”কাকা তোমার এখনই খিদে পেয়ে গেল? কোর্ট থেকে ফিরেই তো চারটে আম দিয়ে দই আর চিড়ে খেল!”
”খিদে পাবে না? চুপচাপ একা বসে, এত লোক যাচ্ছে আসছে কাউকেই চিনি না শুধু ওই হরিকাকা ছাড়া। কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বলা আর ইনভাইট করে চিমটি খাওয়া একই কথা, কালু তুই একটু ভেতরে গিয়ে দ্যাখ। বরযাত্রীরা এসে পড়লে তখন তো ওরাই প্রায়রিটি পাবে খেতে বসায়। তার মানে আমাদের বসতে বসতে থার্ড কি ফোর্থ ব্যাচ, তার মানে তো বেগুনভাজার টেস্ট একদমই নষ্ট হয়ে যাবে।” সত্যশেখরকে খুবই উদ্বিগ্ন দেখাল।
ভেতর থেকে এক মহিলা এই সময় বেরিয়ে এসে অভ্যর্থনারত এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে জর্দার কৌটো চেয়ে নিয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন। সত্যশেখর তাকে ডেকে বলল, ”এই মেয়েটিকে একটু কনের কাছে নিয়ে যাবেন।”
”নিশ্চয়, নিশ্চয়, এসো ভাই।” তিনি কলাবতীর হাত ধরলেন। ”আসলে কী জানেন আমাদের লোকজন খুব কম, ঠিকমতো খাতিরযত্ন করতে পারছি না। তা ছাড়া চিনিও না কাউকে। এসো ভাই।” কলাবতীকে হাত ধরে তিনি বাড়ির ভেতর নিয়ে বাঁ দিকের সিঁড়ি ধরে দোতলায় উঠলেন।
”এই যে সতু, তুমি একা যে, বাবা আসেনি?”
সত্যশেখর চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠল। হরিশঙ্কর তাকে বসার জন্য ইশারা করে বললেন, ”বসে পড়ো, নয়তো কেউ টেনে নেবে।”
ধপ করে বসে পড়ল সত্যশেখর। ”বাবার পা মচকে গেছে।”
”মচকাবেই তো। দিন দিন যা মোটা হচ্ছে। তা ভবতোষ চাটুজ্যের নাতনির বিয়েতে তোমরা নেমন্তন্ন পেলে কোন সুবাদে?”
”কেন, মানুর ঠাকুমা তো বাবার পিসতুতো বোন ইচ্ছেপিসি! মানু তো সম্পর্কে বাবার নাতনি, ওরা চাটুজ্যে বামুন হতে যাবে কেন?”
”মানু আবার কে?”
”কেন, আজ যার বিয়ে হচ্ছে!”
”বিয়ে তো হচ্ছে বাচ্চচুর। শিলিগুড়ির ছেলের সঙ্গে। ভুল করে খেতে ঢুকে পড়োনি তো।” হরিশঙ্কর মুচকি হাসলেন। ”তুমি আবার যা পেটুক। সিংহিরা অবশ্য খেতে ভালবাসে। খেয়ে খেয়ে মোটা হয় আর পা মচকায়।”
রাগে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল সত্যশেখরের মাথা। কোনওক্রমে নিজেকে সামলে বলল, ”ভুল আপনি করেননি তো। বাচ্চচু নয় মানুরই বিয়ে হচ্ছে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন।”
”আচ্ছা দেখছি।” খোঁজ নেওয়ার জন্য হরিশঙ্কর এধার ওধার তাকিয়ে সদ্য খেয়ে উঠে বেরিয়ে আসা একটি বেঁটেখাটো যুবককে ধরলেন। ”ভাই, বলতে পারেন যার বিয়ে হচ্ছে তার নাম বাচ্চচু কিনা?”
