কলাবতী বলল, ”আচ্ছা, ভূতেরা কি বাজকে ভয় করে?”
ব্যাংকাকা দোতলার বারান্দা থেকে ওদের আসতে দেখে নীচে নেমে এসে বাইরের উঁচু দাওয়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। শীর্ণকায়, কাঁচাপাকা চুল কদমছাঁটে, গায়ে হাফহাতা পাঞ্জাবি, পায়ে কাপড়ের পাম্প শু, ধুতি মালকোঁচা করা, চাহনিতে কৌতূহল। ওরা প্রণাম করতেই তিনি বললেন, ”ভাত খাবি তো? রান্না করাই আছে। আমি একটু বেরোচ্ছি। ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে, ঝড়ে গোলপোস্ট পড়ে গেছে, পরশু আবার সেমিফাইনাল খেলা। শেতলের মা রইল, যা দরকার ওকে বলবি। কালু কোনওরকম লজ্জা করবে না, নিজের বাড়ি মনে করবে।” এই বলে ব্যাংকাকা ব্যস্ত হয়ে চলে গেলেন।
দোতলায় দক্ষিণ—পশ্চিমের ঘরটায় ওদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। বিরাট একটা সেকেলে পালঙ্ক, তাতে অন্তত চারজন বয়স্ক লোক পাশাপাশি শুতে পারে। মোটা মোটা দুটো পাশ বালিশ আর বালিশ। এক বিঘত চওড়া গদিতে ধবধবে সাদা চাদর পাতা। লাল সিমেন্টের মেঝেটা দেখলেই বোঝা যায় নিয়মিত মোছা হয়। সিলিংয়ে পাখা ঝুলছে। চারটে জানলাই বেশ বড়, খড়খড়ির পাল্লা দেওয়া। এইরকম ঘর কলাবতীদের আটঘরার বাড়িতেও আছে।
ঘরের বাইরেই রেলিং দেওয়া টানা বারান্দায় এসে সে দাঁড়াল। সেখানে থেকে পশ্চিমে গড়ের দিঘির অনেকটাই দেখা যায়। দিঘির পাড়ের কাছে নলবন আর জলাঘাসে ভরা। মাঝখানটায় কিন্তু পরিষ্কার টলটলে জল। দিঘির অপর পাড়ে কয়েকটা মাটির বাড়ি। তার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল ট্রেকার চলছে। রাস্তাটা দিঘিকে বেড় দিয়ে বোলতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে তারকেশ্বরের দিকে। লোকে এর নাম দিয়েছে ‘বাবার সড়ক’।
বাড়ি থেকে একটা সরু পথ গেছে ভাঙাচোরা বাঁধানো ঘাটে। সেখানে একটা ছোট্ট নৌকো বাঁধা, তার আকৃতিটা ত্রিভুজের মতো। দুটো দাঁড় নৌকোর দু’ধারে লোহার কড়ায় আঁটা। দু’জন লোক পাশাপাশি বসে দাঁড় বাইতে পারে এমন একটা পাটাতন নৌকোয় পাতা।
কলাবতী সুশিকে ডেকে বলল, ”নৌকোটা কাদের রে, তোদের?”
”হ্যাঁ, দাদার জন্য ব্যাংকাকা ওটা তৈরি করে দেন। দাদা ছুটিছাটায় এসে দিঘিতে ঘুরে বেড়াত। এখন আর চড়ার লোক নেই, পড়েই থাকে।”
”চল, আমরা নৌকোয় চড়ে ঘুরব।”
”আজ নয়, কাল সকালে। চান করবি তো নীচে চল, যা ভ্যাপসা গরম, টিউবওয়েল থেকে জল তুলে রেখেছে শেতলের মা। দেখবি কী ঠাণ্ডা জল।”
”তোদের শিবমন্দিরটা কোনদিকে?”
