”কী ব্যাপার বল তো ঘণ্টু? সরার বাড়ি তো তুই চিনিস, ওকে বললি না কেন?” একজন বলল।
ভূদেব বললেন, ”সরার ভাল নাম যে স্বরাজ, সেটাই আমি জানতুম না। ও তো দাসপাড়ার বিরাজ দাসের ছেলে। শুনেছি বটে উঠতি প্লেয়ারদের মধ্যে খুব নাম করেছে।” তারপর চেঁচিয়ে বললেন, ”হ্যাঁগা ব্যাং, সরা কি বোলতার মাঠ থেকে উঠেছে?”
”তা না হলে কোত্থেকে উঠবে!” অবাক স্বরে উত্তর এল।
কলাবতী আর সুশি সারাক্ষণ চুপ করে কথাবার্তা শুনছিল। কলাবতী এবার ঘণ্টু নামের ছেলেটিকে বলল, ”আপনি স্বরাজ দাসের বাড়ি জানেন বলে মনে হল। কিন্তু সে—কথা লোকটাকে বললেন না কেন?”
”কারণ আছে।” বলেই ঘণ্টু ব্যস্তভাবে হনহন করে সেখান থেকে চলে গেল।
আর—একজন বলল, ”ঘণ্টু হল সরার খুব বন্ধু। হয়তো কোনও ব্যাপার আছে তাই লোকটাকে বাড়ির হদিস দিল না। তবে সরাকে এখানকার প্রায় কেউই চেনে না, ও তো গত আট বছর ধরে হাওড়ায় মামার বাড়িতে রয়েছে, মাঝে—মাঝে এখানে আসে দু—চারদিনের জন্য। খুবই গরিব ওরা। ঘণ্টু ছাড়া কারুর সঙ্গে মেশে না।”
ভূদেব বললেন, ”লোকটার হাবভাব যেন কেমন কেমন ঠেকল। খারাপ মতলবে আসেনি তো?”
”হতে পারে। কাগজে সেদিন দেখেছিলুম ট্রান্সফারের ব্যাপারে সরা নাকি ব্রাদার্স ইউনিয়ন আর শ্যামপুকুর দুটো ক্লাবের কাছ থেকেই অ্যাডভান্স নিয়েছে। হয়তো তাই নিয়ে গোলমাল পাকিয়েছে।” ছেলেটি আর দাঁড়াল না, তার সঙ্গে অন্য তিনজনও চলে গেল।
”আমিও যাই।” ভূদেব ব্যস্ত স্বরে বললেন, ”দীক্ষা নিয়েছি হার্ট অ্যাটাকের পর, এখন সন্ধ্যাহ্নিকে বসতে হবে।”
সুশি বলল, ”সন্ধে হতে তো এখনও অনেক দেরি।”
”কোথায় আর দেরি। দেখছ কেমন কালো হয়ে রয়েছে আকাশ। দুমদাম বাজ পড়তে পারে সেদিনকার মতো। খোলা মাঠে এখন থাকাটা ঠিক নয়, বাড়ি যাও।”
কলাবতী বলল, ”ঠিক বলেছেন। শুধু বাজ কেন, গড়বাড়ির ভূতেরাও তো পাতালঘর থেকে উঠে আসতে পারে কি বেলগাছটা থেকে নেমে আসতে পারে!”
ভূদেব চোখ পিটপিটিয়ে কলাবতীর দিকে তাকালেন। ”ভূতেদের আমি একদমই পছন্দ করি না, ওদের আমি ভয়ও পাই না। যাই, সন্ধ্যাহ্নিকের সময় হয়ে গেল।”
তিনি আর দাঁড়ালেন না। ব্যাংকাকা এগিয়ে এলেন ওদের দিকে। ”আর যদি ঝড়টড় না হয় গোলপোস্ট দুটো মনে হয় দাঁড়িয়েই থাকবে। ভূদেবদা এমন করে চলে গেল যে?”
সুশি বলল, ”উনি বললেন ভূতেদের ভয় করেন না।”
”করেন না? তা হলে গড়ের মাঠে কলেজ করায় বাধা দিচ্ছেন কেন? কী যে ছেলেমানুষি ভয় বুঝি না।”
কলাবতী বলল, ”কাকা, ওঁর ভয়টা ভেঙে দেওয়া যায় না?”
