”ভোরবেলাতেই কৃষ্ণপুরে গেছলুম, বিপ্লব তখন দাঁত মাজছে। বলল অ্যাঙ্কেলে চোট। ভাল করে পা ফেলতে পারছে না, হেঁটে দেখালও। একটু বেশি খোঁড়াল মনে হল।”
সুশি এবার ঘন্টুর গলা পেল, ”চোট না আর কিছু। ও একজনকে কাল বলেছে হাজার টাকা হাতে দিলে পায়ে বল ছোঁবে। খেলে তো কলকাতার সেকেন্ড ডিভিশনে।”
এবার ভূদেবের গলা, ”আমার এলাকার ছেলে আমাদেরই টুর্নামেন্টে খেলার জন্য কিনা টাকা চায়?”
ব্যাংকাকার গলা, ”শেতলের মা’র ছাগলটাকে কাল নামাব, তবু ওকে নয়।”
ঘন্টুর গলা, ”সরাটা থাকলে আর ভাবনা ছিল না, কিন্তু কাল সন্ধে থেকে কোথায় যে গেল!”
ভূদেবের গলা, ”স্থানীয় ছেলে, টাকাপয়সাও চাইত না। ব্যাংয়ের কোনও আপত্তিও হত না। সরা খেললে সেমিফাইনাল কেন, ফাইনালও জিতে নোব। ওহহ বেঁচে থাকতে থাকতে বংশীবদনকে ঘরে তোলা—!”
এই সময় সুশি দরজায় উঁকি দিয়ে বলল, ”কাকা একবার বাইরে শুনে যাও।”
ব্যাংকাকা একটু অবাক হয়ে বেরিয়ে এলেন, ”কী বলবি, তাড়াতাড়ি বল। এখন জরুরি মিটিং হচ্ছে।”
”আমিও একটা জরুরি কথা বলব। যাকে চাইছ তাকে বন্দি করে রেখেছি আমরা।”
”কাকে?”
”শ্রীমান সরাকে?”
”অ্যাঁ! কোথায়”
”পাতালঘরে।”
ব্যাংকাকা মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলেন, দরজার পাশে রাখা সাইকেলটা ধরে সামলে নিয়ে বললেন, ”ওখানে তো ভূত আছে!”
”ঘোড়ার ডিম আছে। সরা ওখানে কাল সন্ধে থেকে ধরা দেখছে। ওর জন্যই তো এই পাউরুটি কিনে নিয়ে যাচ্ছি।”
সুশি এর পর সংক্ষেপে দ্রুত বলে গেল কলাবতী কী ভাবে সরাকে আবিষ্কার করল, মোটরবাইক চড়া তিনজন বাড়িতে ঢুকে কীভাবে সরাকে খুঁজে গেছে। ওদের ভয়েই যে পাতালঘর থেকে সে বেরোতে চাইছে না, তাও বলল। ”তোমরা তো ওকে বার করে এনে খেলাতে পারো, যদি ওর ভয় ভাঙাতে পারো।”
আর কথা না বলে ব্যাংকাকা ছুটে ক্লাবঘরে ঢুকলেন।
”পাওয়া গেছে, সরাকে পাওয়া গেছে। এখন সে পাতালঘরে বসে ধরা দেখছে।” ব্যাংকাকার উত্তেজিত গলা সুশি শুনতে পেল।
তারপর ভূদেবের গলা, ”বলো কী? ওখানে তো ভূতের বাসা!”
ব্যাংকাকা বললেন, ”সেটা দেখে এলেই তো সব বোঝা যাবে। চলো তো সবাই।”
সুশি আর দাঁড়াল না। পড়িমড়ি ছুটতে শুরু করল বাড়ির দিকে। কলাবতী তখন নৌকোয় দাঁড় বেয়ে দিঘির মাঝামাঝি। সেখানে নৌকোটা রেখে চারদিকের গাছপালা, বাড়ি দেখছিল আর টেপ রেকর্ডার চালিয়ে শুনছিল লতা মঙ্গেশকর। ঘাট থেকে হাতছানি দিয়েই সুশির ”কালু, কালু” চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি দাঁড় বাইতে শুরু করল। ঘাটে নৌকো লাগাতেই সুশি শ্বাসবন্ধ স্বরে বলল, ”সব বলে দিয়েছি। কাকা ক্লাবের লোকদের নিয়ে এখানে আসছেন। ওঁদের একজন প্লেয়ার দরকার। বোধ হয় সরাকে খেলায় নামাতে চায়।”
”বলে দিলি?”
