কলাবতী অস্ফুটে বলল, ”হুঁ।”
”আমি এসেছি কি না জানতে চাইল?”
”হুঁ।”
”যাওয়ার আগে একবার দেখা করে যাওয়া উচিত, কী বলিস?”
কলাবতীর মুখ দিয়ে এবার কোনও শব্দ বেরোল না। আড়চোখে দেখল কাকার পাতে কুমড়োর ছোঁকার একটা ঢিপি বসিয়ে দিয়ে লোকটি বলল, ”আপনাকে পরিবেশন করে সুখ আছে, খাইয়ে লোক তো আর দেখাই যায় না।”
”ফ্রাই হয়েছে?”
”হয়েছে।”
সত্যশেখর উত্তেজিত হয়ে চেয়ার থেকে চার ইঞ্চি উঠে আবার বসে পড়ল। ”আপনি পরিবেশন করবেন তো?”
”করব।”
হরিশঙ্কর মন্তব্য করলেন, ”এত ভাল ভাল জিনিস থাকতে সতুর নজর যত্তসব অখাদ্যের দিকে।”
আটটা ফ্রাই খেয়ে সত্যশেখর জানিয়ে দিল, ”কালু, আর কিছু খাব না শুধু কয়েক টুকরো মাছ, ব্যস, আজকের মতো শেষ।”
”দাদু বলে দিয়েছে তোমার ওপর নজর রাখতে।”
”নিশ্চয় রাখবি। খাইয়ে লোক তো আর দেখাই যায় না, দেখে নে। খুব ভাল করে নজর করে দ্যাখ। ভাল রান্নার মতো ভাল করে খাওয়াও একটি শিল্প, একটা আর্ট।”
আর্টের প্রদর্শনীতে সত্যশেখর জুড়ে দিল গোটাকয়েক পানতুয়া এবং সোজা বর্ধমান থেকে আনা হয়েছে শুনে, প্রায় চারশো গ্রাম সীতাভোগ।
অবশেষে একসময় হরিশঙ্করকে বলতে হল, ”সতু, আমরা যে উঠতে পারছি না, এবার ক্ষান্ত হও।”
হাত ধুয়ে সবাই বসে আছে। খুবই লজ্জা পেয়ে সত্যশেখর দইয়ের মালসা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবেশকের দিকে মাথা নেড়ে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। গ্লাসের জলে হাত ডুবিয়ে রুমালে আঙুল মুছতে—মুছতে সে বলল, ”কালু, এবার তো ইচ্ছেপিসির সঙ্গে একবার দেখা করা উচিত।”
কলাবতীর এখন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। বিনা উপহারে তারা যাবে কী করে কনে দেখতে? দাদুর মানসম্মান তা হলে ধুলোয় গড়াগড়ি খাবে। তার থেকে বরং কেটে পড়াই উচিত। কাকা তো জানেই না কার জন্য আনা উপহার সে কাকে দিয়ে ফেলেছে।
”কাকা, বড্ড গরম, একটু বাইরে বসি গিয়ে।”
”তাই চল, জিরিয়ে নিয়ে ইচ্ছেপিসির সঙ্গে দেখা করব।”
ওরা ভিড় ঠেলে বেরিয়ে আসছে তখন দোতলার ডান দিকের বারান্দা থেকে জলদমন্দ্র কণ্ঠে হাঁক শোনা গলে, ”কালু না?”
এ—গলা ইচ্ছেদিদা ছাড়া আর কারও হতে পারে না। কলাবতীর বুকের মধ্যে কাঁপন লাগল। সে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল, যা ভয় করেছিল সেটাই ইচ্ছেদিদার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
”এত দেরি করলে কেন…ওপরে এসো। তোমার কাকা আসেনি?”
কলাবতী মাথাটা কাত করে আঙুল দিয়ে কাকাকে দেখাল।
”ওপরে এসো।”
”কাকা, ওপরে যেতে বলছে।”
”চল। এই একপেট খেয়ে আবার সিঁড়ি ভাঙা। হ্যাঁ রে ‘এত দেরি করলে কেন’ বললেন কেন? তুই তো অনেক আগে ওপরে গিয়ে উপহারটা দিয়ে এসেছিস, ইচ্ছেপিসির সঙ্গে দেখাও হয়েছে বললি।” সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সত্যশেখর বলল।
”কাকা, একটা বিশাল ভুল হয়ে গেছে। দোষটা অবশ্য আমারই, আমি যে একটা গাধা আজ তা টের পেলুম। উফফ, দাদু শুনলে কী যে বলবে!”
