”কে তুমি?” একটা খসখসে ভয়ার্ত স্বর সেই অন্ধকার গর্তের মধ্যে থেকে উঠে এল।
এবার চোখ খুলে তাকাল কলাবতী, অন্ধকারের মধ্যে আবছা একটা মুখের আদল আর চিকচিক করছে দুটো চোখ। ভূতের চোখ?—”তুমি কি ভূত?”
”আমি মানুষ। কাল সন্ধে থেকে আমি এখানে।”
এইবার কলাবতী নিশ্চিন্ত হল। আর যাই হোক চোখ দুটো ভূতের নয়। কিন্তু মানুষ এই পাতালঘরে কেন?
”তুমি ঠিক বলছ ভূত নও? তা হলে তুমি কে?”
”আমি সরা, স্বরাজ দাস, ফুটবল খেলি।”
অন্ধকারের সঙ্গে এর মধ্যেই চোখ দুটো সইয়ে নিয়েছে কলাবতী। তার ভয় এখন কেটে গেছে। এখন সে কৌতূহলী। সে দেখতে পাচ্ছে একটা মুখ গর্তের মধ্যে থেকে তার দিকে তাকিয়ে।
”ভয় পেয়ো না।” কলাবতী বলামাত্র দুটো মোটরবাইকের গর্জন বাবার সড়ক দিয়ে ভটভটিয়ে উড়ে গেল।
”চারটে লোক কাল থেকে মোটরবাইকে ঘুরছে, সে কি তোমার জন্যে?”
”হ্যাঁ। বলেছে আমার হাঁটু ভেঙে দেবে, যাতে জীবনে যেন আর খেলতে না পারি। হাঁটু ভেঙে দিতে ওরা এসেছে।”
কলাবতী আর একটু ঝুঁকে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করল, ঘুটঘুটে অন্ধকার। ”তুমি উঠে আসতে পারবে না?”
”না। শিবমন্দিরে ঢোকার জন্য দৌড়ে আসছিলুম তখন এই গর্তে পড়ে গেছি। একটা সিঁড়িমতন ছিল। কিন্তু সেটা একদম ভেঙে গেছে। ভেতরটা খুব ঠাণ্ডা, শীত—শীত করছে। মেঝেটা ভিজে—ভিজে।”
”কত বড় ঘর?”
”বিরাট বড়। একটা ব্যাডমিন্টন কোর্ট হয়ে যাবে। তুমি একটা মোটা দড়ি জোগাড় করতে পারবে? তা হলে—” সরার কথা বন্ধ হয়ে গেল আবার মোটরবাইকের গর্জন ভেসে আসায়।
”আমার এখন বাইরে আসাটা ঠিক হবে না। ওরা দেখে ফেলতে পারে।”
কলাবতী বলল, ”ওদের এত ভয় পাচ্ছ কেন? কী করেছ?”
”পরে বলব। তবে ওরা আমার ফুটবল কেরিয়ার শেষ করে দিতে পারে। খুব খিদে পাচ্ছে, প্রায় তেরো—চোদ্দো ঘণ্টা এখানে রয়েছি।”
কলাবতী ভাঙা ডালে লেগে থাকা বেল দুটোর একটা মুচড়ে ছিঁড়ে আনল। গর্তটার পাশে হাঁটুগেড়ে বসে বেলসমেত হাতটা ঝুলিয়ে দিল। ”ধরো। এটা খাও।”
”আমার হাত পৌঁছচ্ছে না। তুমি ফেলে দাও আমি লুফে নোব।”
”তুমি আমায় দেখতে পাচ্ছ?”
”পাচ্ছি। তুমি একটা মেয়ে। তোমার নাম কী?”
”কলাবতী সিংহ। এখানে এসেছি আমার বন্ধু সুশিদের বাড়িতে। এবার বেলটা ধরো।”
কলাবতী আলতো করে বেলটা ছেড়ে দিল। শব্দ না হওয়ায় বুঝল লুফে নিয়েছে।
”আপাতত যতটা পারো খাও। মনে হচ্ছে বেশ মিষ্টিই হবে। দেখি খাবার ব্যবস্থা কী করা যায়।”
”আমার কথা কাউকে কিন্তু একদম বোলো না।”
”পাগল নাকি! তুমি আমার কী যে উপকার করলে ভূত না হয়ে, ভাগ্যিস তুমি মানুষ!”
”তাতে কী উপকার হল?”
