”এইরকম ভাঙা শিবমন্দির বাংলার অনেক গ্রামেই পাবি। এমনকী কলকাতাতেও আছে।” সুশি বলল।
”কিন্তু তাতে কি ভূতপ্রেত বাস করে?”
”বাস করাটা নির্ভর করছে সেখানকার লোকেরা বিজ্ঞান মানে কিনা তার ওপর।”
”ফেরা যাক, কাল নৌকোয় চাপব,” কলাবতী বলল।
”আমি মাছ ধরব। কাকার ছিপ আছে অনেকরকমের। আগেরবার এসে দিঘির ঘাটে বসে পুঁটি ধরেছি, একটা চারাপোনাও উঠেছিল।”
গল্প করতে—করতে ওরা বাড়ি ফিরে এল। সেদিন ভোররাতে এক পশলা বৃষ্টি হল। কলাবতী নৌকোর বদলে বেছে নিল ছিপ। সে আর সুশি ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে গেল দিঘির ঘাটে। জনাদা জোগাড় করে দিয়েছে টোপের জন্য লাল পিঁপড়ের ডিম, শেতলের মা দিয়েছে দুটি পিঁড়ি, ভিজে জমিতে পেতে রাখার জন্য। ব্যাংকাকা বলে দিয়েছিলেন কলাবতীকে কীভাবে ফাতনাটাকে লক্ষ করতে হবে। ভেসে থাকা ফাতনাটা খাড়া হয়ে উঠলে বুঝবে মাছ টোপ গিলেছে, তারপর সেটা ডুবে গেলেই টান মারবে। কলাবতী সব শুনে ঘাড় নেড়ে জানায়, বুঝেছে।
ঘাটের একধারে দু’জনে পাশাপাশি ছিল ফেলে বসল। সাত—আট হাত তফাতে। সঙ্গে দুটো খালুই, ধরা মাছ রাখার জন্য। সুশির অভিজ্ঞতা আছে মিনিটদশেক পরেই ছিপে টান দিয়ে সে উল্লাসে চিৎকার করে উঠল, ”কালু, পেয়েছি। ফলুই।”
কলাবতী মুখ ঘুরিয়ে ইঞ্চিছয়েক লম্বা কালো রঙের মাছটার দিকে তাকিয়ে বলল, ”ওটা তুই খাবি।” তারপর সে ফাতনার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। মিনিট তিন পর সুশি আবার চিৎকার করল, ”কালু, বাটা।” কলাবতী মুখ ফিরিয়ে দেখল, কিন্তু কোনও মন্তব্য করল না। শুধু ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ফাতনাটা মনে হল একটু কাঁপল। সে উবু হয়ে বসল। ক্রিকেট ব্যাট ধরার মতো দু’হাতে ছিপটা ধরে রইল এমনভাবে, যেন বোলার এবার একটা লংহপ বল দেবেই আর সে সপাটে পুল করবে। ফাতনাটা টুকটুক করে কাঁপছে। কলাবতীর মনে হল লংহপ বলটা এসে গেল বলে, এবার পুল—সপাটে সে হ্যাঁচকা টান দিল।
সুতোর প্রান্তে বাঁধা বঁড়শিটার দিকে কলাবতী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। বঁড়শিতে গাঁথা পিঁপড়ের সাদা ডিমের টোপটা নেই। বদমাশ মাছ খেয়ে পালিয়ে গেছে।
”কালু, আবার একটা বাটা।”
”তোর পাশে বসলে আমি একটাও পাব না। চললুম ওদিকে।”
খলুই আর পিঁড়িটা তুলে কলাবতী ঝোপঝাড় পেরিয়ে পঞ্চাশ হাত দূরে একটা খেজুরগাছের পাশে গিয়ে বসার উদ্যোগ করল। মুখ ঘুরিয়ে সে পেছন দিকটা দেখে নিতে গিয়ে চোখে পড়ল শিবমন্দিরটাকে। একটা বড় বেলগাছ ডালপালা ছড়িয়ে রয়েছে মন্দিরের দিকে। ডালে ঝুলন্ত দুটো বেল তার চোখে পড়ল। চিকচিক করে উঠল তার চোখ। পেকে হলুদ হয়ে আছে আর সাইজ কী! ছোটখাটো কুমড়োর মতো। অন্তত দশ গ্লাস বেলের পানা হয়ে যাবে। সুশি মাছ ধরছে ধরুক, সে চটপট ভেবে নিল। অমন দুটো বেল পেড়ে নিয়ে সে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে। কলকাতার মেয়ে গাছেও চড়তে পারে এটা সে দেখিয়ে দেবে।
