”আরে, তুমি দাঁড়িয়ে রইলে কেন, বোসো।”
একজন হাত ধরে কলাবতীকে বসিয়ে দিল। সে বসতে যাচ্ছে তখন কোমরে গামছা জড়ানো একজন দরজার কাছ থেকে বলল, ”যাঁরা এই ব্যাচে বসতে চান তাঁরা নীচে আসুন। দেরি করবেন না।”
শোনামাত্র কলাবতী উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুত দরজার দিকে এগোল, তার খিদে পায়নি কিন্তু কাকার পাশে তাকে বসতেই হবে, দাদুর কড়া হুকুম। সিঁড়ি দিয়ে সে নামছে আর তারই বয়সী একটি মেয়ে, খোঁপায় জড়ানো বেলফুলের গোড়ে, হাতে একটা শাঁখ, ব্যস্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে। দু’জনের ধাক্কা লাগে প্রায়। দু’জনে দু’জনের মুখের দিকে তাকাল।
”কালু তুই!”
”তুই সুশি!”
.
সুস্মিতা আর কলাবতী পরস্পরের দিকে সদ্য—ভাজা ছানাবড়া চোখে তাকিয়ে রইল। ওরা দু’জনে কাঁকুড়গাছি উচ্চচ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে একই ক্লাসের ছাত্রী। দু’জনেই এবার উচ্চচ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে।
”আমার বউদির খুড়তুতো বোনের বিয়ে, শিলিগুড়ি থেকে বর আসবে এখনই। তুই এখানে?”
”বলছি।” কলাবতী এখন নিশ্চিত হয়ে বুঝে গেল, বড় রকমের একটা ভুল সে করে ফেলেছে। ভুলটা যেভাবেই হোক ম্যানেজ করতে হবে।
”এ—বাড়িতে কি আর একটা বিয়ে হচ্ছে?” কলাবতীর গলায় সন্দেহের সুর।
”দ্যাখ না কী যে মুশকিল হচ্ছে। আমাদের লোক ওদিকে চলে যাচ্ছে ওদের লোক আমাদের দিকে চলে আসছে। সেইজন্য তো সদরগেটে লোক দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।” সুশি মেশিনগানের মতো তড়বড় করে বলল। ”একটা বাড়িতে দুটো বিয়ে, পার্টিশান করে আলাদা করারও ব্যবস্থা নেই। বিয়েবাড়ির যে এত ডিমান্ড কে জানত? বাড়িওলা বলল দেরি করে ফেলেছেন, আরও দু’মাস আগে এলে গোটা বাড়িটাই পেতেন, এখন আপনাদের শেয়ার করে নিতে হবে, রাজি থাকেন তো এখনই অ্যাডভান্স করুন। যত বিয়েবাড়ি এদিকে রয়েছে সব তো ভাড়া হয়ে গেছে, কী আর করা যায় অগত্যা ভাগাভাগি করেই নিতে হল।” এর পর গলা নামিয়ে সুশি বলল, ”হ্যাঁ রে কালু, তুই ভুল করে এদিকে চলে আসিসনি তো?”
ওদের পাশ দিয়ে হুড়মুড় করে মেয়েরা নীচে নেমে যাচ্ছে নতুন ব্যাচে বসার জন্য। সিঁড়ির একধারে সরে গিয়ে কলাবতী বলল, ”বোধ হয়।” তারপর উৎফুল্ল হওয়ার ভান করে কলাবতী বলল, ”তোর বউদি তো আমারও বউদি। বউদির বোন তো আমারও দিদি। দিদির বিয়েতে এসেছি মনে করলেই আর গণ্ডগোল নেই। তবে ওদিককার লোকেরা না জানলেই ভাল। দাদুর পিসতুতো বোনের নাতনি, কাউকে জীবনে চোখেও দেখিনি শুধু ইচ্ছেদিদাকে ছাড়া। চল, তোদের বিয়ের খাওয়াটাই খাব।”
কথাগুলো বলার সময় কলাবতীর মনের মধ্যে খচখচ করছিল একটাই কথা : দাদু শুনলে কী বলবে? অত দামি একটা গহনা কিনা ভুল জায়গায় দিয়ে এলুম!