যুবকটি পান চিবনো বন্ধ করে ভ্রূ কোঁচকাল। কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, ”বাচ্চচু?…হতে পারে। আমার বউ বলতে পারবে, ওর মামাতো বউদির ননদ হয় কনে। আচ্ছা, দাঁড়ান আমি জিজ্ঞেস করে আসছি।”
দাঁড়াতে আর হল না। বাড়ি থেকে কোমরে গামছা বাঁধা একটি লোক বেরিয়ে এসে চেঁচাল, ”পাত পড়েছে। এই ব্যাচে যারা খাবেন তারা চলে আসুন।”
”শুনলে তো সতু। চলো চলো আর দেরি কোরো না।” হরিশঙ্কর কনুই ধরে টান দিলেন। সত্যশেখর চলতে শুরু করল।
সেই মহিলাটি কলাবতীর হাত ধরে বাঁ দিকের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলেন। একতলায় উঠোনের দু’ধারে যে টানা লম্বা রক তার ডাইনে ও বাঁয়ে টেবিল পেতে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বাঁ দিকের টেবিলে তখন ধুতিপরা কোমরে গামছা বাঁধা দুটি লোক শালপাতার থালা পাতছে, এইমাত্র একটা ব্যাচ খাওয়া শেষ করে উঠে গেছে। কৌতূহলবশতই কলাবতী সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ডান দিকের রকে যারা খাচ্ছে তাদের দিকে তাকাল। তার মনে হল পাতে বেগুনভাজা রয়েছে, ছোলার ডাল পরিবেশন করছে কালো ট্রাউজার্স, সাদা শার্ট পরা তিন—চারজন লোক, তাদের হাতে শাদা গ্লাভস। তার অদ্ভুত লাগল আর একটা জিনিস দেখে বাঁ দিকের মতো ডান দিকের টেবিলে শালপাতায় নয়, নিমন্ত্রিতরা খাচ্ছে কলাপাতায়। দু’দিকে দু’রকম একই বিয়ের ভোজে, কী করে হয়!
যাই হোক, এই নিয়ে ভাবার জন্য কলাবতী সময় আর পেল না, কেননা ততক্ষণে সেই মহিলা তাকে একটা বড় ঘরের মধ্যে এনে ফেলেছেন। সারা ঘর জুড়ে বসে রয়েছেন সাজগোজ—করা মহিলারা। একদিকে সিংহাসনের মতো চেয়ারে বসে কনে। কলাবতী এধার—ওধার তাকিয়ে ইচ্ছেদিদাকে খুঁজে তাঁকে দেখতে পেল না। সসঙ্কোচে কনের দিকে সে এগিয়ে গেল। গহনার বাক্সটা কনের হাতে তুলে দিয়ে মৃদুস্বরে বলল, ”দাদুর আশীর্বাদ।”
মাথায় ফুলের মুকুট, কপালে চন্দন, গলায় বেলফুলের মালা এবং হাতে ও গলায় সোনার গহনা এবং গোলাপি বেনারসিপরা মেয়েটি স্মিত হেসে দু’হাত জড়ো করে নমস্কার করল এবং পাশে দাঁড়ানো এক বিবাহিত মহিলার হাতে বাক্সটি তুলে দিল। কাগজের মোড়কটা ছিঁড়ে বাক্সের ডালাটা খুলেই তার চোখদুটি বিস্ফারিত হয়ে গেল উত্তেজনায়। মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ বেরোল।
”ওমমা, কী দারুণ পেন্ডেন্ট, মুক্তো বাসানো!”
”কই, দেখি, দেখি।” সামনে—বসা একজন বললেন।
গহনার বাক্সটা তুলে ধরে সবাইকে দেখানো হল। খাতা কলম নিয়ে একজন বিধবা উপহারের তালিকা রাখছেন। তিনি জানতে চাইলেন, ”কে দিয়েছে রে রাধু, নামটা বল।”
বাক্সটার ভেতর থেকে ছোট্ট একটা কাগজ বার করে রাধু নামের মহিলা চেঁচিয়ে পড়লেন, ”ইচ্ছার নাতনিকে তার শুভ বিবাহে আটঘরার সিংহবাড়ির শুভেচ্ছা। আশীর্বাদক, রাজশেখর।”
লেখাটা কলাবতীরই। ইচ্ছার সঙ্গে শুভেচ্ছা মিল দেওয়ার লোভ সে সামলাতে পারেনি। সারা ঘরে একটা গুঞ্জন। গহনাটার দাম কত হতে পারে তাই নিয়ে ফিসফাস। একজন বলল, শুধু মুক্তোগুলোর দামই তো আড়াই হাজার, ওটা হাজার পাঁচেকের কম নয়। এখন সোনার দর কত করে জানো? কে একজন বলল, খুব বড়লোকের বাড়ি থেকে দিয়েছে। এইসব কথাবার্তা কলাবতী কান লাল করে শুনল।
