”ওহ, তুমিও দেখছি এইট্টিনথ সেঞ্চুরিতে পড়ে রয়েছ।” হতাশ স্বরে কথাটা বলে সোফায় গা ছেড়ে দিয়ে রাজশেখর চোখ বুঝলেন। সমীর ও চঞ্চলা নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করল। সমীর টেবিলে রাখা অ্যাটাচি কেসটা খুলল।
”যেজন্য আমরা এসেছি জ্যাঠামশাই।” সমীর কুণ্ঠিত স্বরে বলল।
”কী জন্য?” রাজশেখর চোখ খুললেন। সমীরের হাতে গহনার বাক্সটা দেখেই তার ভ্রূ কুঁচকে উঠল, অথবা বলা যায় সিংহের কেশর ফুলে উঠল।
”এটা কী?” গর্জনই বলা যায়, রাজশেখরের প্রশ্নটিকে।
সমীর কিন্তু ঘাবড়াল না। শান্ত দৃঢ়স্বরে সে বলল, ”এটা আমাদের বাচ্চচুর জন্য আপনি পাঠাননি। ইচ্ছার নাতনিকে দিচ্ছেন বলে এই কাগজটায় লেখা রয়েছে। এ—জিনিস বাচ্চচু নেবে না। ফেরত দেওয়ার জন্য আশা করব তার অপরাধ আপনি ক্ষমা করবেন।”
সারা ঘরে শব্দ নেই। সব চোখ রাজশেখরের মুখের দিকে। কঠিন মুখটি ধীরে—ধীরে কোমল হয়ে এল। দুই চোখে ফুটে উঠল কৌতুক মেশানো স্নেহ। ধীর স্বরে তিনি বললেন, ”দুটো শর্তে নিতে পারি। ইচ্ছার নাতনিকে কিছু একটা দোব বলে মন স্থির করেছি, সেটা দোব বাচ্চচুকে নিজের হাতে। ওকে একদিন আমার কাছে নিয়ে আসবে। দ্বিতীয় শর্ত, কালু বোলতায় যাবে। ‘কিছু একটা হয়েটয়ে গেলে’ এই ভয়ে সিংহিবাড়ির মেয়ে গর্তে লুকিয়ে থাকবে আমি বেঁচে থাকতে? তাই কখনও হয়।”
”দুটো শর্তই আমরা মানব।” এতক্ষণে কথা বলল চঞ্চলা।
কলাবতী দু’হাত তুলে লাফিয়ে উঠল, তাকে জড়িয়ে ধরল সুশি।
”কালু, এবার এদের মিষ্টি—মুখ করানোর ব্যবস্থা কর, এই প্রথম এরা আমাদের বাড়িতে এসেছে।”
কলাবতী ভেতরে গিয়ে দাদুর নির্দেশ জানিয়ে এল মুরারিকে। কলাবতী কবে, কার সঙ্গে, কীভাবে বোলতায় যাবে রাজশেখর সেইসব বিষয় জেনে নিচ্ছিলেন আর দেশের বাড়ির খবরও।
”দেশের বাড়িতে থাকেন আমার কাকা। বিয়ে করেননি, একা মানুষ, বয়সে আপনার থেকে একটু ছোটই হবেন। আমরা ওঁকে ডাকনামেই ব্যাংকাকা বলে ডাকি।” সমীর জানাতে লাগল রাজশেখরকে তাদের দেশের বাড়ির কথা। ”জমিজমা, চাষবাস, ফলের বাগান, মাছচাষ সবকিছুই দেখাশোনা, বিক্রিটিক্রি করা ব্যাংকাকাই করেন। দোতলা বাড়ি, সাত—আটখানা ঘর সবই ফাঁকা পড়ে আছে, বছরে এক—আধবার আমরা যাই। আমি তো দেড় বছর যাইনি, সুশি তো তবু গত বছর গেছল। ব্যাংকাকার খেলাধুলোয় খুব উৎসাহ। বোলতা স্পোর্টিং ক্লাব, বি এস সি—র আজীবন প্রেসিডেন্ট, টাকা দিয়ে ক্লাবটাকে উনিই চালান। আমরা কেউ গেলে উনি খুব খুশি হন।”
”ওই যে বললে একটা পোড়ো শিবমন্দির আছে, ওটা কবেকার?” রাজশেখর কৌতূহলভরে জানতে চাইলেন।
”লোকমুখে শুনেছি ওটা নাকি বর্গিদের প্রতিষ্ঠা করা।”
”তার মানে পলাশির যুদ্ধের পনেরো বছর আগে, নবাব আলিবর্দি খাঁর আমলে। নাগপুর থেকে মারাঠি বর্গিরা ঘোড়ায় চেপে আসত লুটপাট করতে, নিষ্ঠুরভাবে খুন করে আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দিয়েছিল বাংলাকে।” রাজশেখর বললেন, ”ওদের রণহুঙ্কার ছিল, ‘হর হর মহাদেও’। শিবের ভক্ত ছিল ওরা।”
”ওদের আসার খবর পেলেই গ্রাম ছেড়ে মানুষ পালাত।” চঞ্চলা বলল, ”তখনই তো বাচ্চচাদের ভয় দেখাতে ঘুমপাড়ানি ছড়াটা তৈরি হল, ‘ছেলে ঘুমোলো পাড়া জুড়োল বর্গি এল দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে।’ এখন অবশ্য এই ছড়ায় বাচ্চচারা আর ভয় পায় না।”
”কিন্তু ভূতের ভয় পায়। তবে শুদু আমাদের কেন সারা পৃথিবীর বাচ্চচারা ভয় পায় আর সেইজন্যই তো ভূতের গল্প শুনতে চায়।” সমীর বলল।
”কিন্তু বর্গিরা শিবমন্দিরটা তৈরি করেছিল, এটা কি বিশ্বাস করা যায়?” রাজশেখর তাঁর সন্দেহটা জানালেন।
”আমি তো করি না।” সমীর বলল। ”বর্গিরা তো লুটপাট করে চলে যেত। তাদের অত সময় কোথায় মিস্ত্রি খাটিয়ে ছ’—সাত মাস ধরে মন্দির তৈরি করার? তবু বোলতার লোকের ধারণা মন্দির নাকি বর্গিরা তৈরি করেছে। আর ভূত তৈরির গল্পটা শুনবেন?”
