সুশি ফিরে এল। হাতে দুটো পিঁড়ি, দুটো ছিপ আর খালুইয়ে সাত—আটটা নামারকমের মাছ।
”এগুলো শেতলের মাকে দিয়ে আসি।”
”তার আগে সরার জন্য কী করা যায় সেটা ভেবে ঠিক কর। কুঁজোটা দিয়ে আসি, হারিকেনটাও। ধান রাখার বস্তা নিশ্চয় আছে। খাবার কী দেওয়া যায়? তার আগে শেতলের মাকে রান্নাঘরে ব্যস্ত রাখতে হবে, এদিকে যেন না আসে। সকালে যে লুচি বেগুনভাজা খেলুম তার কিছু পড়েটড়ে আছে কিনা দ্যাখ।”
সুশি রান্নাঘরের দিকে চলে যাওয়ার পর কলাবতী ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ছুটে দোতলা থেকে হারিকেন আর জলভরা কুঁজো নামিয়ে আনল। একতলায় একটা ঘরে সারি দিয়ে থাক থাক বস্তাভর্তি ধান। খুঁজেপেতে দুটো ছেঁড়া চটের বস্তা বার করল, সেইসঙ্গে একটুকরো ত্রিপল। আপাতত এটুকু উপকারই করা যাক।
জিনিসগুলো নিয়ে গর্তের কাছে গিয়ে কলাবতী সরাকে ডাকল।
”কুঁজো আর হারিকেনটা তো বেল নয় যে ফেলে দেওয়া যাবে। এই বস্তায় ভরে একে একে ঝুলিয়ে দিচ্ছি ধরে নাও। হাত তুলে পাবে তো? তোমার হাইট কত?”
”পাঁচ—দশ। পেয়ে যাব বস্তা।”
প্রথম কুঁজো নামল। সেটা পাওয়ামাত্র সরা অর্ধেক খালি করে দিয়ে বলল, ”বাঁচলুম।”
”মোটেই বাঁচোনি। ওরা আমাদের বাড়ি ঢুকে তন্নতন্ন সার্চ করে গেছে। এখন তোমার খোঁজে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলেছে, পেলে তোমার হাঁটুতে গুলি করবে।…বস্তাটা ছুড়ে দাও হারিকেন আর দেশলাই নামাব।”
”হাঁটুতে গুলি? তা হলে তো খোঁড়া হয়ে যাব!”
”যাও না, তাতে লোকসান তো হবে না। তুমি তো ফুটবলার হতে চাও না, টাকা কামাতে চাও। চার—পাঁচ লাখ টাকা তো হাতিয়ে নিয়েছই, তা হলে আর প্লেয়ার হওয়ার দরকার কী?” স্বাভাবিক স্বরে কলাবতী বলল।
”তুমি ঠাট্টা করছ। জানো এটা খুব সিরিয়াস ব্যাপার, হাঁটুতে গুলি খেলে কী হতে পারে সেটা তুমি বুঝছ না।”
”তুমি বোধ হয় এবার একটু একটু করে বুঝতে পারছ সেই প্রবাদটা ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’। যাকগে, বস্তাটা ছোড়ো।”
বস্তাটা ছুড়ে দিয়ে সরা ঢোক গিলে বলল, ”আমার মৃত্যুর কথা শুনলে ভয় করে।”
কলাবতী জবাব দিল না। হারিকেনটা বস্তায় ভরে নামিয়ে দিয়ে বলল, ”দেশলাই রয়েছে ওটা এবার জ্বালো আর এই তেরপলটাও নাও।”
একটু পরেই দেশলাই আর হারিকেনের আলো জ্বলে উঠল। কলাবতী দেখল, কালো ট্রাউজার্স পরা খালি পায়ে একটি বছর কুড়ি—একুশের ছেলে। ভাল স্বাস্থ্য, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, গায়ের রং শ্যামলা, চোখা নাক।
”খুঁজে দ্যাখো তো আমার হাতঘড়িটা পাও কি না।”
ঘড়িটা খুঁজে পেতে দেরি হল না। সরা ছুড়ে দিতেই কলাবতী লুফে নিল। ”এবার তুমি পারলে ঘুমিয়ে নাও। খাওয়ার জোগাড় কী ভাবে করব জানি না, চেষ্টা করব।”
