রাজশেখর সকলের খাওয়া দেখা আর সমীরের গল্প শোনা, দুটো কাজ একসঙ্গেই সারছিলেন। খালি প্লেটগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ”আর দুটো আম দিক।”
”না, না, আর না।” সমীর মাথা নাড়ল।
”সন্দেশ?”
সমীরের মাথা স্থির রইল এবার।
”মুরারি।” রাজশেখর হাঁক দিলেন। ”বলো, তারপর।”
সমীর শুরু করল, ”তারপর বর্গিদের কথা। ধনী লোকেদের বাড়িতে তখন খুব ডাকাত পড়ত। ডাকাত আসছে শুনলেই টাকাকড়ি, গহনা, দামি জিনিসপত্তর নিয়ে একটা সুড়ঙ্গপথ দিয়ে ওই লুকনো পাতালঘরে বাড়ির সবাই আশ্রয় নিত। ডাকাতরা চলে গেলে বেরিয়ে আসত। সুড়ঙ্গপথটা যাতে ডাকাতরা আবিষ্কার করতে না পারে সেজন্য সেটা বাইরে থেকে বন্ধ করে তালাচাবি দিয়ে চাবিটা খুব বিশ্বাসজনক কাউকে দিত। চাবি নিয়ে সেই লোকটি বাড়ির কাছাকাছি একটা ঝাঁকড়া গাছে উঠে লুকিয়ে বসে থাকত। ডাকাতদের আসা আর চলে যাওয়া দেখার পর লোকটা গাছ থেকে নেমে এসে চাবি দিয়ে তালা খুলে দিত।
”বোলতার দিকে বর্গিরা আসছে খবর পেয়েই আমাদের পূর্বপুরুষরা তাঁদের সঞ্চিত ধনসম্পত্তি নিয়ে গড়বাড়ি থেকে সুড়ঙ্গপথে পাতালঘরে পালিয়ে আশ্রয় নেন। তাঁদের একজন বিশ্বস্ত কাজের লোক সুড়ঙ্গের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে তালাচাবি দিয়ে দিঘির পাড়ে একটা পুরনো তেঁতুলগাছে উঠে লুকিয়ে বসে থাকে। এদিকে বর্গিরা ঘোড়ায় চড়ে এসে হাজির। গ্রামের লোকজন যার যা কিছু সম্বল ছিল তাই নিয়ে আগেই পালিয়েছে। বর্গিরা গড়বাড়িতে ঢুকে দেখল চারদিকে ভোঁ ভাঁ। গোয়ালে গোরু পর্যন্ত নেই, বড় বড় সিন্দুকের ডালা খোলা, ভেতরে সোনার একটা দানাও নেই, অগত্যা তারা হতাশ হয়ে বোলতা ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু দু’—চারজন বর্গি নাকি তখনও গড়বাড়ির আশেপাশে জঙ্গলে ঘুরছিল।
”যে বিশ্বস্ত কাজের লোক তেঁতুলগাছের মগডালে চড়ে বসেছিল, সে যখন দেখল বর্গিরা চলে গেছে তখন সে গাছ থেকে নেমে গড়বাড়ির দিকে এগোল তালা খুলে দেওয়ার জন্য। যে বর্গিগুলো জঙ্গলে ঘুরছিল তাদের একজনের চোখে পড়ে যায় ওই চাকরটা। ব্যস, সঙ্গে—সঙ্গে পাকড়াও আর খবর বার করার জন্য অকথ্য মার। কিন্তু শত অত্যাচারেও বর্গিরা তার মুখ দিয়ে একটা কথাও বার করতে পারল না। তখন প্রচণ্ড রাগে তারা তরোয়াল দিয়ে কাজের লোকটার মুণ্ডচ্ছেদ করে।”
সমীর জল খাওয়ার জন্য কথা বন্ধ করল। মুরারির নতুন করে আনা সন্দেশের প্লেট তখনও খালি হয়নি। একটা সন্দেশ তুলে নিয়ে সমীর আবার শুরু করল। ”এখানে দু’রকম গল্প বোলতায় চালু আছে। একটা হল, বর্গিরা কাজের লোকটাকে মেরে ফেলার পর তার শরীর তল্লাশ করে সুড়ঙ্গের চাবি পেয়ে যায়। এর পর খোঁজাখুঁজি করে সুড়ঙ্গের দরজাও বার করে ফেলে, তারপর অন্য বর্গিদের ডেকে এনে পাতালঘরে যারা লুকিয়ে ছিল তাদের কচুকাটা করে তাদের সর্বস্ব লুট করে চলে যায়। সেই মৃতরাই নাকি পরে ভূত হয়। আর একটা গল্প হল, সেই কাজের লোকটাকে খুন করে লাশটা ফেলে রেগে বর্গিরা নাকি চলে যায়। ওদিকে পাতালঘরে আশ্রয় নেওয়া লোকেরা তো আটকা পড়ে থাকে। চাবিটা তো লাশের পোশাকের মধ্যে। অবশেষে ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে সেই লোকগুলো দরজা—বন্ধ পাতাল ঘরের মধ্যে একে একে মারা যায়। এরাই পরে ভূত হয়েছে।” সমীর হাসল। তার গল্প আর সন্দেশ দুটোই শেষ।
কিছুক্ষণ সবাই চুপ। প্রথম কথা বলল কলাবতী, ”আচ্ছা দাদু, ভূতেরা কতদিন বাঁচে?”