”তুই একা এসেছিস?”
”সঙ্গে কাকাও আছে। ভুল নেমন্তন্নে এসেছি জানলে লজ্জায় পড়ে যাবে। এতক্ষণে হয়তো খেতে বসে গেছে।”
”সে আমি ম্যানেজ করে দোব। চল, তাড়াতাড়ি, বসার জায়গা পাস কিনা দ্যাখ।”
কলাবতীর হাত ধরে সুশি টেনে নিয়ে চলল। লম্বা টানা টেবিলগুলো তখন ভরে গেছে। কলাবতী গলা তুলে দেখার চেষ্টা করল কাকাকে এবং দেখতেও পেল। সত্যশেখর তখন সামনে দাঁড়ানো এক মহিলাকে হাত নেড়ে প্রাণপণে কী যেন বোঝাচ্ছে আর এদিক—ওদিক তাকাচ্ছে। হঠাৎ কলাবতীকে দেখতে পেয়ে চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করল, ”কালু, কালু, এই যে, এই যে, এখানে তোর জায়গা রেখেছি, চলে আয়।”
”সুশি, ওই যে কাকা!”
ভিড়ের মধ্য দিয়ে কলাবতী এগিয়ে গেল, পেছনে সুশি।
”এই দেখুন, মিথ্যে কথা বলিনি, শুধু শুধু চেয়ার আটকে রাখিনি।” সত্যশেখর উদ্ভাসিত মুখে মহিলার দিকে তাকাল। ব্যাজার মুখে সরে যাওয়ার সময় মহিলা বললেন, ”এ কী, অনাচ্ছিস্টির নিয়ম, যে আগে আসবে সেই তো আগে বসবে।”
”কাকা ভাল আছেন? আপনি যে আসবেন ভাবতেই পারিনি।” সুশি কয়েকবার কলাবতীদের বাড়িতে এসেছে, সত্যশেখরকে সে চেনে। সত্যশেখরের পাশের চেয়ারটা খালি, তার পাশের চেয়ারে হরিশঙ্কর। তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। মুখটা আড়চোখে দেখে নিয়ে সত্যশেখর বলল, ”আসব না মানে! ইচ্ছেদিদার নাতনির বিয়েতে আসব না?”
মুহূর্তের জন্য সুশির মুখ হতভম্ব হয়ে স্বাভাবিক হল কনুইয়ে কলাবতীর চিমটি খেয়ে।
”তা তো জানিই।” সুশির মুখ হাসিতে ভরে গেল। ”ইচ্ছেদিদা তো সন্ধে থেকে আপনার কথাই বলছিলেন।”
এই সময় একটা হইচই, ব্যস্ততা বিয়েবাড়িতে পড়ে গেল। শোনা গেল ”বর এসেছে, বর এসেছে।” সুশি চঞ্চল হয়ে উঠল। ”কাকা, আমি যাই, বরণের সময় শাঁখ বাজাতে হবে, লজ্জা করে খাবেন না কিন্তু।”
”না, না, লজ্জা কেন করব।” সত্যশেখর আশ্বস্ত করল সুশিকে। ”ওদিককার মতো কেটারিং সার্ভিস তো এদিকে নয় যে, চেয়ে চেয়ে খেতে হবে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।”
হরিশঙ্কর চোখ বুজে গলা চুলকোচ্ছিলেন। সুশি চলে যাওয়ার পর বললেন, ”মেয়েটি কে কালু?”
কলাবতী টেবিলের তলা দিয়ে প্রায় হামা দেওয়ার মতো অবস্থায় শরীর গলিয়ে এধারে উঠে এসে চেয়ারে বসল। ‘সুশি তো ইচ্ছেদিদার ভাশুরের নাতনি। আমার বন্ধুও।”
বেগুনভাজা সহযোগে খানছয়েক লুচি শেষ করে সত্যশেখর ছোলার ডাল পবিশেনকারীকে ”আরও দু’হাতা দিন,” বলেই কলাবতীর কাছে ফিসফিসিয়ে জানতে চাইল, ”ইচ্ছেদিদার সঙ্গে দেখা হল?”
