এগারোটা তেত্রিশের ট্রেনে উঠে বারো—তেরোটা স্টেশন ছুঁয়ে পৌনে একটায় তারা ট্রেন থেকে নামল, মাত্র পনেরো মিনিট লেট করেছে তারকেশ্বর লোকাল। ভিড় ছিল না, বসেই এসেছে সারা পথ এবং দু’জন ঝালমুড়িওয়ালাকে সমৃদ্ধ করেছে আট টাকায়, শসাওলাকে দু’টাকায়, বাদামওলাকেও দু’টাকায়, কলাবতী এক সফট ড্রিঙ্কসওলাকে ডাকতে যাচ্ছিল সুশি বাধা দেয়, ”খবরদার খাবি না, ট্রেনে সব নকল জিনিস, খেলেই কিন্তু জন্ডিস।”
ওরা যে যাচ্ছে ব্যাংকাকাকে সেটা অবশ্য গতকাল জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুশিদের দেশের বাড়ির কাজের লোক জনার্দন যাকে ওরা জনাদা বলে, তার হাত দিয়ে ব্যাংকাকা গোটা কুড়ি ল্যাংড়া আম আর শ’খানেক লিচুর সঙ্গে একটা থলিতে বেঁধে এক বিঘত লম্বা দশটা কইমাছ আর প্রায় এক কেজি বাড়িতে তৈরি গাওয়া ঘি পাঠিয়ে দেন। কালই জনাদা ফিরে গেছে বোলতায়, সঙ্গে চিঠি নিয়ে। মুখেও অবশ্য তাকে বলে দেওয়া যেত কিন্তু জনাদার শ্রবণশক্তি কিছুটা গোলমেলে। তাকে বলা হয়েছিল দু’কেজি মতো কই পেলে ব্যাংকাকা যেন পাঠিয়ে দেয়। তিনদিন পর ব্যাংকাকা দু’কেজি খই পাঠিয়ে দেন, সঙ্গে একটা চিঠি—’হঠাৎ খইয়ের দরকার হল কেন, কলকাতাতে কি খইয়ের আকাল পড়েছে?’ অতঃপর চিঠি দিয়ে ভুলটা ধরিয়ে দিতে দশটা কইমাছের সঙ্গে আম, লিচু আর ঘি তিনি পাঠিয়ে দেন।
ট্রেনের পর বাসে দশ মিনিট গিয়ে নামল ইকড়ি নামে একটা জায়গায়। সুশি বলল, ”এখানে সুবল সামন্তর দোকানের মাখা সন্দেশ খুব ফেমাস, খাবি?”
কলাবতী সঙ্গে—সঙ্গে রাজি। বাসস্টপের কাছেই দোকানটা। ওরা দুশো গ্রাম করে সন্দেশ দোকানের বেঞ্চে বসে খেল। খেতে খেতে কলাবতী বলল, ”এখানে ঘড়ির দোকান আছে? আমার ব্যান্ডটা ছিঁড়ব ছিঁড়ব হয়েছে, বদলাতে হবে।”
”আমাদের বোলতায় ঘড়ি, ট্রানজিস্টার, টিভি সবকিছু সারানোর দোকান আছে, ওখানেই পেয়ে যাবি।”
এর পর ওরা সাইকেল—রিকশায় রওনা দিল বোলতার উদ্দেশে। যেতে যেতে যা কিছু চোখে পড়ছে অবাক হয়ে যাচ্ছে কলাবতী। বিশাল একটা বাঁশবন দেখে সে বলল, ”সুশি, এখানে বাঘ থাকে?”
”বাঘেদের তো মাথা খারাপ হয়নি। এখানকার লোক পিটিয়ে কিমা করে দেবে।”
”ওটা কী গাছ রে?”
”ভাল করে তাকিয়ে দ্যাখ, কী ঝুলছে গাছে?”
”ওমমা, তাই তো কত্ত কালোজাম!”
