সুশির হাতে পাউরুটি। সে গর্তের দিকে তাকিয়ে বলল, ”তোমার নিশ্চয় খিদে পেয়েছে। পাউরুটি এনেছি, খাবে?”
”খাব। জলতেষ্টা পেয়েছে।”
ব্যাংকাকা স্তম্ভিত। এ তো সত্যি—সত্যিই মানুষের গলা। গর্তে উঁকি দিয়ে কাঁপা গলায় তিনি বললেন, ”তুমি কি ব্রাদার্স ইউনিয়নের স্বরাজ দাস?”
”এখনও পর্যন্ত আমি ব্রাদার্সের স্বরাজ দাস।”
ব্যাংকাকার চোখে মুখে স্বস্তি ফুটে উঠল। ভূতে তিনি কোনওকালেই বিশ্বাসী ছিলেন না, তবে জন্ম থেকেই সবার মধ্যে ভয় দেখতে দেখতে তাঁর মনের ওপর আবছা একটা ছায়া জমে উঠেছিল। এই মুহূর্তে সেটা কেটে গেল।
”স্বরাজ, তুমি যেমন বিপদে পড়েছ, বোলতা স্পোর্টিং ক্লাবও তেমনই বিপন্ন। কাল সেমিফাইনাল রি—প্লে বিদ্যুৎপুরের সঙ্গে। তুমি বাবা ম্যাচটা খেলে দাও।” ব্যাংকাকার স্বরে কাতরতা ফুটে উঠল।
”না, না, না, এখানে মাঠে নামব না। পাগল হয়েছেন? আমার হাঁটুর দাম কত জানেন?”
কলাবতী বিরক্ত স্বরে বলল, ”হাঁটু নিয়ে এই ভয়টা কোথায় ছিল যখন দুটো ক্লাব থেকে টাকা নিয়েছিলে? তোমাকে পনেরো মিনিট সময় দিচ্ছি ভাবার জন্য, ব্যাংকাকার অনুরোধ রাখবে কি রাখবে না সেটা ঠিক করো।”
পাতালঘর থেকে কোনও উত্তর এল না। ব্যাংকাকা হাতছানি দিয়ে ঘন্টুদের ডাকলেন। পায়ে পায়ে ওরা এগিয়ে এল।
”আরে, এত ভয় পাচ্ছিস কেন, সত্যি—সত্যিই স্বরাজ দাস রয়েছে পাতালঘরে। ভূতটুত কিসসু নেই।” ব্যাংকাকা দু’জনকে হাত ধরে টেনে আনলেন। ”ওই দ্যাখ, পাতালঘরে নামার গর্তটা। লোহার দরজাটা ঝরঝরে হয়ে গেছল, বাজ পড়ে ভেঙে গেছে। সিঁড়িটাও ভেঙে গেছে।”
ঘন্টু ভয়ে ভয়ে কাছে গিয়ে বলল, ”সরা, এই সরা।”
”ঘন্টু? আমাকে বাঁচা ভাই। এখান থেকে বেরোবার একটা ব্যবস্থা কর। আর কিছুক্ষণ থাকলে মরে সত্যি—সত্যি ভূত হয়ে যাব।”
সরারই গলা বটে! ঘন্টু নিশ্চিন্ত হল। তরুণ খোকনও এবার এগিয়ে এল। তাদের চোখমুখে বিস্ময়। ফিসফিস করে খোকন বলল, ”হ্যাঁ রে ঘন্টু, ভূতটুত তা হলে নেই? সত্যিই সরার গলা!”
কলাবতী বলল, ”বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? শুনবে ওর কথা?” তারপর সে গর্তের কাছে মুখ দিয়ে বলল, ”সরা শুনতে পাচ্ছ ভটভটির আওয়াজ?”
”কই না তো! ওরা কি এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে?”
ঘন্টু উত্তর দিল, ”সকাল থেকে ওদের দেখতে পাচ্ছি না। বোধ হয় চলে গেছে।”
”আমাদের বাড়ির খবর কী?”
”সবাই তোর জন্য খুব চিন্তায় আছে। ওরা চারবার তোদের বাড়ি ঘুরে এসেছে। তুই এখানে থেকে বেঁচে গেছিস, ওরা তোর বাবাকে বলেছে, ছেলেকে না পেলে দানা খাইয়ে দেবে। কথাটার মানে জানিস?”