”গা ছমছম করা এইসব প্রবাদ না ভাঙলে এদের ভূতে বিশ্বাস দূর হবে না।” ব্যাংকাকা মাথা নাড়লেন হতাশভাবে। ”মোটরবাইকে কারা এসেছিল?”
সুশি বলল, ”স্বরাজ বলে এক ফুটবলারের বাড়ি কোথায় জানতে চাইল।”
”স্বরাজ মানে সরা? ও তো ছোটবেলায় বি.এস.সি—তেই খেলত। ওই বয়সেই দারুণ ড্রিবল করত, দু’পায়ে শট ছিল দেখার মতো। শুনছি এখন নাকি খুব নাম করেছে। কত আর বয়েস, কুড়িটুড়ি হবে। সুশি তোরা তো এখন বাড়ি যাবি। আমার ঘরে টিভি আছে দেখতে পারিস। আমি একটু পরে ফিরব। পরশুর খেলার টিম নিয়ে একটু সমস্যায় পড়ে গেছি।”
বাড়ি ফেরার পথে মোটরবাইক দুটো ওদের পাশ দিয়ে ভটভট করে বেরিয়ে গেল। চারজন লোকের একজন বুড়ো আঙুল তুলে কলা দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল ওরা যা খুঁজছিল পেয়ে গেছে। কলাবতী বলল, ”ওরা যাচ্ছে কোনদিকে বল তো? আমাদের বাড়ির দিকেই দেখছি গেল!”
সুশি বলল ”আমাদের বাড়ির কাছেই তো দাসপাড়া। বোধ হয় সরাদের বাড়ির খোঁজ কোথাও থেকে পেয়ে গেছে তাই যাচ্ছে।”
”যাওয়ার কারণটা একদমই বোঝা গেল না। লোকটাকে কীরকম যেন মস্তান—মস্তান বলে মনে হল। নিশ্চয় কোনও বদ মতলবে এসেছে।”
.
মেঘলা আকাশ। আলো পড়ে গেছে। বাড়িতে ঢোকার মুখে কলাবতী থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। গড়বাড়ির দিকে তাকিয়ে ম্লান আলোয় তার মনে হল ভাঙা দেওয়ালগুলো যেন প্রাচীন কোনও রহস্য আড়াল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সত্যিই কি বর্গিরা পাতালপুরীতে লুকিয়ে—থাকা সুশির পূর্বপুরুষের হত্যা করেছিল? এত বছর পর তার কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। লোকের মুখে—মুখে গল্প তৈরি হয়েছে তারা নাকি ভূত হয়ে পাতালঘরে বাস করছে।
তার ইচ্ছা করল শিবমন্দিরের দিকটা দেখে আসতে। সুশিকে সে বলল, ”দূর থেকে শিবমন্দিরটা দেখব, তুই দাঁড়া এখানে।”
”দাঁড়াব কেন, আমি যাব।”
দু’জনে এগিয়ে গেল গড়ের মাঠের দিকে। মাঠের কিনার ঘেঁষে বাবার সড়ক। একটি লোক সাইকেল চড়ে যেতে যেতে ওদের দেখে চেঁচিয়ে বলল, ”হেই, মাঠে নেমো না, শনিবার আজ।”
”নামলে কী হয়েছে?” কলাবতীও চেঁচিয়ে জানতে চাইল।
”ওঁরা ভর করবেন, জানো না?”
লোকটি প্যাডেল করতে করতে চলে গেল। ওরা মাঠের আর—একটু ভেতরে এগোল। মন্দিরের একটা দিক দেখা যাচ্ছে। যেখানে একসময় দরজা ছিল সেই জায়গাটাকে কালো গুহার মতো দেখাচ্ছে। দেখলে গা—ছমছম করে ওঠে। তার চারদিক ঘিরে উঁচু চাতাল। মন্দিরের পেছনে সত্যিই একটা বেলগাছ। মন্দিরের ইটগুলো ক্ষয়া, জরাজীর্ণ। বাবার সড়ক থেকে গড়ের মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে এসে, মন্দিরের চাতালে পৌঁছতে হলে দু—তিন ধাপ সিঁড়ি ভাঙতে হবে, সেই সিঁড়িও ভেঙে গিয়ে একটা টিপির মতো হয়ে রয়েছে। অশ্বত্থগাছ থেকে বিশ্রী কর্কশ স্বরে একটা পাখি ডেকে উঠল।