ট্রে—হাতে, আম, লিচু, তালশাঁস, সন্দেশ আর ঘোলের শরবত নিয়ে মুরাবি ঘরে ঢুকল। রাজশেখর বললেন, ”প্লেটগুলো খালি করতে করতে বলো তোমার ভূত তৈরির গল্প।”
সমীর কাঁটা দিয়ে এক টুকরো আম মুখে ভরে শুরু করল। ”আমাদের এখনকার বাড়ি থেকে ষাট—সত্তর গজ দূরে পুরনো বাড়িটা। পূর্বপুরুষরা একটা গড় তৈরি করেছিলেন। তাই লোকে বাড়িটাকে বলত গড়বাড়ি। জায়গাটার নামও হয়ে যায় গড়বাড়ি। এখন গড়বাড়ি একটা ধ্বংসস্তূপ। এই গড়ের পাশেই একটা প্রকাণ্ড দিঘি খোঁড়া হয়। এখন সেটা বুজে বুজে আর আগের মতো নেই। দিঘিটাকে বলা হয় গড়ের দিঘি। জংলা আগাছায় ভরা এই দিঘির সংস্কার হয়নি, মাছ আছে কিন্তু প্রচুর। বছরে একবার মাছ বিক্রি করেন ব্যাংকাকা। এই দিঘির কিনারেই শিবমন্দির। মন্দিরটাকে জড়িয়ে আছে একটা অশ্বত্থ গাছ। দূর থেকে মনে হয় জটাজূট ভরা একটা বিশাল মাথা। মন্দিরের গা বেয়ে নেমেছে মোটা—মোটা ঝুরি আর ডালপালা। কত যুগ যে পুজো হয় না তা বলতে পারব না, দেড়শো—দুশো বছর তো হবেই। শিবমন্দিরে যেতে হলে ওই ভূতের জমির ওপর দিয়ে যেতে হবে নয়তো দিঘির দিক দিয়ে নৌকোয় করে যেতে হবে। অতএব কেউ আর শিবমন্দিরের ধারেকাছে মাড়াত না, ফলে পুজোটুজো বন্ধ হয়ে যায় আপনা থেকেই।
”তখনকার দিনে ডাকাতের খুব ভয় ছিল। ডাকাতির হাত থেকে বাঁচার জন্য গড়বাড়ির নীচে একটা পাতালঘর তৈরি করা হয়েছিল। সেটা লম্বায় কতটা চওড়ায় কতটা তা আমরা জানি না, কেননা কেউই কোনওদিন সেই পাতালঘরটা চোখে দেখিনি। মাটির নীচে ঘর, সেখানে যাওয়ার রাস্তা বা সিঁড়িটা কোথায় তাও আমরা জানি না। কেউ জানার চেষ্টাও কখনও করেনি। শুনেছিলাম আজ থেকে একশো পঁচিশ বছর আগে এক ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট পাতালঘরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য গড়ের মাঠের খানিকটা খোঁড়াখুঁড়ি করেছিলেন। কিন্তু কাজটা শেষ হওয়ার আগেই তিনি বদলি হয়ে যান, কাজ আর এগোয়নি। খোঁড়াখুঁড়িতে দু—চারখানা ছোট—ছোট পাতলা ইট বেরিয়ে ছিল, তাতে দেবনাগরি অক্ষরে কারও নামের আদ্যক্ষর লেখা ছিল। আমি কেন আমার ঠাকুর্দার বাবাও সে ইট চোখে দেখেনি।”
