”ঠিক বলছিস হরি ধরতে পারেনি? ওকে বিশ্বাস নেই, তলে তলে ঠিক খোঁজ নেবে। ধরতে পারলে চারদিকে বলে বেড়াবে রাজুর ছেলেটা হাঁদা, নাতনিটা বোকা। সিংহিদের চিমটি কাটার সুযোগ পেলে তো ছাড়বে না, কালু, এ নিয়ে তুই চিন্তা করিসনি। উপহারটা যেই পাক একটা কনে তো পেয়েছে, ব্যস! ইচ্ছের নাতনিকে আমি একটা কিছু পরে দোব। তোর বন্ধু সুশিকে একদিন নেমন্তন্ন কর, ওর সঙ্গে ভাল করে আলাপ করব। মেয়েটি আমাদের মান রক্ষা করে দিয়েছে।”
.
নেমন্তন্ন করার আগেই দু’দিন পর বিকেলে সুশি এসে হাজির হল কলাবতীদের বাড়িতে। সঙ্গে ওর দাদা সমীর আর বউদি চঞ্চলা। ওরা দেখা করতে চায় রাজশেখরের সঙ্গে। সমীরের হাতে একটা অ্যাটাচি কেস।
”কী ব্যাপার রে?” ভয়ে ভয়ে কলাবতী জিজ্ঞেস করল সুশিকে।
”ব্যাপার গুরুতর, তুই যে উপহারটা বাচ্চচুদিকে দিয়ে এসেছিস সেটা ফিরিয়ে দিতে দাদা এসেছে। বাচ্চচুদি তো কিছুতেই নেবে না, আমরাও ওই উপহার গ্রহণ করতে পারব না। ভুল করে দেওয়া অন্যের জন্য অত দামি জিনিস কি নেওয়া যায়, তুই বল?”
”কিন্তু একবার দিয়ে ফেলা উপহার দাদুই বা ফিরিয়ে নেবেন কী করে? তাতে তো ওঁর মর্যাদা থাকবে না।”
বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে বিপন্ন মুখে দু’জন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল। তখন বৈঠকখানায় রাজশেখর আলাপ করছিলেন সমীর আর চঞ্চলার সঙ্গে। পায়ের ব্যান্ডেজ খুললেও লাঠি হাতে রাজশেখর সাবধানে চলাফেরা করছেন। সমীর পূর্ব রেলের অফিসার, থাকে আসানসোলে।
”আরে, বোলতা আমি চিনব না। হুগলি জেলার প্রায় সব গ্রামেরই নাম আমি জানি। আমাদের আটঘরা থেকে দশ—বারো মাইল বড়জোর। খুব বর্ধিষ্ণু জায়গা বোলতা। স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়েছে, অনেক সরকারি দপ্তর হয়েছে, টেলিফোন আছে, প্রচুর টিভি সেট, একটা ব্যাঙ্কও আছে, কলেজও নাকি হবে শুনেছি।” রাজশেখর তাঁর নিজের জেলার প্রসঙ্গ পেলে একটু সোজা হয়ে বসেন। উত্তেজিত হয়ে ওঠার এটা প্রাথমিক লক্ষণ।
”ঠিকই শুনেছেন। আমরা একটা জমি দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু যারা কলেজ করার জন্য উদ্যোগী হয়ে কমিটি করেছে তারা জমিটা নিতে চায়নি।” সমীরের স্বরে খেদ ফুটে উঠল।
”কেন? খুব বেশি দাম চেয়েছিলে?”
”আজ্ঞে না, নিঃশর্ত দান করব বলেছিলুম। প্রায় পাঁচ বিঘে জমি বাস—রাস্তার ওপর। কাছেই পোস্ট অফিস, থানা, জায়গাটা নির্জন। একটা বিশাল দিঘি আছে আমাদেরই বাড়ির পেছনদিকে। কলেজ করার আইডিয়াল জায়গা।”
”তা হলে?”
