প্রৌঢ়টির চোখদুটিতে অবাক চিহ্ন ফুটে উঠল। তিনি ব্যাংকাকাকে বললেন, ”মেয়েটি দেখেছি খেলার খবর ভালই রাখে।”
”রাখবে না? আটঘরার রাজশেখর সিংহির নাতনি যে!”
”অ অ, তাই বলো। তা এখানে এয়েচে কী জন্যে, বেড়াতে?”
জবাব দিল সুশি। ”বেড়াতে আর ভূত দেখতে। গড়ের মাঠের ভূত।”
প্রৌঢ়র চোখে আবার বিস্ময়। ”বলে কী। খবরদার ওই কাজটি কত্তে যেয়ো না। কলকাতায় থাকো তো, তাই ভূত জিনিস জানো না। ওই শিবমন্দিরের পাশে বেলগাছে শাদা কাপড় পরে ওঁরা বসে থাকেন। খড়ম খটখটিয়ে হেঁটে বেড়ান গড়ের মাঠে।”
কলাবতী বলল, ”আপনি দেখেছেন?”
”পাগল নাকি! আমি কেন দেখতে যাব। ওঁদের দেখলে কি আর আজ এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারতুম। কবে ওখানে চলে যেতুম।” আঙুলটা তুলে তিনি আকাশের দিকে খোঁচালেন। ”দুলেপাড়ার খ্যাঁদা দেখেছিল, ওঁরা মড়ার খুলি দিয়ে অমাবস্যার রাতে ফুটবল খেলছেন। তেরাত্তির পোয়াল না, বেচারার লাশ ভাসতে দেখা গেল পুকুরে। ওদের দেখতে নেই বুঝলে খুকিরা, ব্যাং, বারণ করো ওদের। বেড়াতে এসে কি বেঘোরে প্রাণটা দেবে?”
”নিশ্চয় বারণ করব ভূদেবদা। এই ছেলেমেয়েদের কথা কি শুনলে চলে?” বলেই ব্যাংকাকা ”হয়নি, হয়নি” বলে ছুটে গেলেন গোলপোস্টের দিকে। একদিকের পোস্ট ইঞ্চিচারেক নেমে গেছে পোঁতার দোষে।
ভূদেব একটি ছেলেকে ডাকলেন, ”হ্যাঁ রে রতন, বিদ্যুৎপুরের টিমে কলকাতার ক’টা ছেলে খেলেছিল?”
”তিনটে। সবাই সুপার ডিভিশনের।”
”হুমম। সেমিফাইনালের গাঁটটা দেখছি বি.এস. সি—র আর পেরনো হল না। ব্যাংয়ের এই এক গোঁ, হায়ার করে প্লেয়ার আনব না। আরে বাপু, সব টিমই কলকাতার প্লেয়ার আনে, ড্যাংডেঙিয়ে তারা শিল্ড নিয়ে গেছে আর আমরা ওই সেমিফাইনাল পর্যন্ত। বি. এস. সি. লাস্ট কবে শিল্ড জিতেছে?”
”কী জানি জ্যাঠামশাই, আমরা তো কখনও জিততে দেখিনি। বলুন না ব্যাংজ্যাঠাকে হাতটা একটু উপুড় করতে। সেমিফাইনাল আর ফাইনাল, দুটো ম্যাচে খেলে দেবে; জনাতিনেক হলেই হবে, গোলকিপার, স্টপার আর একটা স্ট্রাইকার। হাজার দশেকের মধ্যেই হয়ে যাবে।”
আর একটি ছেলে বলল, ”অত নীতিবাগীশ হলে কি টুর্নামেন্ট জেতা যায়? ঘরের ছেলে ছাড়া খেলাব না বললে কি চলে? মোহনবাগান কী করল? সেই তো ফরেন প্লেয়ার খেলাতে হল!”