”হল না?” কলাবতীর স্বরে বিরক্তি ফুটে উঠল। ”যদি ভূত হতে তা হলে এতক্ষণে তো আমার ঘাড়টা মটকে দিতে। তার থেকেও বড় কথা বোলতার লোক আরও আড়াইশো বছর বিশ্বাস করবে গড়ের মাঠে ভূতে মড়ার খুলি দিয়ে অমাবস্যার রাতে ফুটবল খেলে।”
”কালুউ, কালুউ।” দূর থেকে ভেসে এল সুশির উদ্বিগ্ন চিৎকার। ”কালু তুই কোথায়?”
”এই যে এখানে। শিগগির আয় সুশি।” কলাবতীও চেঁচিয়ে সাড়া দিল।
কয়েক সেকেন্ড পর হাঁফাতে—হাঁফাতে ছুটে আসতে দেখা গেল সুশিকে। ”জলে ডুবিসনি তা হলে।”
”ডুবলে তো বেঁচে যেতুম। দেখে যা তোদের পাতালঘরের রহস্য। এবার একটা নতুন ভূত!”
সুশি পায়ে পায়ে গর্তটার কাছে এল। জমিতে শোয়ানো চূরমার লোহার দরজাটা দেখে সে আঁতকে উঠল।
”এটা কী রে!”
”এর ওপর বাজ পড়েছিল। এটাই পাতালঘরের নামার পথ।”
”এর ভেতর ভূত আছে?”
”আছে। দেখবি?” কলাবতী গর্তের দিকে ঝুঁকে বলল, ”ওহে সরাবাবু, বেলটা খেতে কেমন লাগছে?”
গর্তের ভেতর থেকে ভেসে এল, ”বেশ মিষ্টি। একটু জল খাব।”
সুশি বিস্ময়ে কাঠের মতো হয়ে গেল। থরথর কেঁপে উঠল তার দুই হাঁটু। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। ”ক্কা…কালু, ভূত মানুষের মতো ক্ক—কথা বলে?”
”শুধু কথাই বলে না, জলও খায়!” কলাবতী গর্তের দিকে মুখ করে বলল, ”সরা, এই হচ্ছে সুশি। শিবমন্দিরটা ওদের, যে বেলটা খাচ্ছ সেটাও ওদের।”
”ধন্যবাদ সুশি। আমি কিন্তু ভূত নই। পালাতে গিয়ে এখানে পড়ে গেছি।”
কলাবতী বলল, ”ওখানে ভূত থাকার কথা, তুমি তাদের দেখতে পেয়েছ কি?”
”এখনও তো পাইনি। তবে আসল ভূতেরা এখন মোটরবাইকে চড়ে আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। একটু আলোর ব্যবস্থা করতে পারো? একটা মোমবাতি। অন্ধকার আর সহ্য করতে পারছি না।”
”একটু ধৈর্য ধরো, আমি আর সুশি যতটা পারি ব্যবস্থা করছি। ভাল কথা…তুমি কি খুব বড় ফুটবলার? বলরামের মতো?”
”বলরামের নখের যুগ্যি নই তবে এ—বছর আমার দর পাঁচ লাখ টাকায় উঠেছে। এত টাকা কুড়ি বছর বয়সে উনি একসঙ্গে চোখে দেখেছেন কিনা জানি না।”
”থাক, থাক, টাকার কথা বোলো না। ভটভট আওয়াজ শুনতে পাচ্ছ? আমাদের বাড়ির সামনে থামল।”
”ওরা আমাকে খোঁড়া করে দেবে বলেছে। কলাবতী, তুমি কি আমাকে বাঁচাবে? কাল ওরা আমাদের বাড়িতে গিয়ে পিস্তল দেখিয়ে শাসিয়েছে। বোকামি গাধামি, স্বীকার করছি লোভে পড়ে আমিই করেছি, দুটো ক্লাব থেকে অ্যাডভান্স নিয়ে নিয়েছি। আমরা গরিব তো।”
”অত কথা শোনার এখন সময় নেই। তুমি যেমন আছ তেমনই থাকো। গুডবাই।” কলাবতী হাত নাড়ল।
সুশি এতক্ষণে অনেকটা ধাতস্থ হয়েছে। সে ভাবল, ”কালু এখন কী হবে?” ”ব্যাংকাকাকে সব বলতে হবে। এখন চল, সরার খাওয়া—দাওয়ার, শোয়ার একটা ব্যবস্থা করি। বেচারার শীত করছে। আর একটা কথা, একদম জানাজানি যেন না হয়। ওই ভটভটিওলারা জানতে পারলে—।”
