”সুশিদিদি, অ সুশিদিদি।” দিঘির ঘাট থেকে শেতলের মা’র পরিত্রাহি চিৎকার শোনা গেল। ওরা দু’জন দৌড়ল ঘাটের দিকে।
”কী হয়েছে শেতলের মা?” সুশি বলল।
”তিনটে লোক এসে কাকে যেন খুঁজছে। কী হম্বিতম্বি, যেন পুলিশ! কাকাবাবু বাড়ি নেই, তুমি এসে দ্যাকো।”
ওরা ছুটে গেল বাড়ির ভেতর। সদরঘরের বাইরের রকে তিনটি লোক। তাদের মধ্যে একজনকে ওরা চিনল। গতকাল মাঠে এসে লোকটা সরার বাড়ি কোথায় জানতে চেয়েছিল। অন্য দু’জন বসে ছিল মোটরবাইকে। দেখতে শান্তশিষ্ট, ভদ্র। একজনের চোখে চশমা। অন্যজনের গলায় সোনার চেন।
চোখে চশমা বলল, ”কাল মাঠে তোমাদের দু’জনকে দেখেছি মনে হচ্ছে। তা হলে এটা তোমাদের বাড়ি?”
”হ্যাঁ।” সুশি বলল।
দু’হাত ফাঁক করে কালো শার্ট বলল, ”কাল সন্ধেবেলা সরা এ বাড়িতে ঢুকেচে আমাদের তাড়া খেয়ে। কোতায় সে, তাকে আসতে বলো।”
”কে সরা!” কলাবতী আকাশ থেকে পড়ল। তারপর যেন মনে পড়েছে এমনভাবে বলল, ”ওহহো, কাল যার কথা বলছিলেন? স্বরাজ দাস? সে কেন এ বাড়িতে থাকবে?”
”নিজের চোখে দেখেচি মাটের মদ্দে ছুটে গেল। মাট দিয়ে তো এ বাড়িতে ঢোকা যায়। ওকে বেরিয়ে আসতে বলো, নয়তো আমরাই বার করে আনব। তা হলে কিন্তু ফল ভাল হবে না।”
”ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” চোখে চশমা শান্ত স্বরে বলল, ”শ্যামপুকুর ক্লাবে খেলবে বলে সরার সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। সাড়ে তিন লাখ টাকা অ্যাডভান্স নিয়েছে কিন্তু তার আগেই ব্রাদার্সের অ্যাডভান্স নিয়েছে চার লাখ। ওদের সঙ্গেও চুক্তি পাঁচ লাখের। এবার তোমরাই বলো এটা স্রেফ চিটিং কি না? দুটো ক্লাব থেকেই টাকা খেয়ে বসে আছে।”
কলাবতী অবাক হয়ে বলল, ”কলকাতার ফুটবলে এরকম হয় নাকি? কী অদ্ভুত আশ্চর্যের কথা! একই সঙ্গে দুটো ক্লাবে কি খেলা যায়?”
”যায় না যে, সেটা তো সরা ভালই জানে,” গলায় চেন ঠোঁট বেঁকিয়ে কঠিন গলায় বলল, ”কোর্ট পেপারে সই করে অ্যাডভান্স নিয়েছে শ্যামপুকুর থেকে। অথচ ও থানায় ডায়েরি করল আমরা নাকি জোর করে ওকে সই করিয়েছি। টোকেন হারিয়ে গেছে বলেও শ্যামপুকুর নাকি ওকে দিয়ে জোর করে চিঠি লিখিয়ে নিয়েছে আই এফ এ—কে দেওয়ার জন্য। কী মিথ্যেবাদী ছেলে! সরা তো নাবালক নয় যে, জোরজবরদস্তি করে সই করানো যাবে। এ—কথা ও কাগজের রিপোর্টারকে বলেছে, কাগজে ছাপাও হয়েছে।”
কলাবতী বলল, ”তা হলে এখন আপনারা কী করবেন?”
