”কালু, বৃষ্টিতে ভেজোনি তো?”
”না বড়দি, আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুধু চাঁপাগাছটা দুলে দুলে কীভাবে ভিজছে তাই দেখছিলুম।”
”ঠাণ্ডা পড়েছে, পাখা আজ বন্ধ রাখবে।”
”রাখব।”
”দাদুর পা কেমন? এখন তিনি কোথায়?”
”ভাল আছে। দাদু লাইব্রেরিতে ভূতেদের নিয়ে এক সাহেবের লেখা বই পড়ছে।”
”হঠাৎ ভূতেদের নিয়ে লেখা বই পড়ছেন?”
”আমি সুশির সঙ্গে মানে আমাদের ক্লাসের সুস্মিতার সঙ্গে ওদের গ্রামের বাড়ি বোলতায় যাব ভূত দেখতে, সামনের শনিবার। তাই দাদু জানতে চাইছে ভূত কোথায় থাকে বেলগাছে না শ্যওড়া গাছে না হানাবাড়িতে না মানুষের মনে।”
”সাহেবের বইয়ে বেলগাছ শ্যাওড়াগাছ থাকবে কী করে? ওরা কি এসব গাছ চোখে দেখেছে? বোলতাটা কোথায়?”
”আমাদের আটঘরা মানে আপনাদের বকদিঘিরও কাছাকাছি বোলতা জায়গাটা। হরিদাদু নিশ্চয়ই জানেন। বোলতার লোকেরা ভীষণ ভয় পায় সুশিদের পোড়ো গড়বাড়ি আর গড়ের মাঠটাকে। বর্গিরা সুশিদের পূর্বপুরুষের অনেককে খুন করেছিল, তারাই নাকি ভূত হয়ে রয়েছে।”
”বর্গিরা খুবই অত্যাচার করেছিল, বিশেষ করে আমাদের হুগলি জেলায়। তুমি তো জানো না, রঘুজি ভোঁসলের ছেলে জানাজির সর্দারিতে শিবপুর বটানিক্যাল গার্ডেন পর্যন্ত এসে পড়েছিল। গঙ্গা পেরিয়ে কলকাতা অ্যাটাক করতে পারে এই ভয়ে সতেরোশো বিয়াল্লিশে ইংরেজরা বাগবাজার থেকে আদি কলকাতার পূর্ব দিক ঘিরে গর্ত খোঁড়ে গোবিন্দপুর পর্যন্ত। তাকে বলা হত মারহাট্টা ডিচ। এখন অবশ্য এই ডিচটা নেই। বছর চল্লিশ পরেই এটা বুজিয়ে ফেলে একটা রাস্তা তৈরি করা হয়। ওই রাস্তাটার নাম কী বলো তো?”
”সার্কুলার রোড। এখন তার দুটো নাম, দুই আচার্য—প্রফুল্লচন্দ্র আর জগদীশচন্দ্রের নামে। দাদু বলেছে বহু লোক ভুল করে বাগবাজার থেকে উল্টোডাঙা মানিকতলা বেলেঘাটা যে খালটা তাকে মারহাট্টা ডিচ বলে।”
”বোলতায় কিন্তু বেলগাছ কি শ্যাওড়াগাছের দিকে একদম যাবে না, শুধু দূর থেকে দেখবে। আমার একটা বায়নাকুলার আছে সেটা নিয়ে যেতে পারো ভূত দেখতে সুবিধে হবে।”
”বড়দি, আপনি তিন বছর বিলেতে থেকে ডক্টরেট করে এলেন আর কি না ভূতে বিশ্বাস করেন?”
”কে বললে করি? ভূতটুত ওসব মনগড়া ব্যাপার। তবে কি না হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ বিশ্বাস করে আসছে তাকে চট করে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, ভাল কথা আমার বায়নাকুলারটা বোধ হয় তোমাদের বাড়ির কারও কাছে আছে।”
”হ্যাঁ, কাকার কাছে। ভাবছি কাকার ক্যামেরাটাও নিয়ে যাব, ভূতের ছবি তুলে রাখব। আর আমার টেপ রেকর্ডারটাও নেব ভূতের গলার স্বর যদি—”
”আহা—হা, আবার ক্যামেরা—টেপ রেকর্ডার কেন? কাছে যাওয়ার মতো কোনও ব্যাপারেই থাকবে না। ভূতেরা আধুনিক যন্তরপাতি একদমই পছন্দ করে না। তুমি খুব স্মার্ট পোশাক সঙ্গে নেবে মানে শাড়িটাড়ি নয়, দৌড়ে যাতে পালাতে সুবিধে হয় এমন কিছু সবসময় পড়ে থাকবে—বারমুডা, জিনস, সালোয়ার কামিজ, তুমি তো এসব পরোই, তবে গ্রামের লোক পছন্দ নাও করতে পারে। ভূতেদের পা খুব লম্বা মনে রেখো, তাড়া করলে পালাতে পারবে তো?”