”বারান্দার পুবে গেলে দেখতে পাবি। তুই দ্যাখ, আমি চান করতে যাচ্ছি।”
কলাবতী বারান্দার পূর্ব দিকে গেল। ব্যাংকাকা থাকেন এইদিকের ঘরটায়। ঘরের দরজায় শিকল তোলা। গড়বাড়িটা একটু দূরে। দোতলা বলে কিছু নেই। একতলায় খাড়া রয়েছে মোটা—মোটা কয়েকটা ভাঙা দেওয়াল। দরজা—জানলার জায়গাগুলো ফাঁকা। বাড়িটা আগাছায় ভরা, ভাঙা ইট ছড়িয়ে রয়েছে। দেওয়ালগুলোর পেছনেই শিবমন্দির। সেটিও ভাঙা, তবে বোঝা যাচ্ছে না যেহেতু অশ্বত্থ গাছে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো বলে। রিকশাওলা বলেছিল দুটো বাজ এর ওপর পড়েছে। কলাবতী দূর থেকে খুঁজল কিন্তু বাজ পড়ার কোনও চিহ্ন দেখতে পেল না। তার মনে হল মন্দিরের পেছন দিকে সম্ভবত বাজ পড়েছে, তাই সে পোড়া বা ভাঙা কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কাল সকালে দেখতে হবে।
ওদের খিদে ছিল না। শেতলের মা কয়েকটা আম কেটে দিল।
”চল সুশি, একটু ঘুরে দেখি তোদের বোলতা, সেইসঙ্গে ঘড়ির দোকানটাও।”
বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডান দিকে জংলা পোড়া মাঠটাকে দেখিয়ে সুশি বলল, ”এই হল সেই গড়ের মাঠ আর ওই তোর শিবমন্দির। ভূতেদের ছেলেমেয়েরা ওখানে কানামাছি খেলে।”
”পাতালঘরটা কোথায় বল তো?”
”লোকে তো বলে শিবমন্দিরের তলায়।”
”চল না শিবমন্দিরটা একটু দেখে আসি।”
সুশি শিউরে উঠে বলল, ”আজ শনিবার, ভূতেদের ডিস্টার্ব করতে নেই। আজ ওদের শনিপুজোর দিন।” খিলখিল করে সে হেসে উঠল। ”আজ ভূতটুত থাক, কাল সকালে দেখা যাবে!”
দু’জনে হাঁটতে—হাঁটতে বোলতা বাজার এলাকায় এল। সেখানে শনিমন্দির, পোস্ট অফিস, ব্যাঙ্ক, অডিও ক্যাসেটের দোকানের সামনে ঘড়ি—সারাইয়ের দোকান। দোকানটা বন্ধ। দোকানের পাশে একটা বটগাছের গায়ে টিনের সাইনবোর্ডে লেখা, ‘যে—কোনও মিউজিক্যাল প্রোগ্রাম অ্যারেঞ্জ করিয়া থাকি।’ তার নীচের আর একটা টিনে, ‘টিউকলের অভিজ্ঞ মিস্ত্রি পাওয়া যায়।’ ওরা ফেরার পথে উচ্চচ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টা ঘুরে ফুটবল—মাঠের দিকে গেল। মাঠে ব্যাংকাকা দাঁড়িয়ে দু’জন লোক দিয়ে গোলপোস্ট খাড়া করার কাজে ব্যস্ত। চার—পাঁচজন ছেলে আর এক প্রৌঢ় তার পাশে।
”কাকা, এখানে কী টুর্নামেন্ট হচ্ছে?” সুশি জানতে চাইল।
”বংশীবদন চ্যালেঞ্জ শিল্ড আর প্রিয়বালা চ্যালেঞ্জ কাপ, জেলার একটা টপ টুর্নামেন্ট, চল্লিশ বছর ধরে চলছে। কত ফুটবলার এখান থেকে বেরিয়েছে জানিস। ভোঁদা মিত্তির ইন্ডিয়ার গোলকিপার খেলেছে সে তো রসবেড়িয়ার ছেলে, এই মাঠ থেকে উঠে ইস্টবেঙ্গলে খেলেছে। কালো দত্ত, শৈলেন মান্নার পর অমন একটা ব্যাক আর মোহনবাগানে খেলেনি, সে তো পাশের ইকড়ি গ্রামের রাসু দত্তর নাতি।”
”শৈলেন মান্নার পর কালো দত্ত ছাড়া আর কেউ খেলেনি বলছেন কেন?” কলাবতী নিচু স্বরে প্রতিবাদ জানাল, ”জার্নেল সিং? সুব্রত ভটচায?”