”হয়েছে কী?” সত্যশেখর সিঁড়ি ভাঙা বন্ধ করে উৎকণ্ঠিত চোখে তাকাল।
”ডান দিকের সিঁড়িতে না উঠে বাঁ দিকে উঠে পড়েছিলুম আর সেখানেই কনের হাতে উপহারটা দিয়ে দিয়েছি।”
”করেছিস কী! অত দামি গহনা দিয়ে দিলি? এখন কী হবে?”
”ফিরিয়ে আনব?”
”পাগল হয়েছিস। ওপরে চল। আর নয়তো এখান থেকেই সটকে পড়ি।”
”না, না, সেটা বিশ্রী দেখাবে। দিদা তো আমাদের দেখে ফেলেছে। চলো, ওপরেই যাই।”
কাকা আর ভাইঝি একগাল হাসি নিয়ে বারান্দায় ইচ্ছাময়ীর সামনে দাঁড়াল। চওড়া বারান্দা তখন আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবে গিজগিজ করছে। সত্যশেখর কোনওক্রমে শরীরটা সামনে ঝুঁকিয়ে প্রণাম করল, কলাবতীও।
”কত্ত ছোট্ট তোমাকে দেখেছিলুম আর আজ দেখছি। চলো, আমার নাতনিকে দেখবে, এই পাশের ঘরেই।” ইচ্ছাময়ীর কথা শেষ হতে—না—হতেই ঘর থেকে হুড়মুড়িয়ে মেয়েরা বেরোতে শুরু করল, ”বর এসেছে, বর এসেছে,” বলে।
ধাক্কা সামলাতে—সামলাতে সত্যশেখর বলল, ”কালু, বর আসা কখনও দেখেছিস, দেখার মতো একটা জিনিস।”
”না কাকা, কখনও তো দেখিনি। আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।” কলাবতীর আদুরে গলায় বলল।
”তা হলে দেখবি চল। পিসিমা কালুকে একটু দেখিয়ে আনি।” সত্যশেখর কথা শেষ করেই ভাইঝির হাত ধরে টানল।
”দেরি কোরো না, তাড়াতাড়ি এসে কনে দেখে যেয়ো।”
”নিশ্চয় দেখব।” যেতে যেতে সত্যশেখর বলল, ”যা খিদে পেয়েছে তাড়াতাড়ি তো ফিরতেই হবে।”
দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে, বরের মোটরগাড়ি ঘিরে থাকা ভিড়টার পাশ কাটিয়ে, ফটক দিয়ে বেরিয়ে এসে দু’জনে প্রায় দৌড়ে একশো মিটার অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁফাতে—হাঁফাতে সত্যশেখর বলল, ”আর পারছি না রে একটু জিরোই। যাক, প্রণামটা তো করা হয়েছে, এতেই মনে করে রেখে দেবেন আমরা গেছলুম।”
”কাকা, দাদুকে কী বলব?”
”বলবি পেটভরে খেলুম, রান্না খুব ভাল হয়েছে—”
”আর উপহারের গহনাটা যে ভুল কনেকে দিয়ে এলুম! আমি কিন্তু দাদুকে মিথ্যে কথা বলতে পারব না।”
”বলবি না। বাবাকে তোর থেকে বেশি আমি চিনি। সত্যি কথা বললে সাতখুন মাফ করে দেবে।”
কলাবতীর কাছ থেকে সব শুনে রাজশেখর ঘরের কড়ি—বরগা কাঁপিয়ে হাসতে শুরু করলেন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দুরদুর বুকে অপেক্ষা করছিল সত্যশেখর এইবার ঘরে ঢুকল।
”জানো বাবা, হরিকাকা আর একটু হলেই ধরে ফেলেছিল। কিন্তু কালুর বন্ধু সুশি এমন ম্যানেজ করে দিল যে, আমি পর্যন্ত টের পাইনি কালু ডাইনে—বাঁয়ে গুলিয়ে ফেলেছে।”