”আমার এখন আর খিদে পাচ্ছে না। ওরা কি সারাদিন বোলতায় থাকবে? তুমি কি একটু খোঁজ নিয়ে বলবে ওদের অ্যাডভান্সের টাকাটা বাবা ফিরিয়ে দিয়েছে কিনা।” সরার গলা দিয়ে কাতর মিনতি ঝরে পড়ল।
”পারলে খোঁজ নোব।” কলাবতী চলে যেতে গিয়ে আবার ফিরে এল। ”টোকেন হারিয়েছে বলে মিথ্যে ডায়েরি করেছ। ওটা তোমার কাছেই আছে।”
”হ্যাঁ। সবসময় ওটা পকেটে থাকে। এই দ্যাখো।” ট্রাউজার্সের হিপপকেট থেকে সরা টোকেন বার করে দেখাল।
হারিকেনের অল্প আলোয় কলাবতী একটা কালো চাকতি দেখে বলল, ”ওটা দেখতে পাচ্ছি না, ছুড়ে দাও তো।”
”না, না, এটা হাতছাড়া করব না।”
”আরে, তুমি তো ডায়েরি করেছ। আই এফ এ থেকে নতুন টোকেন তো পেয়ে যাবে।”
”কিন্তু আমি যে খবরের কাগজে বলে ফেলেছি জোর করে মিথ্যে ডায়েরি আমাকে দিয়ে করানো হয়েছে।”
”তা হলে টোকনটা আমায় দেখতে দেবে না? বেশ, থাকো ওখানে। শ্যামপুকুরের লোকগুলো তো আবার আসবেই, আমি আর কথা বলব না, সুশিই বলবে। আর ও খুব মরালিস্ট, সবসময় সত্যি কথা বলে। হয়তো বলে ফেলবে স্বরাজ দাস কোথায় লুকিয়ে আছে।”
”না, না, না। এই নাও টোকেন।”
একটা কালো ধাতুর চাকতি গর্ত থেকে শূন্যে লাফিয়ে উঠল। এক হাতে কলাবতী লুফে নিল। বেশ ভারী, একশো গ্রাম তো হবেই, একপিঠে টোকেন নম্বর। এমন ধ্যাবড়া ভাবে খোদাই করা যে, কলাবতী পড়তে পারল না। শুধু ‘ভ্যালিড ফ্রম ১৯৯৪’ টুকু পড়া গেল। মধ্যিখানে খোদাই করা একটা ফুটবলার বলে লাথি মারছে, তলায় ঠিকানা ১১১ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট। অপর পিঠে লেখা ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, মধ্যিখানে তারা মার্কা লোগো খোদাই করা, নীচে দুই সেক্রেটারির সই। পড়া গেল না নাম।
”আমার ক্যারামের স্ট্রাইকারটা হারিয়ে গেছে। এটা দিয়ে মনে হচ্ছে কাজ চালানো যাবে, একবার পরীক্ষা করে দেখব।”
”তার মানে তুমি ওটা নিয়ে নিচ্ছ?”
”আপাতত।” বলেই কলাবতী আর দাঁড়াল না। যেতে যেতে শুনতে পেল, ”তুমি কিন্তু কথা বলবে, সুশি নয়।”
.
সুশি পাউরুটি কিনতে গেছে বাজারে। সরাকে তা ছাড়া আর কীই—বা খেতে দেওয়া যেতে পারে! শেতলের মাকে লুকিয়ে ডাল—ভাত রান্নাঘর থেকে বার করা সোজা ব্যাপার নয়। কয়েকটা আম অবশ্য দেওয়া যেতে পারে। ফেরার পথে সে ফুটবল মাঠের ধার দিয়ে আসছিল, তখন ক্লাবঘরের জানলা দিয়ে দেখল ভেতরে কয়েকজন, তার মধ্যে ব্যাংকাকা, ভূদেব খেটো, ঘন্টুও রয়েছে।
সুশি ক্লাবঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
”কাল সেমিফাইনাল রি—প্লে আর আজ বিপ্লব বলছে কিনা খেলব না?” ভূদেব খেটো টেবিলে চাপড় মারলেন। ”ব্যাপার কী ব্যাং?”