চোখে চশমা বলল, ”টোকেন মোটেই হারায়নি। ওর কাছেই আছে, ওটা আমাদের চাই আর ব্রাদার্সের টাকা ফেরত দিয়ে শ্যামপুকুরে সই করুক। সই না করা পর্যন্ত ওকে আমাদের হেফাজতে থাকতে হবে।”
গলায় চেন বলল, ”টোকেন যে ক্লাবের হাতে থাকবে প্লেয়ারকেও সেই ক্লাবে থাকতে হবে। আমরা সরার টোকেনটা চাই। হারিয়ে যাওয়া টাওয়া একদম বাজে কথা। ওকে আমরা ছাড়ব না। এর আগে বিজন চৌধুরী আমাদের এইভাবেই চিট করতে গেছল, পারেনি অবশ্য। লালবাজারে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে অ্যাডভান্স ফেরত দেয়। নইলে অ্যারেস্ট হত।”
”এই প্লেয়ারদের, বুজলেন চিতুদা, এমন সিক্কা দেওয়া উচিত যে জীবনে ভুলবে না। স্রেফ হাঁটুতে গুলি করে দিন।”
”ওরে বাবা!” সুশি শিউরে উঠল। ”কিন্তু সরা তো আমাদের বাড়িতে নেই।”
”আমি খুঁজে দেখছি।”
কথাটা বলেই কালো শার্ট ওদের তোয়াক্কা না করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে একতলার ঘরগুলো আঁতিপাতি দেখল। তারপর রান্নাবাড়ি, গোয়ালঘর ইত্যাদি দেখে ফিরে এসে দোতলায় উঠল। সুশি আর কলাবতী এক জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারা বুঝে নিয়েছে আপত্তি জানিয়ে কোনও লাভ হবে না। তা ছাড়া সরার কীর্তির কথা শুনে তার পক্ষ নিয়ে দাঁড়াতেও আর তাদের ইচ্ছা করছে না। সারাবাড়ি ওরা দেখুক না। একটু পরেই কালো শার্ট নেমে এল।
”না চিতুদা, ছাদ পর্যন্ত দেখে এলুম। তবে একটা শিবমন্দির চোখে পড়ল, ওটা একবার দেখা দরকার।”
সুশি শিউরে উঠে চোখ বড় করে বলল, ”ওরে বাবা, ওধারে একদম মাড়াবেন না। দুশো বছর ওই মন্দিরে লোক যায় না। ভূতপ্রেত বাস করে। যে ওই মাঠে পা দিয়েছে তিনরাত্তিরও তার কাটে না, অবধারিত মরণ। আপনারা বোলতার যে—কোনও লোককে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।”
তিনজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, চোখে ফুটে উঠল সন্দেহ, ভয়। ইতস্তত করে চোখে চশমা বলল, ”ঠিক আছে, চল এবার। আশপাশটা আর একবার দেখা যাক।”
ওরা চলে যাওয়ার পর সুশি বলল, ”যত দোষই করে থাকুক সরা এখন আমাদের আশ্রয়ে রয়েছে। আমরা যতটা পারি ওকে দেখব। কাকা কোথায় যে গেছে প্লেয়ার ধরতে, কাল তো সেমিফাইনাল ম্যাচ।” তারপরই জিভ কেটে সুশি দৌড়ল দিঘির ঘাটের দিকে—”অনেক মাছ রে কালু, কাক—চিলের পেটে গেছে কিনা কে জানে।”
কলাবতী চেঁচিয়ে বলল, ”তোর তো মাছ, আমার যে ঘড়িটা গেল।”
সরা জল চেয়েছে। ভিজে মেঝেয় বসতেও পারছে না। বৃষ্টির জল নিশ্চয় ভাঙা দরজার গর্তটা দিয়ে পাতালঘরে ঢুকেছে। কলাবতী মনে মনে বলল, ‘এসব শাস্তি তো ওর প্রাপ্যই। লোকগুলোর কথা যদি সত্যি হয় তা হলে কোনওরকম সহানুভূতিই দেখানো উচিত নয়। তবে সুশি যা বলল, আশ্রিতকে দেখা উচিত।’ এর পর সে ভেবে নিল দোতলায় শোওয়ার ঘরে জলভরা একটা কুঁজো আছে। লোডশেডিং হয় তাই তেলভরা একটা হারিকেন আর দেশলাই শোওয়ার ঘরে খাটের নীচে রাখা আছে। কিছু খাবারও দরকার। বেল খেয়ে তো আর সারাটা দিন কাটানো যায় না। একটা মাদুর কি চটের বস্তা চাই মেঝেয় পাতার জন্য। মেঝেটা কেমন কে জানে। দিঘির পাড়ে ফেলে আসা পিঁড়ি দুটো দিয়ে আসা যায়।