”আমি বললে ব্যাং শুনবে না। ভূতের জমিতে কলেজ করা চলবে না বলার পর থেকে আমার ওপর চটে আছে। যদি বলি পঞ্চায়েত সমিতির আপত্তি নেই ভূতের জমিতে কলেজ করতে দিতে, তা হলে দশ কেন, বিশ হাজার বার করে দেবে। ওর কি টাকার অভাব!” ভূদেবের মুখ ব্যাজার, কণ্ঠে ক্ষোভ।
ভূত না থাকলে, ভূদেব মনে মনে ভেবে দেখলেন, জমিটা নিয়ে কোনও আপত্তিই উঠত না, তা হলে কলেজ করার যে স্বপ্ন বোলতাকে কেন্দ্র করে চারপাশের গ্রামের হাজার—হাজার মানুষ দেখতে শুরু করেছিল সেই স্বপ্ন এতদিনে পূরণ হয়ে যেত। না হওয়ায় ভূতে অবিশ্বাসীরা তার বিরুদ্ধে চলে গেছে। তার এখন চিন্তা সামনের পঞ্চায়েত ভোটে তিনি প্রধানের পদটি রক্ষা করতে পারবেন কি না। অবশ্য ভূতে বিশ্বাসী ভোটারও কম নেই। তা হলেও—ভূতেরা না থাকলে জমিটা নিতে কারও কোনও আপত্তিই হত না, এতদিনে কলেজের শিলান্যাস হয়ে যেত, তাতে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর নামের নীচে মান্যবর ভূদেব খেটো নামটাও খোদাই করা থাকত, ভোটে তো জিততেনই, এমনকী ব্যাংয়ের হাতটাও উপুড় করিয়ে কলকাতা থেকে প্লেয়ার আনিয়ে বংশীবদনকে বোলতায় রেখে দেওয়ার সাফল্যের ভাগিদার হতে পারতেন। এত কিছু হারাচ্ছেন শুধুই ভূতেদের জন্য। ভূদেব মনে মনে ভীষণ চটে উঠলেন ভূতেদের ওপর। হতভাগারা বিদায় হলে বাঁচা যায়।
ভূদেব যখন এইসব ভাবছেন তখন মাঠের পাশের রাস্তায় দুটো মোটরসাইকেল এসে থামল, দুটিতেই চালকের পেছনে একজন বসে। তাদের একজন বাইক থেকে নেমে ওদের দিকে এগিয়ে এল। বেঁটে, গাঁট্টাগোট্টা বছর কুড়ি—বাইশ বয়স। পরনে গোলগলা কালো স্পোর্টস শার্ট, জিনস, পায়ে স্নিকার, বগলে যেন ফোড়া হয়েছে এমনভাবে হাত দুটো ফাঁক করে দুলে—দুলে হেঁটে এসে ভূদেবকেই জিজ্ঞেস করল, ”দাদু, স্বরাজ দাসের বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন?”
ছ’—সাতটি শব্দ মারফত কর্কশ উচ্চচারণে ও বলার ভঙ্গিতে যুবকটি বুঝিয়ে দিল, সে অমার্জিত ও অশিক্ষিত। ভূদেব বিরক্ত স্বরে বললেন, ”কে স্বরাজ দাস?”
”যে গত বছর ইউনিয়নে খেলেছে, ইন্ডিয়া জুনিয়ার টিমে খেলেছে। সরার তো আপনাদের এখানেই বাড়ি।”
তখন একটি ছেলে বলল, ”তাকে আপনার কী দরকার?”
”দরকার আছে।” হিন্দি ফিল্মের খলনায়কদের মতো চোখ ও গলার স্বর হয়ে গেল যুবকটির। ”জানো যদি বলো ওর বাড়িটা কোথায়।”
ছেলেটি বলল, ”সরা—ফরা চিনি না। আপনি খুঁজে নিন।”
কালো শার্ট কয়েক সেকেন্ড মুখ কুঁচকে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”সরার বাড়ি কোথায় ঠিকই জানো তবে বলবে না। কেন?”
”জানি না, তাই বলতে পারব না।”
”বদু চলে আয়। বাড়ি খুঁজে নোব।” মোটরবাইকে বসা একজন চেঁচিয়ে বলল।
”জানো না, না?” নীচের ঠোঁট কামড়াল। একটা চোখ সরু হল। ”ফেমাস হয়ে গেছে যে ফুটবলার তার বাড়ি কোথায় জানো না? ঠিক আছে। বাড়ি বার করে নিচ্ছি।” হাত ফাঁক করে দুলতে দুলতে ফিরে গিয়ে সে মোটরবাইকের পেছনে উঠল। বাইক দুটো গর্জন করে বাজারের দিকে চলে গেল।
