি ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে।”
রাজশেখর দইয়ের প্লেট নাতনির দিকে এগিয়ে দিলেন। সত্যশেখরের মুখ কুঁকড়ে গেল। জিভ দিয়ে গত আধঘণ্টায় ষোড়শতম ঠোঁট চাটা শেষ করে সে কাতর চোখে ভাইঝির দিকে চেয়ে রইল।
”খাওয়া মরে গেছে বললে ভুল হবে, সুষম খাদ্য মানে ব্যালান্সড ডায়েটের জন্য খিদেটাও ব্যালান্সড মানে পরিমিত হয়ে গেছে। বাবা, কালুর খিদেটা অপরিমিত হল কেন বলো তো?”
”হুমম সেটাই তো বোঝার চেষ্টা করছি। এবার বোধহয় ওর কালমেঘের ডোজটা বাড়াতে হবে, সেইসঙ্গে এককাপ করে আনারস—পাতার রসের সঙ্গে তুলসীপাতার রস, দুবেলা। বাগানের যেদিকটায় কালুর জন্য প্র্যাকটিস পিচ করব ভাবছি, তার পিছনে দেয়াল ঘেঁষে আনারস আর তুলসী গাছ লাগাব।”
”দাদু, খিদে হওয়াটা তো হেলথেরই লক্ষণ, পাকযন্ত্র যে দারুণ ফর্মে আছে, সেটাই তো প্রমাণ করছে পারফরম্যান্স দিয়ে। কোথায় তুমি প্রশংসা করবে, তা না, ডোজ বাড়াবার কথা বলছ!”
কলাবতী রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়ে খাবলা দিয়ে দই তুলে মুখে ভরল।
”একগাদা খাওয়াকে পারফরম্যান্স বলে না।” রাজশেখর ন্যাপকিনে গোঁফের দই মুছলেন। সন্দেশের প্লেটটা ছেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ”গাওস্কর গাদাগাদা রান করেছে, কিন্তু সেভেন্টি ফাইভে মাদ্রাজে বিশ্বনাথের নট আউট নাইন্টিসেভেন অন এ ফায়ারি পিচ এগেনস্ট এ ডেডলি অ্যান্ডি রবার্টস, একেই বলে পারফরম্যান্স। এই এখন, সতু যেভাবে বেছে বেছে খাবার চুজ করল, পিক করল, এ তো বিশ্বনাথের ইনিংস। কী বিস্ময়ের সঙ্গে, ক্যাজুয়ালি অথচ কত প্রচণ্ডভাবে তন্দুরি চিকেনের শুধু পিছনের একটা ঠ্যাং ছিঁড়ে নিয়ে পরিচ্ছন্নভাবে খেল, যেন পারফেক্ট একটা বিশ্বনাথ—ফ্লিক টুয়ার্ডস মিড উইকেট। অফ স্টাম্পের ওপর আউটসুইঙ্গারটা নিখুঁত হিসেব কষে ছেড়ে দেওয়ার স্টাইলে রেজালার ঝোলটা কেমন ছেড়ে দিল। তপসে ভাজাটাকে তো লাস্ট মোমেন্ট পর্যন্ত দেখে নিয়ে ডেড ব্যাটে নামিয়ে দিল। নকুড়ের কড়াপাক মানে র্যাঙ্ক লংহপ। দ্যাখো কী এলিগ্যান্টলি পরপর দুটোকে ডেসপ্যাচ করল পয়েন্ট বাউন্ডারিতে।”
রাজশেখর যতক্ষণ ধরে তাকে পারফরম্যান্স বোঝাচ্ছিলেন, কলাবতী তার মধ্যেই গোটা ছয়েক সন্দেশ শেষ করে ফেলল, সত্যশেখরের লোলুপ চাহনি অগ্রাহ্য করে।
”সত্যি দাদু, কাকার স্টাইল, এলিগ্যান্স, ক্যাজুয়াল অ্যাপ্রোচ, এ সব কিছুরই তুলনা একমাত্র বিশ্বনাথ। আমি কিন্তু গাওস্করপন্থী। ভালো ব্যাটিং উইকেট পেলে গপাগপ রান তুলব।” চেয়ার থেকে উঠে হাত ধোবার জন্য বেসিনের দিকে যেতে—যেতে কলাবতী আর একটু যোগ করল, ”কিন্তু খিদে হওয়াটা যে হেলথেরই লক্ষণ এটাকে তোমার অস্বীকার করা উচিত হবে না।”
তখন রাজশেখর মুখ ফিরিয়ে দেখলেন তাঁর ছেলে তাকিয়ে আছে টেবলে ছড়ানো খালি পাত্রগুলোর দিকে। তার চাহনি ছলছলে, জিভটা ঠোঁটের উপর তুলির মতো বোলাচ্ছে, একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস আটকে থাকায় মুখটা লাল।
”তোর এমন বিচক্ষণতা আগে কখনও দেখিনি সতু, কিপ আপ বয়, কিপ আপ।”
হাফভলিতে রসগোল্লা তুলবে আর মুখে ফেলবে
গোপীনাথ ঘোষের বড় মেয়ের বিয়ে। আটঘরা, বকদিঘির বহু লোককেই তিনি নিমন্ত্রণ করতে ইচ্ছুক, বিশেষত বাৎসরিক ক্রিকেট ম্যাচের খেলোয়াড় এবং আয়োজকদের। এই ম্যাচ উপলক্ষেই তো তাঁর আম্পায়ারিং সিদ্ধান্ত হৈচৈ ফেলে তাঁকে বিখ্যাত করে দিয়েছে। সুতরাং সবাইকে একসঙ্গে জড়ো করে আপ্যায়িত করার এই সুযোগটা তিনি হাতছাড়া করতে চান না।
রবিবারের সকালে তিনি এবং পুত্র দুলু, হাতে একগোছা নিমন্ত্রণপত্র আর ঠিকানা লেখা একটা ফর্দ নিয়ে গাড়িতে চেপে বেরিয়েছেন। একদিনেই সব সেরে ফেলবেন তাই প্রথমেই গাড়ির ট্যাঙ্ক পেট্রলে ভরে নিলেন। তাঁর হিসেব ছিল প্রতিটির জন্য আট মিনিট সময় দিয়ে একদিনে গড়ে পঁচাত্তরটি হিসেবে দুশো পঁচিশজনকে নিমন্ত্রণ তিনদিনে সারবেন। তারপর গাড়ি নিয়ে বেরোবেন দুলুর মা আত্মীয়স্বজনদের নিমন্ত্রণ করতে।
গোপী ঘোষ তেত্রিশতমটি পর্যন্ত গড় ঠিক রেখে বকদিঘির হরিশঙ্কর মুখুজ্যের কাছে গিয়ে স্টাম্পড হলেন। সেখানে আধঘণ্টারও বেশি সময় দিয়ে সোজা এলেন আটঘরার জমিদারবাড়িতে।
রাজশেখর তখন বাগানে বকুলগাছ তলায় টুলে বসে প্র্যাকটিস পিচ তৈরি করার তদারকিতে ব্যস্ত। দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা ১০×৬ ফুট জমি মুরারি কোদাল দিয়ে সকালেই কুপিয়েছে। এখন বলরাম কোপানো জমি থেকে অবাঞ্ছিত বস্তু বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত। রাজশেখরের তীক্ষ্ন নজর এই কাজের উপর। একটু দূরে দু’বালতি গোবর পড়ে রয়েছে।