”জমিতে ভূত আছে। ওখানকার লোকদের বিশ্বাস। প্রায় দেড়শো—দুশো বছরের বিশ্বাস। তাই ওই জমিতে কেউ পা পর্যন্ত রাখে না, গোরু—ছাগল পর্যন্ত চরতে দেয় না। জমিটায় পা রাখলে নাকি তার মৃত্যু অবধারিত। শুনেছি অনেকে নাকি মারাও গেছে তবে আমরা শুধু শুনেই এসেছি ছোটবেলা থেকে, চোখে দেখিনি। জমিটা এখন জঙ্গল হয়ে আছে। পেয়ারাগাছে পেয়ারা হয়, বেলগাছে বেল, কুলগাছে কুল। কেউ পাড়তে যায় না। ফল হয় আর গাছেই থাকে, তারপর জমিতে পড়ে পচে যায়। আমাদের বাড়ির লাগোয়াই পুরনো ভাঙা বাড়ি আর পোড়ো একটা শিবমন্দির আর তার গায়েই জমিটা।”
”আশ্চর্য তো!” রাজশেখর টানটান হয়ে বসলেন। ”খুব ইন্টারেস্টিং। একবিংশ শতাব্দীতে আমরা পা দিতে চলেছি আর আমার জেলার লোক কিনা এখনও ভূতপ্রেতকে ভয় পায়।” রাজশেখরকে যত না অবাক তার থেকেও বেশি লজ্জিত দেখাল।
এই সময় কলাবতী ও সুশি বৈঠকখানা ঘরে ঢুকল। এতক্ষণ ওরা বাইরের বারান্দায় শলাপরামর্শে ব্যস্ত ছিল, আর ঘরের কথাবার্তা শুনছিল।
”দাদু”। কলাবতী রাজশেখরের গা ঘেঁষে বসল। দাদুর একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিল। ”দাদু, তোমার জেলার লোকদের পক্ষে এটা নিশ্চয় খুব লজ্জার, তাই না?”
”নিশ্চয়। ভূতে বিশ্বাস করে কারা? ভিতু, কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকেরা।”
”তা হলে এই ভূতের ভয়টা তো ভেঙে দেওয়া উচিত। কী বলো?”
”ভাঙবেটা কে? আমার পা—টায় এখনও তেমন জোর ফেরেনি নইলে আমিই গিয়ে—একবার ভাব তো, কলেজ করার জন্য অতবড় একটা জমি কিনা ভূতের মাঠ হয়ে পড়ে আছে, কলেজ হবে না!”
”তুমি নাই বা গেলে, সিংহিবাড়িতে কি আর লোক নেই? সুশি দেশের বাড়িতে যাচ্ছে সামনের শনিবার, আমিও ওর সঙ্গে বোলতায় যাব। দেখব ভূত আমার ঘাড় মটকাতে পারে কি না।” কলাবতী বাঁ হাতের তালুতে ডান হাতের ঘুসি বসাল।
রাজশেখর উত্তেজিত হয়ে বললেন, ”অবশ্যই যাবি। সিংহিরা ভূতপ্রেত দৈত্যদানোকে কোনওদিন ভয় করেনি, শুধু একবার মাত্র আমার বাবা সোমেন্দ্রশেখর ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির সঙ্গে পঞ্জাব ইউনিভার্সিটির ক্রিকেট ম্যাচে ভয় পেয়েছিলেন মহম্মদ নিসারকে ফেস করতে গিয়ে। বলেছিলেন, বল হাতে যখন ছুটে আসছিল তখন ওকে দেখে হাঁটু দুটো একটু কেঁপে উঠেছিল। ব্যস, সারা সিংহি বংশের হিস্ট্রিতে ওই একটাই ভয় পাওয়ার কেস পাওয়া গেছে। ভূতেরা কি নিসার, লারউডের থেকেও ভয়ঙ্কর?…নিশ্চয়ই যাবি।”
”কিন্তু দাদু,” গলাখাঁকারি দিয়ে সুশি এবার বলল, ”এটা কিন্তু খুব ঝুঁকি নেওয়ার ব্যাপার হয়ে যাবে। বোলতার লোকেরা দেড়শো—আড়াইশো বছর ধরে, মানে বর্গির আমল থেকে বিশ্বাস করে আসছে ওই মাঠে অপদেবতা বাস করে। শুধু শুধু কি আর বিশ্বাস করে, নিশ্চয় ভূতটুত তারা দেখেছে। না দাদু, কালুর ওখানে গিয়ে কাজ নেই, কিছু একটা হয়েটয়ে গেলে—”