”দিলুম। এভাবে গর্তে লুকিয়ে কতদিন থাকবে? তার থেকে বেরিয়ে পড়ুক। কাল খেলা দেখতে এই অঞ্চলের হাজার—হাজার লোক আসবে। তাদের সামনে ওই চারটে লোক কী করবে?”
”ঠিক, ঠিক বলেছিস। যদি ম্যাচটা জিততে পারে তা হলে বোলতার লোকেরাই ওকে প্রোটেকশন দেবে।”
কয়েকজন লোকের কথাবার্তার আওয়াজ শোনা যেতেই ওরা দু’জনে এগিয়ে গেল। সাইকেল হাতে ব্যাংকাকা, তাঁর পেছনে ভূদেব খেটো, ঘন্টু সহ আরও তিন—চারজন।
”সুশি, পাতালঘরটা কোথায়?” ব্যাংকাকা ব্যস্তভাবে জানতে চাইলেন। ভূদেবের উদ্বিগ্ন এবং ভীত চোখে একই প্রশ্ন।
কলাবতী বলল, ”শিবমন্দিরের ঠিক পেছনে। আসুন দেখিয়ে দিচ্ছি।”
ভূদেব বললেন, ”তোমরা যাও, আমি এখানে থাকছি।”
ব্যাংকাকা বললেন, ”সে কী ভূদেবদা! আপনি যে বললেন নিজের চক্ষে দেখবেন পাতালঘরে মানুষ রয়েছে কি না! চলুন, চলুন।”
ব্যাংকাকা হাত ধরলেন ভূদেবের। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে তিনি পেছনে হটে গেলেন। ”তোমরা যাও না! আমার হার্টের ব্যামো আছে জানোই তো। আগে দ্যাখো, সরার ছদ্মবেশে কোনও ভূত কি না!”
ঘন্টু বলল, ”সেই ভাল, আপনি এখানে থাকুন, আমরা যাচ্ছি। তরুণ, খোকন আয় রে, চলুন ব্যাংজ্যাঠা।”
কলাবতী আর সুশির পিছু নিয়ে ওরা শিবমন্দিরের কাছাকাছি আসতেই ছেলেরা দাঁড়িয়ে পড়ল। ওরা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই ঘন্টু ইতস্তত করে বলল, ”ব্যাংজ্যাঠা দেখলেই হবে, আমরা বরং এখানেই থাকি।”
কলাবতী আর সুশি মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ব্যাংকাকা বিরক্ত স্বরে বললেন, ”তাই থাক। দুটো মেয়ে সঙ্গে যাচ্ছে, তবু তোদের ভূতের ভয় কাটল না। সুশি দেখা তো কোথায় পাতালঘরটা।”
চাতালের গর্তটার কাছাকাছি এসে কলাবতী বলল, ”ওই যে। আপনি দাঁড়ান।” এই বলে সে এগিয়ে গিয়ে দরজাভাঙা গর্তর পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। হারিকেন জ্বলছে না।
”সরা, সরা।”
”হারিকেনে তেল আর নেই।” পাতালঘর থেকে কথাগুলো উঠে এল।
”এবার তুমি উঠে এসো। তোমায় দেখতে কয়েকজন এসেছে।”
”সব্বোনাশ! না, না, আমি বেরোব না।”
”ভয় নেই, ওরা শ্যামপুকুরের লোক নয়, এখানকারই লোক। তোমাকে ওদের কী যেন দরকার। সুশির ব্যাংকাকা তোমার সঙ্গে কথা বললেন। তোমার বন্ধু ঘন্টুও এসেছে।”
”ঘন্টুকে ডেকে আনো।”
”সে ভয়ে আসছে না, ওই দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তুমি চেঁচিয়ে ডাকো তো।”
”ঘোওওন…টুউউউ।” সরার চিৎকারটা গর্ত দিয়ে উঠে এল বিদঘুটে আওয়াজে অনেকটা স্টিমারের ভোঁওও—এর মতো। তাই শুনেই ঘন্টু আর তার সঙ্গীরা কয়েক পা পিছিয়ে গেল। সরা আরও দু’বার ভোঁ দিল। কিন্তু কলাবতীকে দাঁড়িয়ে থাকতে আর সুশি ও ব্যাংজ্যাঠাকে এগিয়ে যেতে দেখে ওরা একটু সাহস পেল।