”জানি, গুলি করবে। কিন্তু আমি তো টাকাটা শ্যামপুকুরকে ফেরতই দিতে চাই। তুই বাবাকে বল না ব্রাদার্সের পতিত ভটচাযের সঙ্গে দেখা করে ওকে দিয়ে শ্যামপুকুরের ব্রজদার সঙ্গে কথা বলে একটা মিটমাট করতে। তা নইলে এই অন্ধকার ঘরে না খেয়ে পচে মরতে হবে।”
”তুই নিজে গিয়ে কাকাবাবুকে বল। আমার কথা কানে তুলবেন না। দানা খাওয়ার ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন।”
কলাবতী এবার বলল, ”ঠিক আছে, আমি আর সুশি যাব তোমার বাবার কাছে। তুমি এই ম্যাচটা খেলে দাও।”
”ওরে বাবা! একটা দানা হাঁটুতে ছুড়ে দিলে তখন কী হবে?”
ব্যাংকাকা এইবার কথা বললেন, ”সরা, তোমার কোনও ভয় নেই। ভূদেবদা, তোমার সেফটির দায়িত্ব নিলে বোলতার মাটিতে কেউ তোমার কেশ স্পর্শ করতে পারবে না।”
”কেশ নয়, হাঁটু। ওদের ওটাই টার্গেট।”
”সারা বোলতায় মানুষ তোমাকে ঘিরে পাহারা দেবে দিনরাত।”
”আমাকে নয়, ওই ভটভটিওলাদের পাহারা দিক।”
”তাই দেবে, তুমি দয়া করে ম্যাচটা খেলে দাও।”
”হ্যাঁ রে ঘন্টু, এই ভূদেবদা কে?”
”এখানকার জনমত। এখানকার পঞ্চায়েত সমিতির হেড। এখানকার যাবতীয় উন্নয়ন—।”
”থাম তুই,” সরা চিৎকার করে ওকে থামিয়ে দিল, ”ডেকে আন ওঁকে।”
সবাই বাড়ির দিকে ছুটল, যেখানে ভূদেব অপেক্ষা করছেন। যাওয়ার আগে সুশি অবশ্য কাগজে—মোড়া পাউরুটিটা গর্তের মধ্যে ফেলে দিয়ে বলল, ”জল দিয়ে যাচ্ছি।”
ভূদেব উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাঝে দু’বার একটু এগিয়ে গোড়ালি তুলে গলা লম্বা লম্বা করে ওদিকে কী হচ্ছে দেখার চেষ্টা করেছেন। কিছু দেখতে না পেয়ে বুকের বাঁ দিকে হাত চেপে ধুকপুকুনি ঠিক ছন্দে হচ্ছে কি না বোঝার চেষ্টা করেছেন। জনাদাকে দেখতে পেয়ে তাকে ডেকে একগ্লাস জলও খেয়েছেন।
সবাই প্রায় দৌড়েই এল। ঘন্টুই প্রথম কথা বলল। ”জ্যাঠামশাই, পাতালঘরে সত্যি—সত্যিই সরা! আমি কথা বললুম!”
”আমিও বলেছি।” ব্যাংকাকা যোগ করলেন।
”বলেছ? ওর চেহারাটা দেখেছ?” ভূদেবের গলায় সন্দেহ।
”না। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিছু দেখা যায় না।” ঘন্টুর স্বর মিইয়ে পড়ল।
”এই তো! এই তো তোমাদের বুদ্ধি! ওরা তো শুধু ছদ্মবেশই ধরতে পারে না, গলার স্বরও নকল করতে পারে।” ভূদেব নিশ্চিত গলায় বুঝিয়ে দিলেন পাতালঘরের ভূতের সঙ্গেই ওরা কথা বলেছে।
কলাবতী বলল, ”জ্যাঠামশাই, ওকে তুলে এনে কাল যদি ম্যাচটায় খেলানো যায়, সেই ব্যবস্থা করুন না।”
”ভূত ফুটবল খেলবে, তাই কখনও হয়?”
”যদি হয়।” জোর দিয়ে কলাবতী বলল, ”শুধু দেখতে হবে ওই মোটরবাইকে চড়া লোকগুলো যেন ধরতে না পারে।”
”ধরতে অবশ্য পারবে না, তার আগে লোকগুলোকেই ধরে ফেলবে বোলতার জনগণ। কিন্তু তার আগে পাতালঘরের লোকটা সরা না ভূত সেটার ফয়সলা হওয়া দরকার।”