”আমাদের বাগানেও আছে, কত খেতে পারিস দেখব।”
রাস্তাটা দু’পাশের জমি থেকে উঁচু। একটা নিচু পাঁচিল দেওয়া পুরনো বাড়ির সিমেন্ট বাঁধানো লম্বা দাওয়ায়, রৌদ্রের মধ্যে ছাতা মাথায় এক বৃদ্ধা বসে কৌতূহলে তাকিয়ে দেখছিলেন কারা সাইকেল—রিকশায় চড়ে যাচ্ছে।
”সুশি, সুশি, দেখেছিস!” বৃদ্ধার দিকে আঙুল তুলল কলাবতী।
সুশি তাকাল। তার চোখ পড়ল বৃদ্ধা ছাড়াও আরও কিছুতে।
”এই রিকশাওলা, থামাও, থামাও।” সুশি চেঁচিয়ে উঠতেই রিকশাওলা ব্রেক কষল। লাফ দিয়ে নামতে নামতে সুশি বলল, ”একটু দাঁড়াও, আসছি।”
বাড়ির সদর দরজাটা খোলা। কলাবতী দেখল সুশি দৌড়ে ঢুকল। বৃদ্ধার কাছে গিয়ে প্রণাম করে কী যেন বলল। বৃদ্ধার মুখ ভরে গেল হাসিতে। দু’জনে কী যেন কথা হল। আঙুল দিয়ে বৃদ্ধা পাঁচিলের ধারের কলাগাছটা দেখালেন, সুশি ছুটে গিয়ে কলাপাতা ছিঁড়ে আনল। বৃদ্ধার সামনে ঢাকনা খোলা চারটে আচারের বোয়েম। তিনি তাই থেকে আচার তুলে তুলে কলাপাতায় রাখলেন। সুশি আঙুল দিয়ে রিকশায় বসা কলাবতীকে দেখাল। বৃদ্ধা আর একটু আচার দিলেন। সুশি তারপর গদগদ মুখে কী যেন বলতে বৃদ্ধার মুখ স্নেহের, সুখের হাসিতে ভরে গেল।
”নে, ধর।” রিকশায় ওঠার আগে সুশি কলাপাতাটা কলাবতীর হাতে ধরিয়ে দিল। ”চলো গো এবার।”
”টক, মিষ্টি, ঝাল সবরকমের; আমের, তেঁতুলের আর করমচার। একটু—একটু করে বুড়ি দিল। লেবুরও ছিল, আমি আর চাইনি।” সুশি তেলচুপচুপে মশলামাখা আমের টুকরো মুখে দিয়ে বলল।
”তোর চেনা?”
”দুর, চেনা হতে যাবে কেন? স্রেফ গিয়ে বললুম, ঠাকমা কলকাতা থেকে আসছি তোমার হাতের আচার খাব বলে, দাও। না দিলে এখানে বসে কাঁদতে শুরু করব। বুড়ির সে কী হাসি! জিজ্ঞেস করল, কাদের বাড়ির মেয়ে তুই? বললুম। বলল, ব্যাংয়ের ভাইঝি? বাবার নাম কী? বললুম। বলল, ট্যাংরার মেয়ে তুই? তারপর কলাপাতা ছিঁড়ে আনতে বলল। আসার সময় বলল, ক’দিন আগে এলি না কেন, কামরাঙার আচারটা খাওয়াতে পারতুম। খেতে কেমন লাগছে রে কালু?”
”জবাব নেই। তোদের বাড়িতে ব্যাং আর ট্যাংরা ছাড়া আর কী আছে?”
”জ্যাঠামশাইয়ের ওজন ছিল তিনমন, নাম ফড়িং।”
”এইসব বুড়িরা এখনও আছে বলেই নাতনিরা চিরকাল নাতনিই থেকে যায়।”
গল্প করতে করতে ওরা বোলতার ফুটবল মাঠের ধার দিয়ে, বি এস সি—র ক্লাবঘরের পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছে তখন একটা শিকড়সমেত উপড়ে পড়া নিমগাছ দেখে কলাবতী বলল, ”এখানেও খুব ঝড় হয়ে গেছে দেখছি।”
কথাটা শুনে রিকশাওলা প্যাডেল করতে করতেই বলল, ”শুধু ঝড় নয় দিদিমণি, চার—পাঁচটা বাজও পড়েছে। আপনারা যে বাড়িতে যাচ্ছেন সেখানকার ভাঙা শিবমন্দিরে দু—দুটো বাজ পড়েছে। ইকড়ির বাসস্টপের কাছে দুটো লোক গাছতলায় বাজে মরেছে। সে যে কী অবস্থা, সারা জেলাটা তছনছ করে দিল বৃষ্টি আর বাজ।”
সুশি ভয়ে ভয়ে বলল, ”আর বাজ পড়বে না তো?”