সুশি নিবিষ্ট চোখে ফাতনার দিকে তাকিয়ে। কলাবতী পা টিপে—টিপে কাদা মাড়িয়ে বেলগাছটার দিকে এগোল। গাছতলায় পৌঁছে চারদিক দেখল। তার ভাগ্য ভাল, গাছের একটা ডাল বেশ নিচুতেই পেয়ে গেল। চটিটা খুলে সে হাত তুলে দু’বার লাফিয়েই ডালটা ধরে ফেলল। একটু দোল খেয়ে মেয়ে জিমন্যাস্টরা যেভাবে আনইভন বার—এর ওপর চড়ে বসে সেইভাবে সে ডালটার ওপর উঠে গেল। তারপর এই ডাল সেই ডাল করে সে এগোতে লাগল বেল দুটোর দিকে। বৃষ্টিতে ভিজে পিছল হয়ে রয়েছে ডালগুলো। সন্তর্পণে একটু—একটু করে সে এগোচ্ছে। একটা সরু ডালে বেলদুটো। হাত বাড়াল সে। একটা বেল আঙুলে ঠেকল। ওটাকে ভাল করে ধরে মোচড় দিয়ে—দিয়ে ছিঁড়তে হবে। ডালের ওপর উপুড় হয়ে সে আর একটু এগোতেই ডালটা বিপজ্জনকভাবে নুড়ে পড়ল। কলাবতী ভয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল ডালটাকে, তাইতে সেটা আরও নুয়ে পড়ল।
কলাবতী বুঝতে পারছে সে এবার পড়ে যাবে। মট করে ডাল ভাঙার শব্দ হল, ডালটা ভেঙে ঝুলছে তাকে নিয়ে। সে টের পেল, ডালের ঘষা লেগে ব্যান্ডটা ছিঁড়ে ঘড়িটা হাত থেকে নীচে পড়ে গেল আর কয়েক সেকেন্ড পরেই সে নিজেও দুটো বেলসমেত ডালটা নিয়ে প্রায় কুড়ি ফুট নীচে পড়ল একটা নরম ঝোপের ওপর।
অন্তত তিন মিনিট সে চিত হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে মারা যায়নি, তার হাড়গোড় ভাঙেনি, সে দিব্যি বেঁচে আছে। অতঃপর সে উঠে দাঁড়াল। ঘড়িটা কোথায় পড়ল? দু’বছর আগে জন্মদিনে কাকা ওটা দিয়েছিল। তার কাছে অমূল্য জিনিস। ওটাকে উদ্ধার করতেই হবে।
সে ঝোপঝাড় সরিয়ে খুঁজতে শুরু করল। খুঁজতে—খুঁজতে শিবমন্দিরের দিকে দশ—বারো হাত এগিয়েই তার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। পা অসাড়, শরীর ঠাণ্ডা এবং মাথার মধ্যে নাগরদোলা ঘুরতে শুরু করল।
তার চোখের সামনে মন্দিরের পেছন দিকের চাতাল। চাতালটা হাঁ হয়ে রয়েছে। গাছ থেকে পড়ার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই আর একটা। চাতালে গজানো ঘাস আর ঝোপের মধ্যে একটা লোহার দরজা শোয়ানো। সেটা মরচেয় জরাজীর্ণ এবং ভেঙে চৌচির। দরজার পাল্লাটা কোনও কিছুর আঘাতে ভেঙে গিয়ে ভেতর দিকে ঝুলে পড়েছে। কলাবতীর মনে পড়ল রিকশাওলার কথাটা, ”দু—দুটো বাজ পড়েছে।”
এই তা হলে সেই পাতালঘরের দরজা।
সে ঝুঁকে পড়ল চার হাত লম্বা তিন হাত চওড়া গর্তটার দিকে। ভেতরটা অন্ধকার। স্যাঁতসেঁতে ভ্যাপসা গন্ধ ভেতর থেকে উঠে আসছে। তাকিয়ে থাকতে—থাকতে হঠাৎ কলাবতী চমকে উঠল। তার মাথার খুলিতে হাজারদশেক পিঁপড়ে চলাফেরা শুরু করল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। ঘাড়ের কাছটা সুড়সুড় করছে। চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।…ভূত! সে চোখ বুজল। এবার নির্ঘাত তার ঘাড় মটকাবে, নয়তো রক্ত চুষে খাবে।