”যতদিন মানুষের মনে ভয় থাকে ততদিন বাঁচে। তবে এই গড়বাড়ির পাতালঘরের ভূতেদের আড়াইশো বছর বেঁচে থাকার কোনও যুক্তি নেই। আছে কী?” রাজশেখর তাকালেন সমীরের দিকে।
”আছে, কেননা বোলতায় ভয়টাও বেঁচে আছে। ওখানকার লোকের ধারণা ওই গড়বাড়ির জমিতে বাড়ি তৈরি করে বাস করলে তার সর্বনাশ হবে। ওখানে অপদেবতারা বাস করে। আমার ঠাকুর্দার আমলে একজন প্রচলিত প্রবাদ অগ্রাহ্য করে বাড়ি করেছিল। গৃহপ্রবেশের দিন পরিবারের কর্তা কলেরায় মারা যায়, তারা বাড়ি বিক্রি করে দেয়। যিনি কেনেন তাঁর একমাত্র ছেলে বাড়িতে বাস করার তিনদিনের মধ্যে গড়ের দিঘিতে ডুবে মারা যায়। তাঁরাও বাড়ি বিক্রি করে দেন। যারা কিনল তাদের কেউ মরেনি তবে তিনদিনের মাথায়ই বাড়িতে আগুন লেগে তারা সর্বস্বান্ত হয়। ব্যস, বোলতায় আরও পাকাপোক্ত হয়ে গেল ভূতের ভয়। একজন পাঁচ কাঠা জমি কিনেছিল, এর পর আর বাড়ি করেনি।”
”যে বাড়িটা হয়েছিল, সেটা এখনও আছে?” কলাবতী জানতে চাইল।
”নেই। পুড়ে একদম ছাই হয়ে গেছে।” সমীর উঠে দাঁড়াল। ”এবার আমরা আসি জ্যাঠামশাই। পরশু শনিবার সুশি বোলতা যাবে। ঘণ্টা দেড়েক লাগবে। হাওড়া স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেনে এক ঘণ্টা, তারপর ১৫ মিনিট বাসে, তারপর সাইকেল রিকশা একাই চলে যাবে। গত বছর তো তাই গেছল। এবার তো সঙ্গে কলাবতী থাকবে। ব্যাংকাকা খুব খুশি হবেন।”
”সুশি তা হলে শনিবার আমাদের বাড়ি চলে আয়, খেয়েদেয়ে দু’জনে একসঙ্গে স্টেশনে যাব।” কলাবতী ঘরের দরজার দিকে এগোল ওদের সঙ্গে। ”উফফ, কতদিন যে ইলেকট্রিক ট্রেনে চড়িনি।”
সেইদিন রাতে কলকাতায় হঠাৎই দমকা ঝড় উঠল মিনিটদশেকের জন্য। ঘন ঘন মেঘের গর্জন ও বিদ্যুৎ চমকের সঙ্গে শুরু হল বৃষ্টি। আধঘণ্টা পর সব শান্ত। তারপর ফোন এল স্কুলের বড়দি মলয়া মুখার্জির কাছ থেকে। মলয়া প্রায়ই রাতে কলাবতীকে ফোন করে ওর খবর নেয়। ওদের মধ্যে এই ভাবে কথা হল :