”মনে হয় পারব। স্কুলের স্পোর্টসে একশো, দু’শো, চারশো মিটার দৌড়ে তো ফার্স্ট হয়েছি বরাবর।”
”আর শোনো, সুশির উপস্থিত—বুদ্ধিটা খুব ভাল, ওকে সবসময় কাছে কাছে রাখবে। মনে আছে তো স্কুলের স্পোর্টসে ও তোমাকে কীভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছিল!”
”মনে আছে। এই সেদিন বিয়েবাড়িতে ওর উপস্থিত—বুদ্ধির আর একটা প্রমাণ পেলুম। ও না বাঁচালে আমি আর কাকা খুব লজ্জায় পড়ে যেতুম। পরে সব বলব কী ঘটেছিল। এখন ফোন রাখছি, খাওয়ার ডাক পড়েছে।”
”পাখা বন্ধ রাখবে।”
”রাখব।”
”বেলগাছ দূর থেকে দেখবে। মনে রেখো ভূতেদের পা খুব লম্বা হয়।”
সুশি সম্পর্কে মলয়া যে উপস্থিত বুদ্ধির কথা বলল, সেটা অনেকেই জানে। তবু মনে করিয়ে দিচ্ছি। স্কুলের বার্ষিক স্পোর্টসে ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’ প্রতিযোগিতায় কলাবতী সেজেছিল গুণ্ডা। সে এমন মেকআপ নিয়েছিল যে, উপস্থিত সব শিক্ষিকা, অভিভাবক আর ছাত্রীরা, প্রায় দু’শো লোক, কেউ বুঝতেই পারেনি হলদে কাপড়ের টুপি মাথায়, কালো কাচের চশমা চোখে, ফুলহাতা লাল জামা আর জিনস পরা ছিপছিপে চেহারার, থুতনিতে হালকা দাড়ি, হাতে একই ছ’ইঞ্চি ফলার ছুরি নিয়ে সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে যে গুণ্ডাটা আসলে সে কলাবতী। হেডমিস্ট্রেস অর্থাৎ বড়দি মলয়া মুখার্জি যখন নিরুপায় হয়ে মাইক্রোফোনে চিৎকার করলেন ‘হেল্প হেল্প, পুলিশ, পুলিশ, বাঁচান আমাদের বাঁচান।’ তখন উপস্থিত কিছু পুরুষ গুণ্ডাটাকে ধরার জন্য এগোতে থাকে। কলাবতী বিপদ বুঝে পালাবার জন্য এধার—ওধার যখন তাকাচ্ছে তখনই সুশি ‘আঁ আঁ আঁ’ শব্দ করে চোখ উলটে মূর্ছা যায়। সবার নজর কলাবতীর থেকে ঘুরে গেল সুশির দিকে আর সেই ফাঁকে কলাবতী ছুটে মাঠ থেকে পালায়। গো অ্যাজ ইউ লাইকের প্রথম পুরস্কারটা অবশ্য সে—ই পেয়েছিল।
.
কাঁকুড়গাছির মোড় থেকে বাসে উঠেই সুশি বলল, ”এই মুহূর্ত থেকে বোলতা হয়ে কাঁকুড়গাছির বাড়িতে ঢোকা পর্যন্ত সব খরচ আমার। তুই আমার অতিথি, একদম পকেটে হাত ঢোকাবি না।”
কলাবতী বলল, ”কিন্তু ট্রেনে ঝালমুড়ি, বাদাম, শশা—”
”সব আমার।”
দু’জনেরই কাঁধ থেকে ঝুলছে মোটা কাপড়ের অ্যাডিডাসের ক্যারিব্যাগ। বড়দি যেসব পোশাক নিতে বলেছে কলাবতী সেগুলো নিয়েছে। মাত্র ক’টা দিন তো থাকবে তাও গ্রামের মতো জায়গায়, বিয়েবাড়িতে তো আর যাচ্ছে না। পুজোটুজোও এখন নেই। ক্রিকেট খেলার জন্য ভারতের কয়েকটা শহর সে ঘুরে এসেছে। তার ধারণা আছে কোথায় কী পোশাক নিয়ে যেতে হবে। তার ব্যাগে আছে টেপ রেকর্ডার আর গানের ক্যাসেট। বায়নাকুলার বা ক্যামেরা নেয়নি। ঘুরে বেড়াবার জন্য কাপড়ের পাম্পশুটা নেব নেব করেও তার বদলে হাওয়াই চপ্পল নিল।
